জীবনীসাম্প্রতিক

কে এই আশরাফ হাকিমি!

বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ২–০ ব্যবধানে জেতার পর মরক্কোর ডিফেন্ডার আশরাফ হাকিমি গ্যালারির দিকে ছুটে যান। মরক্কোর পতাকা গায়ে জড়িয়ে থাকা এক মহিলার গালে এঁকে দেন চুম্বন। এরপর গায়ের জার্সি খুলে পরিয়ে দেন সেই মহিলাকে। সেই মহিলাও হাকিমিকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করেন। গোটা ফুটবল বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছিল এই ঘটনা। নিমেষের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায় সেই ছবি।

‘উহিব্বুকে উম্মি’। সঙ্গে লাল রঙের ভালোবাসা চিহ্ন। কোলাজ করা দুটি ছবির সঙ্গে আরবিতে দেওয়া এক লাইনের এই টুইট বার্তাকেও এ সময়ে ভাইরাল বলাই যায়। এই টুইটটিও করেছেন মরক্কোর এই ফুটবলার। আরবী ‘উহিব্বুকে উম্মি’ এর বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘মা, আমি তোমায় ভালোবাসি’।  আর জড়িয়ে ধরা সেই মহিলাও আর কেউ নন, আশরাফ হাকিমির জন্মদাত্রী।

কিন্তু কেন তার এই টুইট এতটা আলোচনায়? তিনি পিএসজির একজন তারকা ফুটবলার বলে, নাকি আরও গল্প আছে? আজকে সেই গল্পই জানবো আমরা।

আশরাফ হাকিমি ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর, মাদ্রিদে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মসূত্রে স্পেনের নাগরিক হলেও তিনি মরক্কোরও নাগরিক। ছোটবেলা থেকেই হাকিমির জীবন অত্যন্ত সংগ্রামের। আর এই সংগ্রামের অন্যতম সারথি তার মা সাইদা মু। যিনি তাঁর সন্তানদের মানুষ করতে করেছেন পাহাড়সমান কষ্ট। পরিবার সামলাতে স্পেনে বাসাবাড়িতে পরিচ্ছন্নকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। সেইসাথে মাদ্রিদের রাস্তায় বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রি করতেন হাকিমির বাবা।

পরিবারের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে আশরাফ বলেন, ‘আমরা একটি সাধারণ পরিবার থেকে এসেছি। যারা জীবিকার জন্য সংগ্রাম করেছিল। আজ আমি প্রতিদিন তাঁদের জন্য লড়াই করি। তাঁরা আমার জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। তাঁরা (মা-বাবা) আমার ভাইদের আমার সফলতার জন্য অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করেছিলেন।’

হাকিমিকে ফুটবলার হিসেবে তৈরি করতে শুরু থেকেই মনোযোগ দেন তার পিতা-মাতা। ফুটবল তাদের জীবন বদলে দেবে, এটাই সবসময় মনে করেছেন মা সাইদা। ২০০৬ সালে, মাত্র ৮ বছর বয়সে হাকিমিকে পাঠান রিয়াল মাদ্রিদের ইউথ সেটআপে। প্রতিভার জোরেই সেখানে টিকে যান ছোট্ট হাকিমি। এরপর তার জীবনের গতিপথ ঘুরে যায়। মাদ্রিদে জন্মগ্রহণ করা সত্ত্বেও তাকে কম বয়সী অস্পেনীয় খেলোয়াড়দের মধ্যে ফেলা হয়। রিয়ালের একাডেমি থেকে ধীরে ধীরে পেশাদার ফুটবলার হয়ে ওঠেন তিনি। 

শিকড়ের প্রতি আশরাফ হাকিমির টানও প্রশংসনীয়। স্পেনে জন্ম হয়েছিল তার, চাইলেই খেলতে পারতেন স্পেন জাতীয় দলে। সুযোগ এসেছিল বটে, কিন্তু জন্মভূমি ছেড়ে আশরাফ হাকিমি বেছে নিয়েছেন বাপ-দাদার দেশ মরক্কোকে। এ ব্যাপারে এক সাক্ষাৎকারে হাকিমি বলেছেন, আমার বাবা-মা মরক্কোর। বাড়িতে যে ধরনের পরিবেশে বেড়ে উঠেছি, আরব সংস্কৃতির মধ্যে দিয়ে, তাতে মাদ্রিদ বা স্পেনকে কখনও নিজের জন্য সঠিক জায়গা বলে মনে হতো না।’ তার মতে, এটি তার পিতৃভূমি। ক্লাব ফুটবলে খেলা মানে শুধু একটি শহরের জন্য খেলা। আর দেশের হয়ে খেলা মানে পুরো জাতির জন্য খেলা। এই খেলা মানে পূর্বপুরুষদের জন্য খেলা।

রিয়াল মাদ্রিদের রিজার্ভ এবং যুব দলে সারা জীবন খেললেও রিয়াল মাদ্রিদের সিনিয়র দলে খেলার আগে ফিফা তাকে ২০১৬ সালে নিষিদ্ধ করে। ফিফা শুধুমাত্র অভিবাসীদের কাছ থেকে নাম পরীক্ষা করেছিল। যেখানে ছেলেটির জন্মস্থানের জায়গায় মরক্কোর নাম দেখে তাকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। অবশেষে আইনের আশ্রয় নেন হাকিমি। মামলা জেতার পরে ২০১৭ সালে, ক্লাবের মূল দলেও অভিষেক হয়ে যায় তার। এরপর ২ বছর জার্মান ক্লাব বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে ধারে খেলেন হাকিমি। তিনি তাদের জার্মান সুপার কাপ জিততে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন এবং টানা ২ বছরের জন্য আফ্রিকান সেরা যুব ফুটবলার নির্বাচিত হন।

পরে রিয়ালের কাছ থেকে পাকাপাকিভাবে তাকে কিনে নেয় ইতালিয়ান ক্লাব ইন্টার মিলান। ইন্টারে তিনি এক বছরে খেলেন ৩৭টি ম্যাচ। ইন্টার মিলানে খেলার পর গত বছর মরক্কান এই ডিফেন্ডার যোগ দেন ফরাসি জায়ান্ট প্যারিস সেন্ট জার্মেইতে (পিএসজি)। সেখানে ক্লাবের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছেন তিনি। নিখুঁত লং পাসের জন্য খ্যাতি রয়েছে এই ডিফেন্ডারের। 

ক্লাব ফুটবলে পারফরম্যান্সে ছাপটা জাতীয় দলেও দেখিয়ে চলেছেন হাকিমি। মরক্কোর অনূর্ধ্ব ১৭ ও অনূর্ধ্ব ২০ দলের হয়ে খেলার পর অনূর্ধ্ব ২৩ দলে ডাক পান ২০১৬ সালের জুনে। ওই বছরের অক্টোবরেই মরক্কোর হয়ে আন্তর্জাতিক অভিষেক। 

মরক্কো যে এবারের বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে উঠল সেখানে তার অবদান অসামান্য। গ্রুপ পর্বে প্রথম ম্যাচে মরক্কো গোলশূন্য ব্যবধানে রুখে দেয় ক্রোয়েশিয়াকে। পরের ম্যাচে বেলজিয়ামকে হারিয়ে আরও বড় চমক দেখায় তারা।

ফুটবল আশরাফ হাকিমির জীবন পাল্টে দিয়েছে। ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর হাকিমি একজন প্রতিভাবান স্প্যানিশ অভিনেত্রী হিবা আবৌককে বিয়ে করেন। তাদের ঘরে একটি পুত্র সন্তান রয়েছে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button