জানা-অজানা

হাজরে আসওয়াদ কি! কেন মুসলিমরা এটাকে এত সম্মান করে!

হাজরে আসওয়াদ’— একটি কালো রঙের প্রাচীন পাথর। যা কা’বা শরীফের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে মাতাফ থেকে ১.৫ মিটার উঁচুতে বিশেষভাবে স্থাপনকৃত। আরবি ‘হাজর’ শব্দের অর্থ পাথর আর ‘আসওয়াদ’ শব্দের অর্থ কালো। অর্থাৎ কালো পাথর। ‘হাজরে আসওয়াদ’ বেহেশতের মর্যাদাপূর্ণ একটি পাথর। যেটি পৃথিবীর প্রথম প্রভাত থেকে মক্কা নগরীতে রয়েছে। হজযাত্রীরা হজ করতে গিয়ে এতে সরাসরি বা ইশারার মাধ্যমে চুম্বন দিয়ে থাকেন।

মুসলিম বিশ্বাস অনুযায়ী, হযরত  আদম (আ:) ও হাওয়া (আ:) কে বেহেস্ত থেকে দুনিয়ায় প্রেরণের সময় এই পাথরও প্রেরিত হয়। যদিও এটি একটি উল্কার মত বিষয় কিনা তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে গবেষণা অব্যাহত আছে।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, কাবার দেয়ালে বর্তমান স্থানে হাজরে আসওয়াদ স্থাপনের কৃতিত্ব মুহাম্মদের। তিনিই ৬০৫ সালে, এটি কাবার দেয়ালে স্থাপন করেছিলেন। বর্তমানে এটি একটি রূপার ফ্রেমে আটকানো অবস্থায় কাবার সাথে সংযুক্ত রয়েছে।

হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলের নবুয়তপূর্ব সময়ে কাবা সংস্কার এবং পুনর্নির্মাণের সময়ে কাজের সুবিধার্থে পাথরটি সাময়িকভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। পরে হাজরে আসওয়াদ আগের স্থানে কে বসাবেন—এটি নিয়ে কোরাইশদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেধে যায়। তখন তারা একমত হয় যে, পরবর্তী দিন যে ব্যক্তির গেট দিয়ে সবার আগে কাবার চত্বরে আসবে, তার সিদ্ধান্ত সবাই মেনে নিবে। সেই ব্যক্তি ছিলেন ৩৫ বছর বয়সী মুহাম্মদ, তার নবীত্বের পাঁচ বছর আগে। তখন মহানবী (সা.) নিজের গায়ের চাদর খুলে তাতে হাজরে আসওয়াদ রেখে সব গোত্রপ্রধানকে চাদর ধরতে বলেন। গোত্রের প্রত্যেক নেতা কাপড়ের কোণগুলি ধরে কালো পাথরটিকে কাবা চত্বর পর্যন্ত নিয়ে যান। তারপর, নবী করিম (সা.) গোত্রের সম্মান সন্তুষ্ট করে নিজ হাতে তা কাবার দেয়ালে স্থাপন করেন এবং দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তি ঘটান।

আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)-এর শাসনামলে হাজরে আসওয়াদ ভেঙে তিন টুকরো হয়ে গিয়েছিল। ফলে তিনি তা রুপা দিয়ে বাঁধাই করেছিলেন। তাই তিনিই সর্বপ্রথম হাজরে আসওয়াদকে রুপা দিয়ে বাঁধানোর সৌভাগ্য অর্জনকারী। পরবর্তীতে ১৭৯ হিজরিতে, আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদ হাজরে আসওয়াদকে হীরা দিয়ে ছিদ্র করে রুপা দিয়ে ঢালাই করেন। 

হাদিসের গ্রন্থগুলোতে হাজরে আসওয়াদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে প্রচুর আলোচনা এসেছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘হাজরে আসওয়াদ একটি জান্নাতি পাথর, তার রং দুধের চেয়েও বেশি সাদা ছিল। এরপর বনি আদমের পাপরাশি এটিকে কালো বানিয়ে দিয়েছে (জামে তিরমিজি : ৮৭৭, মুসনাদে আহমাদ, ১/৩০৭, ৩২৯)। ইসলামপূর্ব কোরাইশদের যুগে কাবা শরিফের গিলাফ যখন পুড়ে গিয়েছিল, তখন হাজরে আসওয়াদও পুড়ে গিয়েছিল। ফলে তার কৃষ্ণতা আরো বৃদ্ধি পায়। সেইসাথে লক্ষাধিক হাজির স্পর্শের কারণে এটি মসৃণ আকার লাভ করেছে।

হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা বরকতময়। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন এ পাথর আবু কুবাইস পাহাড় থেকে বড় আকার ধারণ করে উপস্থিত হবে। সেই সময়ে আল্লাহ কর্তৃক তাকে একটি জিহ্বা ও দুটি ঠোঁট প্রদান করা হবে। তখন কে কোন নিয়তে তাকে চুম্বন করেছে, সে সম্পর্কে বক্তব্য দেবে। ’ (ইবনে খুজায়মা : ৪/২২১, মুসতাদরাকে হাকেম : ১/৪৫৭)। তবে কেউ যদি হাত দ্বারা কালো পাথর স্পর্শ করতে না পারে, তাহলে এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকবির উচ্চারণ করে নিজের হাত চুম্বন করলেও হয়ে যাবে।

হাদিসে আরও এসেছে, ‘মানুষের গুনাহ যদি হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহিমের পাথরকে স্পর্শ না করত, তাহলে যেকোনো অসুস্থ ব্যক্তি তা স্পর্শ করলে, আল্লাহর পক্ষ হতে তাকে সুস্থতা দান করা হত’ (সুনানে কুবরা, বায়হাকি: ৫/৭৫)। 

কাবাগৃহ তাওয়াফ ও প্রদক্ষিণের সময় হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করা ও চুম্বন করা সুন্নত। ফ্রেমে মুখ ঢুকিয়ে হাজরে আসওয়াদে চুম্বন করতে হয়। তাওয়াফ কারীদের লাইনে দাঁড় করিয়ে শৃংঙ্খলাবদ্ধ করেন একদল প্রহরী। সার্বক্ষণিক ভাবে সেখানে রক্ষী মোতায়েন রয়েছেন। সমবেত জনতার দিকে নজর রাখেন তারা। নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন সবকিছু। সঠিকভাবে চুম্বন দেওয়ার নিয়ম দেখিয়ে দেন। সেই সময়ে হাজরে আসওয়াদে চুম্বন করার জন্য সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়েন। চুম্বনরতদের সামাল দিতে মাঝে মধ্যে হিমশিম খেতে হয়। তারা খেয়াল রাখে, ফ্রেমে মাথা ঢোকাতে বা চুম্বন করতে কারও যেনো কষ্ট না হয়। 

তবে অনেকেরই ধারনা রয়েছে যে, মুুুসলিমরা এই পাথর টি কে উপাসনা করে। যেটি সম্পূর্ণভাবে একটি ভুল এবং ভ্রান্ত ধারনা। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) অনুসারীদের বলেছিলেন, তিনি মুহাম্মদ (সা.)-কে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করতে দেখেছিলেন। সেই ঐতিহ্যই এখনো চলমান রয়েছে। এছাড়াও, ৬৩০ সালে মক্কা বিজয়ের পর মুহাম্মদ তার উটের উপর ৭ বার কাবার চারপাশে তাওয়াফ করেন এবং শ্রদ্ধার ভঙ্গিতে লাঠি দিয়ে কালো পাথর স্পর্শ করেন বলে জানা যায়। ওযূ করা, পায়ে হেটে মসজিদে যাওয়া ইত্যাদি ইবাদত যেমন গুনাহ মাফের কারণ। তেমনি এটিও এমনই একটি কারণ। পাথরকে স্পর্শ করা বা চুমু দেওয়া যদি রাসূলের নির্দেশ না হ’ত, তাহলে একে স্পর্শ করে বরকত লাভ করার আশা করা বরং শিরক হয়ে যেত। অতএব মূলতঃ পাথরকে চুমু বা স্পর্শ নয়; বরং আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশনা অনুসরণের কারণে গুনাহ মাফ হবে। এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গ্রহনযোগ্য ব্যাখ্যা।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button