ইতিহাস

হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর নবুয়ত প্রাপ্তির ঘটনা

শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে আল্লাহ পাঠিয়েছেন মানব জাতির আলোকবর্তিকা হিসেবে। মানব জাতির জন্য তিনি আল্লাহর রহমত হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন। ইতিহাসবিদ, সর্বস্তরের জ্ঞানীগুণী মহানবী (সা.)-কে সর্বসেরা মানব হিসেবে অভিহিত করেছেন। জগদ্বাসীর ওপর আর কোনো নবী-রসুল বা ধর্ম প্রচারক তাঁর মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। 

মুহাম্মদ (সা.)-এর মাক্কি জীবনকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। নবুয়ত প্রাপ্তির আগের আর নবুয়ত প্রাপ্তির পরের। রসুলুল্লাহ (সা.) ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেন। এর আগ পর্যন্ত তিনি গোটা আরব জাতির কাছে ছিলেন আস্থার প্রতীক। আরবরা তাঁকে ‘আল আমিন’ অভিধায় অভিহিত করেছিল। আরবরা তাদের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের নিরসনে তাঁর ফয়সালার ওপর পূর্ণ আস্থা স্থাপন করত এবং সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিত।

আল্লাহ যখন রসুল (সা.)-কে সম্মানিত করতে ও মানব জাতিকে তাঁর দ্বারা অনুগৃহীত করতে মনস্থ করলেন, তখন রসুল (সা.) নবুয়তের অংশ হিসেবে স্বপ্ন দেখতে থাকেন। তখন তিনি যে স্বপ্নই দেখতেন তা ভোরের সূর্যোদয়ের মতো বাস্তব হয়ে দেখা দিত। এ সময় আল্লাহ তাঁকে নির্জনে অবস্থান করার জন্য আগ্রহী করেন। একাকী অবস্থান তাঁর কাছে সর্বাধিক পছন্দনীয় হয়ে ওঠে। ত্রিশ বছর বয়স হয়ে যাওয়ার পর নবী প্রায়ই মক্কার অদূরে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটাতেন। তাঁর স্ত্রী খাদিজা নিয়মিত তাঁকে খাবার দিয়ে আসতেন।

আবদুল মালেক ইবনে উবাইদুল্লাহ বলেন, আল্লাহ যখন নবুয়তের সূচনা করলেন, তখন তিনি কোনো প্রয়োজনে বাইরে বেরোলে লোকালয় ছেড়ে অনেক দূরে মক্কার পার্বত্য উপত্যকায় ও সমভূমিতে চলে যেতেন। তখন যে-কোনো পাথর বা গাছের পাশ দিয়েই যেতেন ওই পাথর বা গাছ বলে উঠত আসসালামু আলাইকুম ইয়া রসুলুল্লাহ। তখন রসুল (সা.) পাশে তাকিয়ে গাছ-পাথর ছাড়া কিছুই দেখতেন না। 

এভাবে এক্দিন তিনি হেরা গুহায় তাশরীফ আনেন, এমন সময় তাঁকে নবুয়তের পদমর্যাদা দিয়ে সৌভাগ্যবান করার পবিত্র মুহুর্ত এসে যায়। জন্মের ৪১ তম বছরে ২৭ ই রজব (হিজরতের ১৩ বছর পূর্বে) মোতাবেক ৬১০ খৃষ্টাব্দ তারিখে জাগ্রত ও চৈতন্য অবস্থায় এ ঘটনা সংঘটিত হয়। আল্লাহর ফেরেশতা জিবরাইল (আঃ) প্রথমবারের মত তাঁর কাছে আসেন।পৃথিবীবাসীদের জন্য আল্লাহর সর্বশেষ ঐষীবাণী, বিশ্বমানবতার মুক্তির পথের দিশারী, জ্বিন ও মানুষের জন্য পরিপূর্ণ জীবন বিধান ‘আল কুরআনুল কারীম’ এর সর্বপ্রথম কথাগুলো নিয়ে তাঁর কাছে উপস্থিত হলেন। জিবরাইল (আঃ) এসে বলেন,“পড় তোমার প্রভুর নামে”। তিনি উত্তর দিলেন: আমি কি ভাবে পড়ব? ফেরেশতা বললেন:

