প্রযুক্তি

পারস্য সাম্রাজ্যের ইতিহাস

যদি পৃথিবীর প্রাচীনতম সমাজ্যগুলোর কথা বলা হয়, তবে উল্লেখযোগ্য সাম্রাজ্যগুলোর তালিকায় উঠে আসে পারস্য সাম্রাজ্যের নাম। যিশুখ্রিষ্টের জন্মের সাত হাজার বছর আগের ঐতিহাসিক ভূমির সন্ধান পাওয়া যায় পারস্যে।বহু সভ্যতা ও সংস্কৃতির মিশ্রণে গড়ে উঠেছিল পারস্য সভ্যতা। মিশরীয়, ব্যাবিলনীয় এবং মেসোপটেমীয় সভ্যতার অ্যাসিরীয় এবং ক্যালডীয় অংশ দ্বারা এ সভ্যতা প্রভাবিত ছিল।খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৯ সালে ক্যালডিয়দের পরাজিত করে সম্রাট ২য় সাইরাস পারস্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।

বর্তমান ইরানের প্রাচীন নাম পারস্য। সে সময় এ অঞ্চলে ফারস নামে একটি প্রদেশ ছিলো। এর পূর্ব নাম ছিলো পারসা। পারসা থেকে পারস্য নামের উৎপত্তি। পারস্য সাম্রাজ্য ভারতের সিন্ধু নদের তীর থেকে ইজিয়ান সাগর এবং ভারত মহাসাগর থেকে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

সাইরাস পারস্যের বিভিন্ন গোত্রকে একত্র করে তাদের নেতৃত্ব দেন ও মিডদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিন বছরের মধ্যে তিনি শুধু পারস্যকেই মুক্ত করেননি, মিডিয়াও দখল করে নেন।সুদক্ষ ধনুর্ধর ও অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে সাইরাস বিজয় অভিযানে বের হন। তার সৈন্যরা এসেছিল কৃষক পরিবার থেকে। খ্রিস্টপূর্ব ৫৩০ অব্দে যুদ্ধে মৃত্যুর আগে তিনি জয় করেন পুরো এশিয়া মাইনর, ব্যাবিলনিয়া, সিরিয়া ও ফিলিস্তিন।সকল ধর্মের প্রতি সাইরাস ছিলেন উদার।তিনি তার জনগনকে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালম করার অধিকার দিয়েছিলেন।রাজ্য থেকে বিতাড়িত ইহুদীদের জেরুজালেমে থাকার ব্যাবস্থা করে দেন। ফলে জনগন তাকে ঈশ্বরের প্রেরিত দূত ভাবতে শুরু করে। মৃত্যুর আগেই তিনি পারসিকদের বিশ্বের অগ্রণী জাঁতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন।এসব কারনে সাইরাসকে বলা হয় ‘সাইরাস দি গ্রেট’। তাঁর মৃত্যুর চার বছর পর তার পুত্র ক্যাম্বিসেস জয় করেন মিসর। তার সময়ে পারস্য সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি ছিল পূর্ব ভারত সীমান্ত ও পশ্চিমে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত। মাত্র ২৫ বছরের মধ্যে এই বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে। এই সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ বিস্তৃতি হয় দারিউস দি গ্রেটের শাসনকালে।এ সময় মধ্য এশিয়াসহ উত্তরে বলকান উপদ্বীপ,পশ্চিমে লিবিয়া ও মিশর এবং পূর্বে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।তিনি বিভিন্ন পরিমাপের একক নির্ধারণ করেন।পাশাপাশি তিনি সোনা ও রুপার মুদ্রার প্রচলন করেন।পৃথিবীর ইতিহাসে পারস্যরা ই প্রথম এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে যোগাযোগের জন্য সড়কপথ নির্মান করেন।পৃথিবীর প্রথম ডাক সেবা ও চালু করেন তিনি। এসব কারনে দারিউস দি গ্রেট কে পারস্য সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক বলা হয়।

পারস্য সাম্রাজ্যে প্রধান ধর্ম ছিল জরথুস্ত্রবাদ।
জরথুস্ত্র ছিলেন এ ধর্মের প্রবক্তা।আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০-৫০০ এর মধ্যে ছিল জরথুস্ত্রর জীবনকাল।পারস্য সম্রাজ্যের রাজারা ছিলেন ধর্মপ্রান জরথুস্ত্রবাদী।

ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত প্রাচীন পারস্যের রাজধানী পার্সেপোলিস পৃথিবীর বিখ্যাত আর্কিওলোজিকাল সাইটগুলোর একটি। ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে জায়গাটিকে।
পার্সেপোলিসের আখেমেনীয় প্রাসাদগুলো নির্মাণ করা হয়েছিলো বিশাল আকৃতির চত্বরের ওপর। প্রাসাদের সম্মুখভাগগুলো সজ্জিত করা হতো বিভিন্ন গহনা দিয়ে। এগুলোর মধ্যে লম্বা পাথরে খোদাই করা নতোউন্নত মূর্তিগুলো অন্যতম। প্রাচীন পারস্য এই মূর্তি খোদাইয়ের জন্যও বিখ্যাত ছিল।

