প্রযুক্তি

যে কারণে বিশ্বের সেরা গাড়ির স্থান দখল করে আছে রোলস রয়েস! 

বিশ্বের সবথেকে দামী এবং বিলাসবহুল গাড়ির নাম জানতে চাইলে, যে কেউই কোন ভাবনা চিন্তা ছাড়াই রোলস রয়েসের নাম বলবে। রোলস রয়েসের খ্যাতি পৃথিবী জুড়ে। এখনো পর্যন্ত সবথেকে বিলাসবহুল গাড়ি হিসেবে পরিচিত এই রোলস রয়েস। তাই এ গাড়ি নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। রোলস রয়েস খুব অল্প সংখ্যক গাড়ি তৈরি করে। কিন্তু তাদের প্রত্যেকটি গাড়িই হয় ব্যতিক্রম। দামের মত এই গাড়ির চাহিদাও আকাশচুম্বী। রোলস রয়েস সম্পর্কে কিছু দারুণ তথ্য নিয়েই আজকের এই লেখাটি। 

ব্রিটিশ অটোমোবাইল কোম্পানি রোলস-রয়েস। অটোমোবাইল শিল্পে এই নামটি বর্তমানে পরিণত হয়েছে আভিজাত্য, রুচিশীলতা এবং উৎকর্ষের আদর্শ মাপকাঠিতে। এছাড়াও অসংখ্য বিলিয়নিয়র এবং নামীদামি তারাকাদের অন্যতম পছন্দের একটি নাম হলো রোলস-রয়েস। তাই রোলস-রয়েসের গাড়িগুলোকে প্রায়ই সফলতার চূড়ান্ত উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

চার্লস রোলস এবং ফ্রেডরিখ হেনরি রয়েস নামের দুইজন ব্রিটিশ নাগরিকের হাত ধরে আজকের রোলস-রয়েসের যাত্রা শুরু হয়। তাদের নামের সাথে মিলিয়েই এই গাড়ির নামকরন হয়েছিলো ‘রোলস রয়েস’। গাড়ির সাথে সাথে জেট ইঞ্জিনও তৈরি করেছিলেন তারা।

রোলস রয়েস গাড়িগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কাস্টমাররা যেকোনো প্রয়োজনে এটিকে নিজের পছন্দমত কাস্টোমাইজ করতে পারে, যেভাবে ইচ্ছে ব্যবহার করতে পারে।

যারা রোলস রয়েস গাড়ি বানায়, তাদের নিজেদের ইচ্ছেমতো ধৈর্য এবং সময় নিয়ে কাজ করার পুরোপুরি অনুমোদন থাকে। পৃথিবীর বেশিরভাগ গাড়ি ই কারখানায় তৈরি করতে সময় লাগে ২-৩ দিন। কিন্তু একটি রোলস রয়েস তৈরি করতে  লাগে প্রায় ৬ মাস। কোনো মেশিনের সাহায্য ছাড়াই, খুবই ধীরে সুস্থে হাতের মাধ্যমে তৈরি করা হয় এই গাড়ি। আর এই জন্যেই প্রয়োজন হয় এত সময়ের। শুধু মাত্র ভারী কয়েকটি পার্টস রয়েছে, যেগুলো মেশিনের সাহায্যে এসেম্বল করা হয়। এ ধরনের এক একটি পার্টস তৈরি করতেই প্রায় ১-২ মাস সময় লাগে। মেশিনের অনুপস্থিতির জন্যে রোলস রয়েস ফ্যাক্টরি তে কোনো ধরনের শব্দ থাকে না। 

রোলস রয়েসের প্রত্যেকটি গাড়িই ইউনিক হয়ে থাকে। যখনই কোম্পানি কোনো কাস্টমারের কাছ থেকে গাড়ির অর্ডার নেয়, তখন কাস্টমার কি চায় সেটাই তাদের কাছে বেশি প্রাধান্য পায়। রোলস রয়েস কোম্পানির কাছে প্রায় ৪৫ হাজার কালার ই রয়েছে, যা দিয়ে তারা গাড়ির পেইন্টিং করে থাকে। এর মধ্য থেকেও যদি কাস্টমারের কালার পছন্দ না হয়, তাহলে কাস্টমার যে ধরনের কালার পছন্দ করবে সেটাই বানিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ওই কাস্টমারের পারমিশন ব্যতিত পুরো পৃথিবীর কেউই ওই কালারের রোলস রয়েস কিনতে পারবে না।

