জীবনী

ঘসেটি বেগমের জীবনী

ঘসেটি বেগম, বাংলার ইতিহাসে এক কলঙ্কিত নাম। তার মূল নাম মেহের উন নিসা বেগম। তিনি ছিলেন বাংলা, বিহার এবং উড়িষ্যার নবাব আলীবর্দী খানের জ্যেষ্ঠ কন্যা। নবাব আলীবর্দী খানের প্রাসাদ হীরাঝিলের একমাত্র শক্তিশালী নারী চরিত্র এই ঘসেটি বেগম, যাকে বাইরের পৃথিবী চিনতে পেরেছে। 

আলীবর্দী তার তিন মেয়েকে ক্রমান্বয়ে তার বড় ভাই হাজী আহমদের তিন ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেন। ঘসেটি বেগমের বিবাহ হয়েছিল নওয়াজিস মুহম্মদ শাহমাত জং-এর সাথে। বিবাহিত জীবনে এই দম্পতির কোনো সন্তান ছিলো না। ফলশ্রুতিতে, ঘসেটি বেগমের ছোট বোন আমেনা বেগমের ছোট ছেলে ইকরামউদ্দৌলা কে দত্তক নেন; কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত ইকরামউদ্দৌলা তরুণ বয়সে গুটিবসন্তে মারা যান। 

স্বামী নওয়াজিস মুহম্মদ এর মৃত্যুর পর ঘসেটি বেগম উত্তরাধিকার সূত্রে স্বামীর কাছ থেকে প্রচুর সম্পদ পান। এছাড়াও নিজের প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বিপুল বিত্তের মালিক হয়েছিলেন। তিনি এতটাই প্রভাবশালী ছিলেন যে, মুর্শিদাবাদে নবাব আলীবর্দী খানের তিন মেয়ের মধ্যে একমাত্র তারই আলাদা একটি প্রাসাদ ছিল।

১৮৫২ সালে, নবাব আলীবর্দী তার ছোটো মেয়ে আমেনা বেগমের ছেলে সিরাজ-উদ-দৌলাকে তাঁর উত্তরাধিকারী ঘোষণা করেন। কিন্তু ঘসেটি বেগম ছিলেন লোভী প্রকৃতির। আলীবর্দীর এই সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নিতে পারেন নি। নবাব তথা প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের লোভে ঘষেটি বেগম চেয়েছিলেন সিরাজের পরিবর্তে মেজ বোন মায়মুনা বেগমের পুত্র শওকত জং যেনো বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব হয়। কারণ, শওকত জং প্রায় সারা দিনই মদ্যপান করতেন। আর পাচাটাদের কথামতো সিদ্ধান্ত নিতেন। তাই তার ওপর প্রভাব বিস্তার করা অত্যধিক সহজ হতো ঘষেটি বেগমের জন্য।

ঘসেটি বেগম আশঙ্কা করছিলেন যে, সিরাজ যদি একবার মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে বসেন তাহলে তার সঙ্গে কেবল নির্দয় ব্যবহারই করবে না, তার ধন সম্পত্তিও কেড়ে নেবে। তাই যে কোনো মূল্যেই সিরাজ কে মসনদহারা করতে প্রস্তুত ছিলেন তিনি। ফলাফলস্বরূপ, প্রতিহিংসা পরায়ণ এ নারী শওকত জং-কে সিংহাসনে বসানোর জন্য নানা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেন। সিরাজকে মসনদ থেকে হটানোর ষড়যন্ত্রের প্রধান কারিগর হিসেবে আবিভূর্ত হন তিনি। শুধু তাই নয়, সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রধান আখড়াবাড়ি ছিলো ঘসেটি বেগমের জাকজমকপূর্ণ মতিঝিলের প্রাসাদ।

১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল, আলীবর্দি খান মারা গেলে সিরাজ সিংহাসন আরোহণ করেন। ১৭৫৬ সালের ১৬ অক্টোবর, মহন লালের সৈন্যদের আক্রমণে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয় ঘসেটি বেগমের প্রিয় শওকত জং। শওকত জংয়ের পরাজয়ের ফলে ঘসেটি বেগমের প্রতিহিংসা চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। কিন্তু  অনতিবিলম্বেই সিরাজ ঘসেটি বেগমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাস্বরূপ তাঁকে প্রাসাদে অবরুদ্ধ করেন। কিছুদিন হীরাঝিলে বন্দি রেখে পরে তাকে ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে জিঞ্জিরা প্রাসাদে স্থানান্তর করেন।