১. পড় তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।

২. সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে।

৩. পাঠ করুন আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু।

৪. যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।

৫. শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতো না। (সূরা আলাকঃ ১-৫)

উত্তরে নবী জানান: তিনি পড়তে জানেন না।

এতে জিব্রাইল তাকে জড়িয়ে ধরে প্রবল চাপ প্রয়োগ করেন এবং আবার একই কথা বলেন। কিন্তু এবারও মুহাম্মাদ নিজের অপারগতার কথা প্রকাশ করেন। এভাবে তিনবার চাপ দেয়ার পর মুহাম্মাদ পড়তে সমর্থ হন। অবর্তীর্ণ হয় কুরআনের প্রথম আয়াত গুচ্ছ। সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত। 

রাসূলুল্লাহ (সা.) এই আকস্মিক ঘটনায় খুবই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি বিপদের আশঙ্কা করতে লাগলেন এবং নিজের ঘরে ফিরে গেলেন। ভয়ের কারণে তাঁর কাঁধে কাঁপছিল। ঘরে পৌঁছে হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহাকে বললেন: আমাকে ঢেকে দাও, আমাকে ঢেকে দাও। হযরত খাদিজা রাদিঃ তাঁকে ভয় পাওয়া ও ভীত হওয়ার কারন জিজ্ঞেস করলেন। তিনি তখন সকল ঘটনা বর্ণনা করলেন। 

ঘটনা শোনার পর পবিত্র রমণী খাদিজা (রা.) বুঝতে পারলেন যে, তার স্বামীর ওপর মহান সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ বর্ষিত হয়েছে। তিনি তাকে সাহস ও উৎসাহ দান করলেন। তিনি ভাবলেন, তার জ্ঞানী ও মনীষী চাচাতো ভাই ওয়ারাকা বিন নওফেল এর সাহায্য নেওয়া দরকার। ইহুদি ও খ্রিস্টধর্ম সম্বন্ধে তাকে বিশেষজ্ঞ বলে ভাবা হতো।  খাদিজা (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.) কে সাথে নিয়ে তার কাছে গেলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সব ঘটনা ওয়ারাকা কে খুলে বললেন।

ওয়ারাকা শুনতেই বলেন যে, মুসা (আ.) ও ঈসা (আ.) অনুরূপ ঐশীবাণী লাভ করেছিলেন। তাঁর এ উৎসাহসূচক কথাবার্তা ও আশ্বাসের বাণীতে মহানবী (সা.) স্বস্তির নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।

এভাবেই নবীজি (সা.) এর নবুওতের সূচনা হয়। নবুয়ত প্রাপ্তির পর রসুলুল্লাহ (সা.) গোপনে ৩ বছর দাওয়াতের কাজ পরিচালনা করেন। তিন বছর যাবৎ গোপন দাওয়াত দেওয়ার পর আল্লাহর হুকুম হলো প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়ার। 

তখন মহানবী (সা.) আল্লাহর একাত্ববাদের মাহাত্ম্য সম্বন্ধে এক হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা দেন। সাম্য, মৈত্রী ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের দৃঢ় বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তিনি সবাইকে ইসলাম কবুল করতে অনুরোধ করেন। পরবর্তী ৪ বছর প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের ফলে নবদীক্ষিতদের সংখ্যা বেড়ে গেল। মক্কার অনেক লোক ওই সময় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন। তাদের অনেকেই ইসলামের পরবর্তী ইতিহাসে খুব প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। রাসূল (সা.) এর নেতৃত্বে পরবর্তীতে মদিনায় হিজরত এবং সেখানে দুনিয়ার প্রথম কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়। মক্কা জয় করে ইসলাম আরব ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। 

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button