প্রযুক্তি

কাতার বিশ্বকাপের অদ্যোপান্ত

এ বছর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্বকাপের ২২ তম আসর এবং ফুটবল বিশ্বকাপের ৯২ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম আয়োজক দেশ মধ্যপ্রাচের কোন দেশ।মরুর বুঁকে আয়োজন করা হলো “বিগ্যাস্ট শো অফ দ্যা আর্থ”। কোনো মুসলিম অধ্যুষিত দেশেও প্রথম। সব মিলিয়ে এশিয়া মহাদেশে দ্বিতীয়বার। এর আগে ২০০২ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে। যৌথভাবে বেশ সফলতার সঙ্গে তা আয়োজন করে দেশ দুটি।” কাতার বিশ্বকাপ -২০২২” যার জন্য গত এক দশক ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে কাতার।

বিশ্বকাপের পথচলা শুরু হয় ১৯৩০ সালে। তখন থেকে প্রতিবারই নির্ধারিত বছরের মে-জুন অথবা জুন-জুলাইয়ে বসে বিশ্বকাপ আসর। এ যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কাতার সেই প্রথা ভাঙতে যাচ্ছে। মে-জুন কিংবা জুন-জুলাইয়ের পরিবর্তে এবার বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নভেম্বর-ডিসেম্বরে।এ বিশ্বকাপের পর্দা উন্মোচন হয় ২১ নভেম্বর। আর ফাইনাল লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে ১৮ ডিসেম্বর। ওই দিন কাতারের জাতীয় দিবস।
এবার শীতকালে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত  হওয়ার আরও একটি বড় কারন হচ্ছে গ্রীষ্মকালে কাতারের তাপমাত্রা প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস  পর্যন্ত হয়ে থাকে।এমন গরমে কোন গ্লোবাল ইভেন্ট আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব।তাই এবার শীতকালেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্বকাপ।

গেলো বিশ্বকাপ আয়োজনে যেখানে রাশিয়ার খরচ হয়েছিলো প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। সেখানে এবার কাতারের ব্যয় দুইশো বিশ বিলিয়ন। টাকায় যা প্রায় ১৮ লাখ ৯৭ হাজার কোটি।যার সিংহভাগ ফুটবলার ও সমর্থকদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিশ্চিতে। ৩২ দলের জন্য  রয়েছে আধুনিক মানের হোটেল, বিশ্বমানের অনুশীলন সুবিধা। লাখ লাখ সমর্থকের জন্যও আয়োজনের কমতি রাখেনি কাতার। এক একটি স্টেডিয়ামের সমান আয়তনের ফ্যান জোন নির্মান করা হয়েছে শুধু খেলা দেখার জন্য। সব মিলে শুধু এই খাতেই খরচ পড়েছে প্রায় সাত লাখ কোটি টাকা।দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যয়বহুল খাত যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিশ্বকাপের সময় কয়েক লাখ মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে আকাশ পথে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি আমুল পরিবর্তন এনেছে দেশটির যোগাযোগ ব্যবস্থায়। দোহা মেট্রো, লাইট রেইল ট্রাম প্রকল্পের পাশাপাশি আসর চলাকালে রয়েছে কয়েক হাজার বিশেষ বাস। বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে বিমানবন্দরে আলাদা টার্মিনালও তৈরি করেছে কাতার। সবমিলে এ খাতে খরচ ছাড়িয়েছে ৪ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।অর্থব্যয়ের বড় অংশজুড়ে ছিলো আধুনিক স্টেডিয়াম নির্মান। যে প্রকল্পে দেশটিকে গুনতে হয়েছে প্রায় ৪ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। নতুন আট ভেন্যুর পাশাপাশি স্টেডিয়ামগুলোতে রয়েছে শতভাগ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। আধুনিক কুলিং প্রযুক্তিতে শুধু স্টেডিয়াম ঠান্ডাই থাকবে না বরং বাতাসকে রাখবে দুষণমুক্ত।জমকালো বিশ্বকাপ আয়োজনে কাতারের সবচেয়ে বড় চমক লুসাইল সিটি। অবাক হলেও সত্য শুধুমাত্র বিশ্বকাপের জন্য গড়ে উঠেছে এ শহর। ৩৮ কিলোমিটার আয়তনের নতুন এই সিটিতে ফুটবল ফ্যান ও দর্শনার্থীদের জন্য নির্মান করা হয়েছে ২২টি হোটেল। থাকছে গলফ কোর্স, থিম পার্ক, প্রাইভেট বিচ, মরু ঝর্না, অ্যাডভেঞ্চার পার্কের মতো আধুনিক ও বিনোদনের সব সুযোগ সুবিধা।ধারনা করা হচ্ছে এই বিশ্বকাপ থেকে কাতার ১৭ বিলিয়ন ডলার আয় করবে।

