ইতিহাসজানা-অজানা

ইয়াজুজ-মাজুজ কারা! কিভাবে হবে তাদের পুনঃ আবির্ভাব!

ইসলাম বিশ্বাসী কিংবা ইসলাম বিদ্বেষী, যাই হই না কেনো ,আমরা প্রায় সবাই ই নিশ্চিত যে একদিন কিয়ামত হবেই অর্থাৎ পৃথিবীর সমাপ্তি। ইসলামি দৃষ্টিতে কিয়ামতের আলামতগুলোর মধ্যে “ইয়াজুজ মাজুজ”-এর আগমন অন্যতম। 

কিন্তু কে এই ইয়াজুজ-মাজুজ!

উলামাদের কেউ কেউ বলেন, আরবী ‘আজ’ শব্দ থেকে ‘ইয়াজুজ মাজুজ’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে; যার অর্থ হচ্ছে ‘দ্রুতগামী’। বলা হয়, ইয়াজুজ মাজুজ যখন পৃথিবীতে বের হবে; তখন তারা খুব দ্রুত সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে। তাদের এই দ্রুতগামীতার জন্য তাদেরকে ইয়াজুজ মাজুজ বলা হয়। 

অনেকেই মনে করে, ইয়াজুজ মাজুজ মানব সন্তান নয়। কিন্তু তাদের ধারনা একেবারেই ভুল। তারা আমাদের মতই মানুষ এবং আদম (আঃ)-এর বংশধর। মূলত এরা নূহ (আ) এর তৃতীয় সন্তান ইয়াফিজ এর বংশদ্ভূত। কিন্তু এরা সভ্যতার আলো থেকে সম্পূর্ন বঞ্চিত এক জাতি। কিয়ামতের আগে ঈসা (আঃ)-এর সময় পৃথিবীতে এদের আগমন ঘটবে। শাসক যুলকারনাইন তাদেরকে এখন প্রাচীর দিয়ে আটকে রেখেছেন, যা সূরা কাহফ এ  আয়াত ৯২-৯৭ এর মধ্যে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা আছে। 

যুলকারনাইন ছিলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শাসকদের মধ্যে একজন। তিনি একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করতেন এবং পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্টা করে বেড়াতেন। তিনি তার বাহিনী নিয়ে বের হয়ে পড়তেন সারা পৃথিবীতে, খুঁজে খুঁজে বের করতেন কে কোথায় কি করছে, কে ভাল কাজ করছে, কে কে অন্যায় করে বেড়াচ্ছে। অবশেষে যখন তিনি দুই পর্বত প্রাচীরের মধ্যস্থলে পৌছলেন; তখন তিনি এক জাতির সন্ধান পেলেন, যারা তাঁর ভাষা ভালভাবে বুঝতে পারছিলো না ।

তারা বলল, ‘হে যুলকারনাইন; ইয়াজুজ ও মাজুজ দেশে অশান্তি সৃষ্টি করেছে; আপনি বললে আমরা আপনার জন্য কিছু কর ধার্য করব এই শর্তে যে; আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন’; এর উওরে তিনি বললেন, ‘আমার পালনকর্তা আমাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন, তাই যথেষ্ট। অতএব তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য কর; আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যে একটি সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেব; তোমরা আমাকে লোহার পাত এনে দাও।’

হাজার হাজার টন লোহা আনা হল। তিনি দুই পাহাড়ের মধ্যে সেই লোহা রাখলেন। লোহা দিয়ে প্রথমে একটা ফাপা দেয়াল বানালেন, তাতে এমন আগুন দেওয়া হল যে লোহা গলে গেল। তৈরী হল নিশ্ছিদ্র এক নিরাপত্তা বেষ্টনী। যার ফলে ইয়াজুজ ও মাজুজ তার উপরে আরোহণ করতে পারল না; এবং তা ভেদ করতেও ব্যর্থ হল।

যুল -কারনাইন ঘোষনা দিলেন- “এই প্রাচীর ইয়াজুজ মাজুজ ভেদ করতে পারবেনা। এটা আমার প্রভুর কাছ থেকে একটা দয়া। তিনি তোমাদের দয়া করেছেন ইয়াজুজ মাজুজের হাত থেকে। এই প্রাচীরটি শক্তিশালী, কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু একদিন আমার প্রভুর কথা সত্য হবে। সেদিন তিনি এই প্রাচীর কে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবেন। আমার প্রভুর কথা নিঃসন্দেহে সত্য প্রমানিত হবে। “ এই ঘোষনা দিয়ে তিনি সেই জাতি কে রেখে এবং ইয়াজুজ মাজুজ কে সীল গালা করে সেখান থেকে বিদায় নেন।

তাই আজকে আমরা ইয়াজুজ মাজুজকে দেখতে পাই না । তারা ঠিক কোথায় রয়েছে তাও আমরা জানিনা। তবে রাসুল (সা)-এরএকটি হাদিস থেকে জানা যায়, তারা মদিনার পূর্ব দিক হতে আসবে।