ঘসেটি গোপনে আলীবর্দীর প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের সাথে মিত্রতা গড়ে তোলেন। সিরাজের বিরুদ্ধে চক্রান্তের স্বার্থে তিনি প্রচুর অর্থ প্রদান করেছেন মির জাফরকে। এরপর তারা রাজবল্লভ, জগৎশেঠ, উমিচাঁদের সঙ্গে হাত মেলায়। শওকত জং নিহত হওয়ার সঙ্গে সিরাজ বিরোধীরা অনুভব করেন, এখন কেবল ইংরেজরাই তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে; এটা ভেবেই তারা কোম্পানির ব্যবসায়ীদের সাথে সিরাজের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়, যেখানে সিরাজের পুরোনো শত্রু ঘসেটি বেগম প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। মীরজাফর, দেওয়ান রাজভল্লভ, জগৎ শেঠ সকলকে নিয়ে ঘসেটি সিরাজ বিরোধী ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেন।   

বলা বাহুল্য তাদের এই ষড়যন্ত্র সফল হয়। ষড়যন্ত্রকারী দের তৎপরতার চরম প্রকাশ ছিল পলাশীর যুদ্ধ। যেখানে বাংলার ভাগ্য ইংরেজদের পক্ষে চলে গিয়েছিল। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, মীর জাফর মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে বসেন। মীর জাফরের বর্বর পুত্র মিরণের আদেশে সিরাজকে হত্যা করা হয়। মির জাফর হয় বাংলার নবাব। 

কিন্তু প্রতিশ্রুত অর্থ না দেওয়াসহ নানা কারণে একপর্যায়ে ঘষেটি বেগমের সঙ্গে মীর জাফর এবং তার পুত্র মীর মিরনের ঝামেলা শুরু হয়। ঘসেটি বেগমের চরিত্র সম্পর্কে তো তারা আগে থেকেই অবগত ছিলেন। তাই মীর জাফরের পুত্র মীরন ঘসেটি বেগমকে বন্দি অবস্থায়ও বিপজ্জনক শত্রু বলে বিবেচনা করেন।

বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের ছেলে মিরন চাইছিলেন নবাব আলিবর্দীর সর্বশেষ জীবিত দুই মেয়ে ঘসেটি বেগম ও আমেনা বেগমকে (সিরাজদ্দৌলার মা) দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দিতে। তিনি তার বিশ্বস্ত অনুচর আসফ খাঁ কে এ দায়িত্ব দেন। 

আসফ খাঁ কৌশলে ঘসেটি বেগম কে বুঝাতে সক্ষম হন যে, সিরাজদ্দৌলাকে সিংহাসনচ্যূত করতে তার অবদানের কথা ভুলে যাননি মীর জাফর। তাই তাকে মুর্শিদাবাদে এনে সম্মানীত করতে চান তিনি। জাঁকজমকে পরিপূর্ণ মতিঝিল প্রাসাদ আবারও ঘসেটি বেগমের হাতে তুলে দিতে চান মির জাফর। ঘসেটি বেগম নির্দিদ্বায় এ কথা বিশ্বাস করেন। তৎক্ষনাৎ রাজি হয়ে যান মুর্শিদাবাদ যেতে। ব্রহ্মপুত্র নদীর উপর দিয়ে নৌকায় করে যাত্রা করেন তিনি। কিন্তু নৌকা ঘষেটি বেগমকে নিয়ে জিঞ্জিরা প্রাসাদ ছেড়ে গেলেও মুর্শিদাবাদে পৌঁছেনি কোনদিন। পথেই পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী, নৌকা ডুবিয়ে দেয় মিরনের লোকজন। ব্রহ্মপুত্রতেই ঘষেটি বেগমের সলিল সমাধি ঘটে বলে ধারণা করা হয়।

মৃত্যুর সময়ে অঢেল ধন সম্পত্তির মালিক এই ঘসেটি বেগমের কপালে সাড়ে তিন হাত মাটিও জোটেনি। যাদেরকে তিনি এককালে রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বেশি আপন বলে মনে করেছিলেন, তাদেরই পাতা ফাঁদে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয় তাকে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button