আখেমেনীয় সাম্রাজ্যের প্রাচীন পার্সিয়ানরা বিভিন্ন প্রকারের শিল্পের সুচনা করেছিলো। এগুলোর মধ্যে ধাতুর কাজ, পাথর খোদাই, বুনন এবং স্থাপত্যশিল্প অন্যতম। ধীরে ধীরে পার্সিয়ান সাম্রাজ্য যতো বিস্তার লাভ করেছে তাদের শিল্পকলাও ততোটাই উন্নত হয়েছে। তারা যতো আদি সভ্যতা দখল করেছে, সেই সব সভ্যতার শিল্পগুলোও নিজেদের মতো করে গড়ে তুলেছে।
প্রাচীন পার্সিয়ানদের শিল্পের উল্লেখযোগ্য একটি হলো খাড়া বাঁধের বড়ো বড়ো পাথর খোদাই করা। নাকশ-ই-রুস্তমে অবস্থিত আখেমেনীয় রাজাদের প্রাচীন সমাধি মন্দিরে এগুলো এখনও পাওয়া যায়। প্রতিটি পাথরে অঙ্কিত রয়েছে অশ্বারোহী রাজা এবং যুদ্ধ বিজয়ের প্রতিকৃতি। প্রাচীন পার্সিয়ানরা তাদের ধাতব কাজের জন্যও বিখ্যাত ছিলো। ১৮৭০ সালে স্মাগলার কিছু স্বর্ণ ও রৌপ্যের তৈরি আর্টিফ্যাক্ট খুঁজে পেয়েছিলো বর্তমান তাজিকিস্তানের অক্সাস নদী কাছে। আর্টিফ্যাক্টগুলোর মধ্যে রয়েছে কিছু ছোটো ছোটো সোনালি অশ্বরথ, মুদ্রা এবং গ্রীফনের প্যাটার্নে সজ্জিত কিছু ব্রেসলেট। (গ্রীফন পাখাওয়ালা একটি পৌরাণিক প্রাণী যেটির মাথা ঈগলের এবং শরীর ছিলো সিংহের। এটি পার্সিয়ান রাজধানী পার্সেপোলিসের প্রতীক ছিলো।)
পাকিস্তানে নিযুক্ত ব্রিটিশ ডিপ্লোম্যাট এবং মিলিটারি সদস্যরা অক্সাস ট্রেজার নামে পরিচিত এরকম ১৮০টি স্বর্ণ ও রূপার টুকরো নিয়ে এসেছিলো লন্ডনে। এগুলো এখন রয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামের প্রদর্শনীতে।

জ্ঞান বিজ্ঞানেও পারসিকরা যথেষ্ট অবদান রেখেছে। মহান শাসক দারিয়ুস মিসরীয় রীতি অনুসারে পারসিকদের জন্য পঞ্জিকা তৈরি করেন। চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞান উন্নয়নের জন্য তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তিনি মিসরীয় চিকিৎসালয়ের সংস্কার এবং বিশিষ্ট ক্যালডীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী নেবুরিমানু ও ফিদিনুকে সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। শিল্পকলাতে পারসিকরা তেমন কোন সক্ষমতা না দেখালেও সম্রাট সাইরাস ও দারিয়ুসের প্রাসাদ নির্মাণে এবং সাইরাসের সমাধিসৌধ তৈরিতে পারসিকরা উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য জ্ঞানের পরিচয় দিয়েছে। পারস্য স্থাপত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন কাইরাসের সমাধি।পারসিকরা প্রথম দিকে কিউনিফর্ম লিপিতে লিখতো এবং লেখার কাজে উনচল্লিশটি কিউনিফর্ম চিহ্ন ব্যবহার করতো। পরবর্তীতে তারা নিজস্ব লিখন রীতিও প্রচলন করে। পারস্য সভ্যতার লিখন পদ্ধতিতে ভাষার প্রচলন ছিল ২ টি।

খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ অব্দে গ্রীসের জেরজেস দ্য ফার্স্টের আক্রমণে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই পারস্য সাম্রাজ্য পতনের দিকে হেলতে শুরু করে। গ্রীকদের কাছে পারস্যের কিছু ভূমি হারিয়ে যাওয়ায় টান পড়তে শুরু করে সাম্রাজ্যের কোষাগারে। এজন্যই পারস্যের প্রজাদের ওপর তখন মোটা অঙ্কের কর আরোপ করতে হয়েছিলো।
খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ অব্দে মেসেডোনিয়ার আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেটের সৈন্যদল পারস্য আক্রমণ করার ফলে আখেমেনীয় সাম্রাজ্যের পুরোপুরি পতন সম্পন্ন হয়। এরপরের সম্রাটরা পারস্যকে আবার আখেমেনীয় যুগের মর্যাদায় ফিরিয়ে নেওয়ার অনেক চেষ্টাই করেছে। কিন্তু কখনোই সফল হতে পারেনি বা কোনো সম্রাটই সাইরাস দ্য গ্রেটের মতো পারস্যকে বিশাল অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃতও করতে পারেনি।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button