জীবনী

‘বাংলার ব্যাংক’ জগৎ শেঠের জীবনী।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কিংবা নবাবদের অর্থিকভাবে অসুবিধা হলে তিনি তাদের অর্থ ধার দিতেন।একবার ভেবে দেখুন,যিনি নবাবদের অর্থ ধার দিতেন তিনি কতটাই না ধনী ছিলেন।বলছি জগৎ শেঠের কথা।আমাদের অনেকেরই জানা আছে যে পলাশীর যুদ্ধে অর্থের জোগান দিয়েছিলেন জগৎ শেঠ।তৎকালীন সময়ে পুরো বাংলার আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল জগৎ শেঠের বাড়ি।

জগৎ শেঠ ছিলেন তৎকালীন সময়ে বাংলার অন্যতম ধনী ব্যাংকার।আমরা সবাই তাকে জগৎ শেঠ নামে চিনলেও জগৎ শেঠ কিন্তু কোন নাম নয় জগৎ শেঠ হলো একটি পারিবারিক উপাধি যার অর্থ বিশ্বের সওদাগর’।তার আসল নাম ফতেহ চাঁদ। জগৎ শেঠ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মানিক চাঁদ। ১৮ শতকের প্রথম দিকে তিনি পাটনা থেকে ঢাকায় চলে আসেন এবং একটি বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।ঐ সময়ে বাংলার দেওয়ান মুর্শিদকুলী খাঁ তার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন। তখন মানিক চাঁদ তার সঙ্গে নতুন রাজধানীতে চলে যান। মুর্শিদাবাদে গিয়ে তিনে ধীরে ধীরে নবাবের প্রিয় এবং বিশ্বস্ত মানুষ হয়ে উঠেন । পরবর্তীতে নবাব তার উপর ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব অর্পণ করেন।

 সম্রাট ফররুখ সিয়ার ১৭১২ সালে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণের পরপরই মানিক চাঁদকে
 ‘নগর শেঠ’ (নগরের ব্যাংকার) উপাধি প্রদান করেন।১৭১৪ সালে মানিক চাঁদের মৃত্যুর পর তার ভ্রাতুষ্পুত্রও উত্তরাধিকারী ফতেহ চাঁদের নেতৃত্বে পরিবারটি বিপুল খ্যাতি অর্জন করে।মোঘল সম্রাট মাহমুদ শাহ ১৭২৩ সালে  ফতেহ চাঁদকে ‘জগৎ শেঠ’ উপাধি প্রদান করে। এরপর এ ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানটি দেশে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়। এই ব্যাংকটির সদর দপ্ততর ছিল মুর্শিদাবাদে এবং ঢাকায়,এছাড়াও পাটনা ও দিল্লিসহ বাংলার গুরুত্বপূর্ণ শহর ও বাংলার বাইরে এ ব্যাংকের শাখা ছিল।

টাঁকশাল, রাজস্ব সংগ্রহ এবং প্রেরণ, সোনা কেনা-বেচা, বিদেশি বণিকদের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিময় মূল্য নির্ধারণ, জমিদার ও নবাবকে টাকা ধার দেওয়া – সব কিছুতেই  জগৎ শেঠ ছিলেন পারদর্শী।কোনোভাবেই তার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না।তৎকালীন সময়ে অভ্যন্তরীণ ও অন্তর্বর্তী বাজারও ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। বাজার দর ওঠা-নামা, অর্থ মূল্যের হেরফের, সুদের চড়া-মন্দা সব কিছুই নির্ধারিত হতো জগৎ শেঠের ইচ্ছা অনুযায়ী। বাংলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বেড়েছিল তার উপর ভর করেই।

কিন্তু জগৎ শেঠের এত উন্নতির  পথে বাধাঁ হয়ে দাড়ায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার সিংহাসনে আরোহন। সিরাজউদ্দৌলা সিংহাসনে আসীন হওয়ার পর মোহনলালকে দেওয়ান হিসেবে নিযুক্ত করেন।
মোহনলালের সঙ্গে পূর্ব শত্রুতা ছিল শেঠদের।যার ফলে শেঠদের সাথে নবাবের সম্পর্ক খারাপ হয়।

নবাব কলকাতায় ইংরেজ কুঠির আক্রমণ করলে নবাবকে ইংরেজদের বিষয়ে আন্তরিক হওয়ার পরামর্শ দেন জগৎ শেঠ।নবাব তখন তাকে অপমানে করে ফিরিয়ে দেন।নবাবের কাছে অপমানিত হয়ে তিনি ক্ষোভে ফেটে পড়েন।
এবং নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা শুরু করেন।তার পরিকল্পনায় যোগ দেন মীর জাফর, ঘষেটি বেগমসহ আরও অনেক প্রভাবশালী ব্যাক্তিরা।এই ষড়যন্ত্রের ফলেই ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশী যুদ্ধে অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য।

পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের বিজয়ের পর জগৎ শেঠ ইংরেজদের আসল উদ্দেশ্য বুঝতে পারে তবে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। বাংলার অর্থবাজারে জগৎশেঠ পরিবারের দাপট শেষ হয়ে যায় চিরতরে।১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত নবাব মির কাশিম জগৎ শেঠ, মহতাব চাঁদ ও স্বরুপ চাদঁকে হত্যা করেন। 

বাংলার এই ব্যাংকার পরিবারকে ঘিরে রয়েছে অনেক জানা অজানা ঘটনা।জগত শেঠের প্রাসাদ আজও বহন করছে অতীতের সমৃদ্ধি এবং প্রতিপত্তির স্মৃতি।জগৎ শেঠের প্রাসাদের নাম “হাউজ অব জগৎ শেঠ”।তার প্রাসাদে রয়েছে টাঁকশালের ভগ্নাবশেষ, নানা সময়ের মুদ্রা, নথিপত্র, জগৎ শেঠ পরিবারের ব্যবহৃত সামগ্রী। মসলিন এবং অন্যান্য বিলাসবহুল পোশাক, সোনা-রুপোর সুতো দিয়ে অলংকৃত বেনারসি শাড়ি এবং আরও নানা ঐতিহাসিক জিনিসপত্র।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button