ঐ প্রাচীর ভেঙ্গে তারা একদিন বেরিয়ে আসবে এবং সামনে যা পাবে সব খেয়ে ফেলবে। এরা আক্রমন করে স্রোতের মতন, পঙ্গপালের মতন। এরা যেদিন বের হবে সেদিন হত্যা, ডাকাতি, দুর্নীতি, অরাজকতা, অন্যায়, ধর্ষন যা ইচ্ছা তাই করবে। এদের মূল লক্ষ্য একটাই, তা হল পৃথিবীকে দখল করে নেওয়া। এরা যখন বের হবে এদের সামনে দাড়ানোর মতন কোন শক্তি থাকবে না। পুরো পৃথিবী ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার মতন ক্ষমতা নিয়ে বের হবে এই জাতি। তাদের সাথে কেউ লড়াই করতে পারবে না।

ঈসা আ. দাজ্জালকে হত্যা করার পর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিকট ওহী প্রেরণ করবেন, “আমার বান্দাহদেরকে তূর পাহাড়ে সরিয়ে নাও। কেননা, আমি এমন একদল বান্দা অবতীর্ণ করছি যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষমতা কারো নেই।” আল্লাহ তা‘আলার বাণী অনুযায়ী তাদের অবস্থা হলো, “তারা প্রত্যেক উচ্চভূমি হতে ছুটে আসবে (সূরাঃ আম্বিয়া আয়াত নং ৯৬)। তিনি বলেন, তাদের প্রথম দলটি সিরিয়ার তাবারিয়া উপসাগর অতিক্রমকালে এর সমস্ত পানি পান করে শেষ করে ফেলবে। এদের শেষ দলটি এ স্থান দিয়ে অতিক্রমকালে বলবে, ‘নিশ্চয়ই এই জলাশয়ে কোন সময় পানি ছিল!’

তারপর বাইতুল মাকদিসের পাহাড়ে পৌঁছানোর পর তাদের অভিযান সমাপ্ত হবে। তারা পরস্পর বলবে,”দুনিয়াতে যারা ছিল তাদের ধ্বংস করেছি। এখন আকাশে যারা আছে তাদের ধ্বংস করব।” তারা এই বলে আকাশের দিকে তাদের তীর নিক্ষেপ করবে। আল্লাহ তাদের তীরে রক্ত মাখিয়ে ফেরত পাঠাবেন।

এসময় ঈসা (আঃ) ও তাঁর সাথীরা আল্লাহ তাআলার দিকে রুজু হয়ে দুআ করবেন। এতে আল্লাহ্ তা‘আলা ইয়াজুজ মাজুজ বাহিনীর ঘাড়ে মহামারীরূপে ‘নাগাফ’ নামক কীটের উৎপত্তি করবেন। তারা সবাই মারা যাবে ও পঁচে দুর্গন্ধ হবে। এরপর হযরত ঈসা (আ:) ও তার সঙ্গী-সাথীগণ সমতল ভূমিতে অবতরণ করবেন। সেখানে তিনি এমন এক বিঘত পরিমাণ জায়গাও পাবেন না, যেখানে সেগুলোর পঁচা দুর্গন্ধময় রক্ত-মাংস ছড়িয়ে না থাকবে। তখন তারা এ দুর্বিসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে মিনতি জানাবেন। আল্লাহ্ তা‘আলা তখন উটের ঘাড়ের ন্যায় লম্বা ঘাড়বিশিষ্ট এক প্রকার পাখি প্রেরণ করবেন। সেই পাখি ওদের লাশগুলো তুলে নিয়ে ‘নাহবাল’ নামক স্থানে নিক্ষেপ করবে। 

তারপর আল্লাহ্ তাআলা এমন বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যা সমস্ত ঘর-বাড়ী, স্থলভাগ ও কঠিন মাটির স্তরে গিয়ে পৌছবে এবং সমস্ত পৃথিবী ধুয়েমুছে আয়নার মতো চকচকে হয়ে উঠবে। অতঃপর আল্লাহর পক্ষ হতে ভূমির প্রতি নির্দেশ হবে ‘তোমার উদ্ভিদ’ বের করো, ফলমূল বৃদ্ধি করো, বরকত ও কল্যাণ ফিরিয়ে দাও।’

তখন এরূপ পরিস্থিতি হবে যে, একদল লোকের জন্য একটি ডালিম পর্যাপ্ত হবে এবং একদল লোক এর খোসার ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করতে পারবে। দুধেও এরুপ বরকত হবে যে, বিরাট একটি দলের জন্য একটি উটনীর দুধ, একটি গোত্রের জন্য একটি গাভীর দুধ এবং একটি ছোট দলের জন্য একটি ছাগলের দুধই যথেষ্ট হবে। (সহীহ মুসলিম)। 

এমতাবস্থায় কিছুদিন অতিক্রান্ত হওয়ার পর হঠাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা এমন এক বাতাস প্রেরণ করবেন, যা সকল ঈমানদারের আত্মা ছিনিয়ে নেবে এবং অবশিষ্ট থাকবে শুধুমাত্র দুশ্চরিত্রের লোক, যারা প্রকোশ্যে নারী সম্ভোগে লিপ্ত হবে। তারপর তাদের উপর কিয়ামাত সংঘটিত হবে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button