ইতিহাস

রহস্যময় হোটেলে কখনও আসেনি অতিথি! ১০৫ তলা পড়ে আছে খালি!

পিরামিডের আদলে তৈরি ১০৫ তলা বিশিষ্ট রাজপ্রাসাদের মতো জমকালো এই হোটেলটি পেছনে ফেলতে পারে বিশ্বের নামকরা যেকোনো নামি-দামি হোটেলকে।অথচ এই দৃষ্টিনন্দন হোটেলের রুমে কখনোই থাকে নি কোন অতিথি।আজ পর্যন্ত এই হোটেলের প্রবেশাধিকার পান নি কোন পর্যটকও।বলছি, উওর কোরিয়ার রাজধানী পিয়ংইয়াং শহরে অবস্থিত রিয়্যুগিয়োং হোটেলের কথা।১৯৮৭ সাল থেকে ১৯৯২মোট  ৫  প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা হয় এই হোটেলটি।এই হোটেলটির উচ্চতা ১০৮০ ফুট যেখানে প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের উচ্চতা ১০৬০ ফুট।এই হোটেলে পর্যটকদের জন্য রয়েছে ৩০০০ বিলাসবহুল রুম। নামী দামি ইন্টিরিয়রদের হাতে সেজে উঠেছে এই হোটেলের প্রত্যেকটি শয়নকক্ষ।এই হোটেলের দেয়ালে প্রতি সন্ধ্যায় ফায়ারওয়ার্কের লাইভ শো হয়,দুবাইয়ের বুর্জ খলিফার মতো।এত চমৎকার আয়োজন কিন্তু নেই কোন অতিথি। এটাও কি সম্ভব!হোটেলটি যেহেতু উত্তর কোরিয়ায় তাই সবই সম্ভব।আসুন তাহলে, জেনে নেওয়া যাক উত্তর কোরিয়ার রিয়্যুগিয়োং হোটেলের ব্যাপারে।

উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে নতুন করে বলার কিছুই নেই। উত্তর-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটির উত্তরে চিন, উত্তর-পূর্বে রাশিয়া, পূর্বে জাপান সাগর, দক্ষিণে দক্ষিণ কোরিয়া এবং পশ্চিমে পীত সাগর অবস্থিত। এখানে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনা। প্রতিবছর উত্তর কোরিয়া ভ্রমণে আসেন মাত্র ৩ লক্ষ পর্যটক।পর্যটকদের আগমনে এত বিধি-নিষেধ তাহলে কি দরকার ছিল কোটি কোটি ডলার খরচ করেও ৩০০০ শয্যাবিশিষ্ট ১০৫ তলার এত বিশাল হোটেল তৈরি করার?আসল কারণটা অন্যরকম।১৯৮৬ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালীন উত্তর কোরিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ নেয়।অপরদিকে, দক্ষিণ কোরিয়া নেয় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ।দুই কোরিয়ার মধ্যে তখন চলতে থাকে আলাদা এক স্নায়ুযুদ্ধ। যেখানে দুই পক্ষের ই লক্ষ্য ছিল নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের পাশাপাশি অপরকে ছোট করে দেখানো।আর এই শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে উত্তর কোরিয়া তাদের হাতিয়ার হিসেবে কাজ লাগায় রিয়্যুগিয়োং হোটেলকে।

১৯৮৬ সালে সিঙ্গাপুরে স্ট্যামফোর্ড হোটেল নামে এক বিলাসবহুল হোটেল তৈরি করে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানি।১৯৮৮ সালের অলিম্পিকের জন্যও বেশ ভালোভাবেই  প্রস্তুতি নিচ্ছিল দক্ষিণ কোরিয়া।চির শত্রু দক্ষিণ কোরিয়ার এই উন্নতি মেনে নিতে পারছিল না উত্তর কোরিয়া।তখন উত্তর কোরিয়া ও অলিম্পিকের মতো অনুষ্ঠানের আয়োজন করার উদ্যোগ নেয়। এবং এর নাম দেয় ওয়ার্ল্ড ফেস্টিভেল।এই অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দেড় লক্ষ লোক বসতে পারে এমন একটি ব্র্যান্ড নিউ স্টেডিয়াম এবং অংশগ্রহণকারীর জন্য ৩০০০ রুম বিশিষ্ট একটি হোটেল বানানোর সিদ্ধান্ত নেয় দক্ষিণ কোরিয়া।  দক্ষিণ কোরিয়ার স্ট্যামফোর্ড হোটেলের রেকর্ড ভেঙ্গে দিতে পরিকল্পনা করা হয় এই হোটেল হবে ১০৫ তলা এবং হাজার ফুট উঁচু।সেই সময় পুরো পৃথিবীতে মাত্র একুশটি বিল্ডিং  ছিল যাদের উচ্চতা ১০০ তলার উপর। প্রতিযোগিতায় দক্ষিণ কোরিয়াকে পিছনে ফেলার জন্য বেশ জোরশোরসেই এই অভিনব নতুন হোটেলের ঘোষণা করে দিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। 

১৯৮৭ সালে শুরু হয় হোটেলটির নির্মাণ কাজ।কিন্তু শুরুতেই হোঁচট খায় পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু হোটেল বানানোর স্বপ্ন।এত উঁচু ভবন  বানানোর জন্য যে পরিমাণ ইস্পাত প্রয়োজন, ততখানি পর্যাপ্ত ইস্পাত উত্তর কোরিয়ার কাছে মজুত ছিল না। ১৯৮৯ সালে যখন ওয়ার্ল্ড ফেস্টিভেল শুরু হয় তখন হোটেলের নির্মাণকাজ অর্ধেকও শেষ হয়নি।১৯৯২ সালে উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম লিডার কিম ইল সুং এর ৮০ তম জন্মদিনে ঠিক করা হয় হোটেল উদ্ভোধনের নতুন তারিখ।হোটেলের সাইটের কাজ জোরকদমে চালু করা হয় আবার। কিন্তু ভাগ্য যেন কোন ভাবেই সঙ্গ দিচ্ছিল না। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়।রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রভাব পরে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিতে।অর্থের অভাবে আবারও স্থগিত করা হয় হোটেল তৈরির কাজ।

২০০৮ সালে একটি মিশরীয় কোম্পানির সাথে চুক্তি করে উত্তর কোরিয়া। চুক্তি অনুযায়ী, নিজেদের অর্থে হোটেলের অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করবে এবং ২০১২ সালে সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে হোটেলটি।কাজ শুরুর কিছুদিন পর আবার দেখা দেয় নতুন সমস্যা।২০১১ সালে কিম জং উন ক্ষমতায় আসার পর দেশটিতে বিলাশবহুল সকল পণ্যের রপ্তানি বন্ধ করে দেয় যুক্তরাষ্ট্র।আসবাবপত্র ও নির্মাণ উপকরণের অভাবে আবারও বন্ধ হয়ে যায় হোটেলের নির্মাণ কাজ।২০১৬ সালের শেষের দিকে খবর পাওয়া যায় আবার শুরু হয়েছে হোটেলটির নির্মাণ কাজ।২০১৮ সালে হোটেলের দেয়ালে যুক্ত করা হয় এল ই ডি ডিসপ্লে।২০১৯ সালের জুনে হোটেলের গেইটে লাগানো হয় হোটেলের নাম ও লগো সম্বলিত সাইনবোর্ড। বিভিন্ন সময় এই হোটেল উদ্ভোধনের নানা খবর মিল্লেও এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায় নি কোন আনুষ্ঠানিক সংবাদ।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button