তবে, রোলস রয়েস সাধারণত গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী রঙ করে দেওয়া ছাড়াও গাড়িতে বিভিন্ন বিশেষায়িত ফিচার যোগ করে থাকে। এই গাড়ির ইন্টেরিয়র ও অন্যান্য গাড়ির চেয়ে ভিন্ন হয়ে থাকে। এই গাড়ির ছাদে স্পেশাল এলইডি লাইট ব্যবহার করা হয়। লাইট লাগানোর জন্যে গাড়ির ছাদে ছোট ছোট ছিদ্র করে, সেগুলোর ভেতরে ফাইবার অপটিকস লাগিয়ে দেয় কোম্পানি। 

রোলস রয়েসের একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল, এর পেইন্টিং এর কাজ কেবল একজন মানুষ ই করতে পারেন। যখন গাড়িটি কারখানা থেকে বের হয়ে আসে তখন এর কোচ লাইনটি হাতে পেইন্ট করা হয়। এই পেইন্ট করার অনুমতি প্রাপ্ত মানুষটি হচ্ছেন ‘মার্ক কুটস। মার্কের এই কাজটি খুবই মনোযোগের সাহায্যে করতে হয়। কারণ, এখানে ভুল হলে মোছা বা পালটানোর কোন সুযোগ থাকেনা। বাকি রোলস রয়েসে যে সাধারণ পেইন্টিং করা হয়, সেটা ৭ টি কোডিং লেয়ারে করা হয়। 

এ গাড়ির সীটগুলো তৈরিতেও স্পেশাল চামড়া ব্যবহার করা হয়। ইউরোপিয়ান কিছু পশু রয়েছে। যারা মূলত ঠান্ডা পরিবেশে থাকে। কারণ, এদের কখনো মশা আক্রমণ করে না, ফলে তাদের চামড়ায় কোন রকম দাগ থাকে না। তাদের চামড়া দিয়েই রোলস রয়েসের সীট তৈরি করা হয়। এই চামড়া হাত দিয়ে কেটে, পলিশ করতেই ১ সপ্তাহ ব্যায় করে কর্মচারীরা। রোলস রয়েসে যে কাঠগুলো ব্যবহার করা হয়, সেগুলো বেশিরভাগ ই বাদাম গাছের। 

এই গাড়িতে ১৪০ কি.গ্রা. এর সাউন্ড প্রুফ ফিচারস ব্যবহার করা হয়। যার কারণে, এর ভেতরে থাকা ব্যক্তি বাহিরের কোনো শব্দই শুনতে পায় না। এই গাড়ির টায়ার গুলো ও ব্যতিক্রমধর্মী। যেগুলো থেকেও কোনো ধরনের শব্দ আসে না এবং বরফের মধ্যেও আটকায় না।

রোলস রয়েস এর সামনে রয়েছে একটি অসাধারণ এবং ব্যতিক্রমধর্মী মূর্তি। যেটার নাম ‘স্পিরিট অফ এক্সটেসি’। যখনই কেউ এটিকে হাত দিয়ে স্পর্শ করবে, তখনি এটি নিজে থেকেই গাড়ির ভেতরে ঢুকে যাবে। তাই এটি চুরি করা একেবারেই অসম্ভব। 

একটি রোলস রয়েস গাড়ির মূল্য অনেক সে কথা বলাই বাহুল্য। এই গাড়ির সর্বনিম্ন দাম প্রায় ৫ কোটি টাকা। তাই সাধারণ ধনী মানুষের ও আয়ত্বের বাইরে এই গাড়ি। এসব রোলস রয়েস ব্যবহার করে দুবাই এর শেইখ, তাদের ছেলেমেয়ে, বড় বড় কোম্পানি প্রধান, এবং বিখ্যাত তারকারা। এসব ব্যাক্তিরা তাদের নিজেদের ইচ্ছেমতো গাড়ির ডিজাইন দিয়ে থাকে। অনেকেই গাড়িতে ডায়মন্ড কিংবা সোনার ব্যবহার করে। কারণ, কাস্টমার যেটাই বলবে, কোম্পানি সেটাই করতে বাধ্য। বিশ্বের সবচেয়ে দামী ও আকর্ষণীয় খেতাবের সাথে সাথে রোলস রয়েস তার মানও বজায় রেখেছে। 

একবিংশ শতাব্দীতে এসেও গাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র দক্ষ কর্মীদের ওপরই নির্ভর করে রোলস-রয়েস। পেইন্টিং থেকে শুরু করে ইঞ্জিন এসেম্বলের জটিল কাজগুলো পর্যন্ত হাতে করা হয়। উদ্দেশ্য একটাই– ক্রেতাদের সবচেয়ে সেরা এবং আকর্ষণীয় একটি গাড়ি উপহার দেয়া। এ যেন শিল্পীর নিপুণ হাতে আঁকা এক যান্ত্রিক শিল্পকর্ম। তাই তো ভোক্তা সন্তুষ্টির দিক দিয়ে রোলস-রয়েসের স্থান এখনো সবার ওপরে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button