প্রযুক্তি

আরব বেদুঈনদের ইতিহাস।

তপ্ত বালি আর প্রতিকুল আবহাওয়ার সাথে দীর্ঘ দিন লড়াই করে মরুভূমির বুকেঁ টিকে আছে বেদুঈন জাতি। আরব উপদ্বীপ, মধ্যপ্রাচ্য আর উত্তর আফ্রিকায় ইসলাম ধর্মের বিকাশ ঘটে বেদুইনদের হাত ধরেই।বেদুঈন শব্দটি এসেছে মূলত আরবি শব্দ ‘বেদু’ থেকে। বেদুঈন শব্দের অর্থ ‘মরুভূমির বাসিন্দা’।আরবের মরু অঞ্চলে বেদুঈনদের বসবাসের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস। খ্রীষ্টপূর্ব ৬০০০ সাল থেকে তারা আরব ভূখণ্ডে বসবাস করছে।তারা কখনো একস্থানে বসবাস করতো না বরং যাযাবর হিসেবে বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতো।তখনকার বেদুঈনদের ছিলো না কোন ধর্ম পরিচয়। তারা অধিকাংশই প্রকৃতি ও মুর্তি পূজারী ছিলো।মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আরবে ইসলামের প্রচার আরম্ভ করলে বেদুঈনদের অনেক গোত্র দলে দলে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। মূলত সেই সময় থেকেই বেদুঈনরা সুন্নী মুসলিম, তবে এখনো খ্রিস্ট ধর্ম পালন করে এমন কিছু বেদুইন গোত্র ও  রয়েছে।

মরুভূমির কঠিন পথ বেদুইনদের থেকে ভালো কেউ ই চিনে না।মরুভূমির তীক্ষ্ণ বালু ঝড়ে বাচঁতে পারায় সবচেয়ে পারদর্শী হচ্ছে উট।আর এই বালু ঝড় কে মোকাবিলা করে হাজার হাজার বছর ধরে মরুর বুকেঁ বসবাস করে আসছে বেদুঈনরা।ইতিহাসবিদদের মতে,বেদুঈনদের সবচেয়ে বেশি বসবাস ছিল ‘The Holy Land’ অর্থাৎ, বর্তমান ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলে।

হাজার বছর ধরে বেদুঈনরা পশুপালন ও কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে।মরুভূমির বিভিন্ন কাফেলার মালামাল পরিবহন ও চাঁদা আদায় ছিলো বেদুঈনদের প্রধান আয়ের উৎস। তারা এসব মালবাহী কাফেলার জন্যে গাইড হিসাবে কাজ করতো। তারা মরুভূমির মধ্যে বাণিজ্যিক দলগুলোকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেত এবং নিরাপত্তা দিতো।তারা একতাবদ্ধ হলেও বেপরোয়া ছিল নিজেদের অধিকার আদায়ে তাদের মতো যুদ্ধবাজ আর কোন জাতি ঐ সময়ে ছিলো না।তখন বেদুঈন গোত্রে যদি কোন হত্যাকান্ড সংঘটিত হতো তাহলে “রক্তের বদলে রক্ত”ই ছিল তাদের প্রতিশোধের মূল মন্ত্র।কোনো পরিবারের কেউ নিহত হলে ঐ পরিবারের প্রথম পাঁচ জন ভাই বা চাচাতো ভাইদের দায়িত্ব ছিলো খুনীকে খুঁজে বের করে হত্যা করা। যদি খুনীকে খুঁজে পাওয়া না যায় তবে বেদুঈন প্রথা অনুযায়ী খুনীর পরিবারে অন্য কোনো পুরুষ সদস্যকে হত্যা করার নিয়ম ছিলো।হজ্ব কাফেলা আক্রমণ করাও স্বাভাবিক ঘটনা ছিলো তাদের জন্য।১৭৫৭ সালে বনি সাকর গোত্রের কা’দান আর ফাইয়াজের নেতৃত্বে এক বেদুঈন দল একটি হজ্ব কাফেলাকে আক্রমণ করলে প্রায় ২০,০০০ হজ্ব যাত্রী হত্যার স্বীকার হয়।

বেদুঈনরা মরুভূমিকে যেন শিরা-উপশিরায় চিনে।তাইতো মরুভূমির বালিতে সামান্য অচেনা দাগ ও তাদের দৃষ্টি এড়ায় না। হাজার বছর ধরে এই দক্ষতা বেদুঈনদের প্রবৃত্তিতে মিশে গেছে। আধুনিক বিশ্বে বেদুঈনদের এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়েছে ইসরাইল।
বিশ্বের একমাত্র এই ইহূদী রাষ্ট্রের সীমান্ত পাহারার দায়িত্বে রয়েছে বিশেষায়িত মুসলিম বেদুঈনরা! ইসরায়েলী সেনাবাহিনীতে “বেদুঈন ট্রাকিং ইউনিট” নামের এই শাখায় আরব বেদুঈনরা বহু বছর ধরে কাজ করছে।

বেদুঈনদের খাদ্যতালিকা খুবই সীমিত।তাদের খাদ্যতালিকার সবচেয়ে বড় অংশ জুড়ে রয়েছে খেজুর।এমনও সময় যায় যখন তারা সারা মাস শুধু খেজুর খেয়েই কাটিয়ে দেয়।তবে বেদুঈনদের প্রধান খাদ্য হলো রুটি, দই, দুধ এবং বিভিন্ন রকমের মাংস। তাদের খাদ্যতালিকায় পানীয় হিসেবে থাকে কফি।তারা  দিনের একটা বড় সময় জুড়ে কফি পান করে।

মধ্যপ্রাচ্যে তেল আবিষ্কৃত হওয়ার পর বেদুঈনরা যাযাবর জীবন ছেড়ে দিতে শুরু করে।বর্তমানে মাত্র ৫ শতাংশ বেদুইন যাযাবর জীবন যাপন করে আর বাকি ৯৫ শতাংশ এখন স্থায়ীভাবে শহরে এবং গ্রামে বসবাস শুরু করেছে।তারা বর্তমানে সম্পূর্ণ ইসলামি রীতিনীতি মেনে চলে।সারা পৃথিবীতে এখনো ২ কোটি ৫০ লাখ বেদুঈন রয়েছে। তারা সবচেয়ে বেশি বসবাস করে আলজেরিয়া ও সৌদি আরবে। সৌদি আরব ও আলজেরিয়াতে প্রায় ২০ লাখ করে মোট ৪০ লাখ বেদুঈন বসবাস করে।বেদুইনরা মূলত কখনই উচ্চ বিলাসী ছিলো না তবে, তারা ঐতিহ্যস্বরূপ তারা তাদের সাংস্কৃতিক ব্যাপারগুলো ধরে রেখেছে, যা এখন মধ্যপ্রাচ্যের পর্যটন শিল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোতে রয়েছে অনেক বেদুঈন ক্যাম্প, যেখানে পর্যটকরা যান একদিনের বেদুইন হওয়ার স্বাদ গ্রহন করতে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button