মোট ৫ টি শহরের ৮ টি স্টেডিয়ামে এবারের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে যার মধ্যে একটি সংস্কার করা হয়েছে বিশ্বকাপ উপলক্ষে আর বাকি ৭ টি স্টেডিয়াম ই নতুনভাবে তৈরি করা হয়েছে।কাতার স্টেডিয়ামগুলো এমনভাবে তৈরি করেছে যাতে বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর এগুলো রুপান্তর করে অন্য কাজে ব্যাবহার করতে পারে।৮ টি স্টেডিয়ামের মধ্যে ৭ টি স্টেডিয়ামের আসনগুলো বিশ্বকাপের পর সরিয়ে ফেলা হবে এবং স্টেডিয়াম ৯৭৪ শিপিং কনটেইনারস তৈরি করা হবে।

এবারের কাতার বিশ্বকাপে ম্যাচগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে “লা’ইব” যার আরবি অর্থ সুপার স্কিল প্লেয়ার।অফিশিয়াল বলের নাম “আল রিহিলা প্রো”যার আরবি অর্থ দ্যাঁ জার্নি।এই বিশ্বকাপের প্রতীক দ্বারা বিশ্বকাপের ৮ টি স্টেডিয়াম ও ইনফিনিটি প্রতীক প্রকাশ করা হয়েছে।এ বিশ্বকাপের ম্যাচ টিকেট এর দাম বাংলাদেশী টাকায় সর্বনিম্ন ৭ হাজার টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

কাতার মুসলিম প্রধান দেশ হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এলকোহলের উপর। স্টেডিয়ামের ভিতরে এলকোহল না পাওয়া গেলেও পুরো দেশ জুড়ে আয়োজকরা এলকোহল ফ্রেন্ডলি ফ্যান জোন তৈরি করেছে।আয়োজকরা আশা করছে এমন আয়োজনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে সাংস্কৃতিক পার্থক্য অনেকটাই কমে আসবে।

গত কয়েক বছরে দেশটিতে হাজার হাজার কর্মী পাড়ি জমিয়েছেন। উদ্দেশ্য, বিশ্বকাপ উপলক্ষে কাতারের অবকাঠামো নির্মাণযজ্ঞে কাজ করা। এই শ্রমিকদের সিংহভাগই যান ভারতীয় উপমহাদেশ ও ফিলিপাইন থেকে। বাকিরা যান কেনিয়া ও উগান্ডাসহ কয়েকটি আফ্রিকান দেশ থেকে।আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমের মতে গত এক দশকে কাতারে বিশ্বকাপের বিভিন্ন প্রকল্পে কাতারের কয়েক হাজার শ্রমিক মারা গিয়েছে।

বিশ্ব ফুটবলে অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে তদন্ত করে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)। কাতার বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার পরই ২০২০ সালে চাঞ্চল্যকর এক তথ্য জানায় সংস্থাটি। তাতে অভিযোগ করা হয়, ঘুষ দিয়ে বিশ্বকাপের আয়োজক স্বত্ব পেয়েছে ধনী দেশ কাতার। অভিযোগপত্রে বলা হয়, আয়োজক নির্ধারণে ফিফার নির্বাহী কমিটির কয়েকজন সাবেক সদস্য ঘুষের প্রস্তাব পান। সেই প্রস্তাব তারা গ্রহণ করে কাতারের পক্ষে ভোট দেন। যদিও এমন অভিযোগ বরাবরই উড়িয়ে দিয়েছে কাতার।এছাড়াও এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের যারা কাতারে বিশ্বকাপ দেখতে যাবেন, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে ইতোমধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।কিন্তু ফিফা সকল সমালোচনাকে উপেক্ষা করে ফুটবলকে উপভোগ করার আহবান জানিয়ে আসছে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button