ইতিহাস

ইবনে বতুতার বিশ্বভ্রমনের কাহিনি

১৩০৪ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারি, মরক্কোর তাঞ্জিয়ায় জন্মেছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তি। যিনি ৩০ বছরে প্রায় ৪০টি দেশ ভ্রমণ করে ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য সাক্ষর রেখে গেছেন। তাঁর নাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতা। যিনি ইবনে বতুতা নামেই সর্বাধিক পরিচিত। কিশোর বয়স থেকেই বিশ্বভ্রমণের তীব্র ইচ্ছা জেগেছিল তাঁর মনে।

পরবর্তীতে ভ্রমণ এবং নতুন কিছু উদ্ভাবন করাই হয়ে উঠে তাঁর নেশা এবং পেশা। ফলশ্রুতিতে, নিজ শহরের ধর্মীয়, ইতিহাস, ভূগোলে জ্ঞানার্জনের পর ১৩২৫ সালে, মাত্র ২১ বছর বয়সে হজ্বের উদ্দেশ্যে বের হন তিনি। মক্কা থেকেই তিনি বিশ্ব ভ্রমণে বের হন। দীর্ঘ তিন দশক সময়ে বর্তমান পশ্চিম আফ্রিকা থেকে শুরু করে মিশর, মরক্কো, আল জাজিরা, তিউনিসিয়া, তারাবলুস, সৌদি আরব, সিরিয়া, ইরান, ইরাক, কাজাকিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাহরাইন, হিন্দুস্তান, খুরাসান, তুরস্ক, ফিলিস্তিন, লেবানন, মালদ্বীপ, ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীন সহ সর্বমোট ৭৫,০০০ মাইল ভ্রমণ করেছিলেন তিনি। পুরো বিশ্ব ভ্রমণ করার উদ্দেশ্যে দীর্ঘ ২৯ টি বছর কাটিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। যার ফলে তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা একজন পর্যটক বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তিনি একমাত্র পরিব্রাজক ছিলেন, যিনি তাঁর সময়কার সমগ্র মুসলিম সাম্রাজ্য ভ্রমণ করেন এবং সুলতানদের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

ইবনে বতুতা নিজে একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন এবং ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করতেন। জীবনে অনেকটা সময়ে তিনি কাজীর চাকরি করেছেন। কখনো ছিলেন রাষ্ট্রদূত।

সিন্ধু থেকে দিল্লী আসার দীর্ঘ সফরে ভারতের তৎকালীন সমাজ প্রত্যক্ষ করেন বতুতা। তাঁর বর্ণনা মতে, দিল্লী সমগ্র মুসলিম প্রাচ্যের বৃহত্তম নগরী ছিলো, যা ১১৮৮ সালে মুসলিম শাসকদের দখলে আসে। সুরক্ষিত প্রাচীর ঘেরা দিল্লী শহরের সৌন্দর্য এবং দাপট তাকে মুগ্ধ করে। যেমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বা সম্পদে বারবার মুগ্ধ হয়েছেন তেমনি কষ্ট পেয়েছেন সতীদাহের মতো অমানবিক প্রথায়। 

ভারতে ইবনে বতুতা প্রায় ৭ বছর অবস্থান করেন। সুলতান তাকে দুটি ছোট গ্রামের কর্তৃত্ব দেন, যাতে এর থেকে সংগৃহীত রাজস্ব উত্তোলন করে তিনি তার খরচ চালাতে পারেন। সেইসাথে কাজী হিসেবেও সুলতান কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীকালে চীন যাওয়ার উদ্দেশ্যে সমুদ্র তীরের দিকে যাওয়ার সময় রাস্তায় তিনি একদল ডাকাত দ্বারা আক্রান্ত হন। এই আক্রমণে তিনি সবকিছু হারিয়ে কোনরকমে প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু দিল্লী ফিরে না এসে এরপর মালদ্বীপ ও শ্রীলংকায় অবস্থান করেন। 

১৩৪৬ সালে, দীর্ঘ ৪৩ রাত সমুদ্রের বুকে কাটিয়ে বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌছান ইবনে বতুতা। বাংলায় এসে প্রথমেই চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজার মেহমান হন তিনি। ইবনে বতুতা তার বিবরনীতে বাংলার কতিপয় সামাজিক বিষয়ের উপর দৃষ্টিপাত করেন। তার মতে, সারা পৃথিবীতে তিনি এমন কোন দেশ দেখেননি, যেখানে জিনিসপত্রের মুল্য এই দেশের চেয়ে কম। এ বিশাল দেশে প্রচুর চাল উৎপন্ন হয়।

সেই সময়ে বাংলার সুলতান ছিলেন ফখরউদ্দিন। ফখরউদ্দিন দিল্লীর সুলতানের আনুগত্য করতেন না। তিনি সুফীব্যক্তিত্ব এবং মুসাফিরদের প্রতি বিশেষ সম্মান দিতেন। বতুতা নিজেও ছিলেন সুফী ঘরানার মানুষ, তাই সুফী দরবেশদের প্রতি বাংলার শাসক শ্রেণী এবং স্থানীয় সব ধর্মের মানুষের লোকের উপর সুফি-দরবেশদের প্রভাব ও মর্যাদা তাকে মুগ্ধ করে। ইবনে বতুতার বাংলাদেশে আসার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল মহান দরবেশ শেখ জালাল-উদ-দিনের সাথে সাক্ষাৎ করা। সিলেটের পর্বতশ্রেণির মধ্যে যেখানে শেখ জালাল-উদ-দিন থাকতেন, সেখান থেকে প্রায় ২দিনের দূরত্বেই তার দুজন শিষ্যের সাথে দেখা হয় ইবনে বতুতার। তাদের কাছ থেকে তিনি জানতে পারেন যে, শেখ জালাল-উদ-দিন আদেশ দিয়েছেন, মাগরেব বা মরোক্কো থেকে যে পর্যটক তার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসছেন তাকে যেন স্বাগত জানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। অথচ ইবনে বতুতার সাথে শেখ জালাল-উদ-দিনের আগে থেকে কোন পরিচয় ছিল না। এমনকি ইবনে বতুতা তার আগমনের কোন খবরও শেখ জালাল-উদ-দিনকে দেন নি। এখান থেকেই ইবন বতুতা শেখ জালাল-উদ-দিনের আধ্যাত্বিক ক্ষমতার ব্যাপারে ইঙ্গিত পান।

ইবনে বতুতা একজন পরহেজগার মুসলিম ছিলেন। তিনি যেমন মহান মুসলিম শাসকদের গুণগান করেছেন তেমনি অত্যাচারী শাসকদের বর্ববতার কথাও লিখেছেন। জানা যায়, তিনি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলে পবিত্র কোরআনের একটি পাতা খুলে পড়তেন। সে পাতায় তার চোখে যে আয়াতটি পড়ত তিনি সে আয়াতের অর্থ বুঝে সিদ্ধান্ত নিতেন তিনি কোন পথে যাবেন।

বিশাল এ পথ পাড়ি দিতে তাকে কখনো পার হতে হয়েছে নদী পথ, সমুদ্র, কখনো উটের উপর, কখনো বা পায়ে হেটেই এগিয়েছেন বহুদূর। বিভিন্ন দেশের রাজা, রানী ও মন্ত্রিরা জাহাজ ভর্তি করে অসংখ্য উপহার দিয়েছেন তাকে।

১৩৫৩ সালের সেপ্টেম্বরে, তিনি মরোক্কোর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন এবং ১৩৫৪ সালের শুরুর দিকে তার জন্মভূমিতে পদার্পন করেন। নিজ দেশে ফেরার পর, মরোক্কোর সুলতান আবু ইনান ফারিস তার ভ্রমণকাহিনীর বর্ণনা লিপিবদ্ধ করার জন্য কবি ইবনে যোজাইয়াকে নিয়োগ করেন। এই ভ্রমণকাহিনীর নাম ‘রিহলা’। রিহলা অর্থ সফর। এ গ্রন্থের পুরো নাম ‘তুহফাতুন-নাজ্জার ফি গারাইবিল আমসার ওয়া আজাইবিল আসফার’। যার অর্থঃ- ‘আশ্চর্য সব শহর এবং বিচিত্র সফরের অভিজ্ঞতা, চিন্তাশীল সফরকারীদের জন্য উপহার’।

মুসলমানদের ইতিহাসচর্চা খুবই কম। তাই ইসলামের ইতিহাস নিয়ে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থের সংখ্যাও কম। মুসলিম পর্যটক, ইতিহাসবিদ ইবনে বতুতার দীর্ঘ বিশ্ব ভ্রমণের কাহিনী ইসলামের ইতিহাসে এজন্যই গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তার সফরকৃত অঞ্চলগুলো বেশীরভাগই মুসলিম অধ্যুষিত ছিল। বিশ্বভ্রমণ নিয়ে তার এই বিখ্যাত গ্রন্থ ১৪শ শতকের পূর্ব, মধ্য এবং দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সাম্রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৫৮ সালে,  এই গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদও বের হয়। পরবর্তীতে গ্রন্থটি বিশ্বের আরো বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের অনেক লেখক, চিন্তক ও গবেষক প্রাচ্যের ধর্মীয়, ভৌগলিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে অন্যতম একটি উৎস হিসেবে বইটি থেকে উপকৃত হন। 

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button