আন্তর্জাতিক

‘দ্য টার্মিনাল ম্যান’ নামে খ্যাত মেহরান করিমি নাসেরির করুণ পরিণতি 

মেহরান করিমি নাসেরি। জীবনের ১৮ টি বছর বিমানবন্দরে কাটিয়ে দেওয়া এক দূর্ভাগা ব্যক্তি। যিনি অধিক পরিচিত স্যর আলফ্রেড মেহরান হিসাবে। সামান্য একটা ভুলের কারণে যিনি হারিয়েছিলেন নিজ দেশের নাগরিকত্ব। চলুন যেনে আসি, এই মানুষটির করুণ পরিণিতির কাহিনী।

মেহেরান করিমী নাসেরি ১৯৪৫ সালে, ইরানের খাজিস্তান প্রদেশে মসজিদ সোলায়মান নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন ইরানের অ্যাংলো-পার্সিয়ান তেল কোম্পানির চিকিত্সক। তার মাও কর্মসূত্রে এই কোম্পানিতে নার্স ছিলেন। ১৯৭৩ সালে, ইউনির্ভাসিটি অব ব্রাডফোর্ড থেকে ৩ বছরের একটি কোর্স করার জন্য ব্রিটেনে যান ‘দ্য টার্মিনাল ম্যান’ খ্যাত নাসেরি। তারপর ফের ইরানে ফিরে যান তিনি।

ঘটনা্টা ১৯৭৭ সালের। ইরানে শিয়াদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় স্বদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয় নাসেরিকে। এ ব্যাপারে নাসেরি দাবি করেন, ইরানের শেষ রাজা মহম্মদ রেজা শাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় তাকে ইরান থেকে বার করে দেওয়া হয়। এরপর একাধিক দেশের নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে থাকেন তিনি। তবে তার আবেদন গৃহীত হয়নি।

অতঃপর বেলজিয়ামের ‘ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশনার ফর রিফিউজি’ তাকে উদ্বাস্তু তকমা দেয়। উদ্বাস্তু তকমা মেলায় তিনি ইউরোপের যে কোন দেশে ঢোকার অনুমতি পেয়ে যান। তবে তার মা ইংল্যান্ডের নাগরিক থাকায় বাকি জীবনটা ইংল্যান্ডে কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

পথে মধ্যে ফ্রান্সের বিমানবন্দরে বিমান পরিবর্তনের সময় তার পাসপোর্ট সহ অন্যান্য কাগজপত্র ভর্তি ব্রিফকেস চুরি হয়ে যায়। ফ্রান্স থেকে বিমানে তাকে ইংল্যান্ড নিয়ে গেলেও সেখানে ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট জমা দিতে না পারায় তাকে আবার ফ্রান্সে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ফ্রান্সে পৌছানোর সাথে সাথে তাকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু শেষমেশ তিনি ছাড়া পেয়েছিলেন। কারণ, লন্ডনের জন্য ফ্রান্সের বিমানবন্দর থেকে বিমান ধরার সময় তিনি নথি দেখিয়েছিলেন। যেহেতু আইন সিদ্ধ ভাবে তিনি ফ্রান্স বিমান বন্দরে পৌছেন সেহেতু ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু পাসপোর্ট না থাকায় তাকে কোন দেশের নাগরিকের মর্যাদা দিয়ে সেখানে পাঠাতেও পারছিল না ফ্রান্সের কর্তৃপক্ষ। 

অবশেষে বিমান বন্দরের এক নম্বর টারমিনালের বাসিন্দা হিসাবে বসবাস শুরু করেন নাসেরি। বিমানবন্দরের এক পাশে তার ব্যবহৃত ট্রলি দিয়ে ঘিরে বসবাসের জন্য স্থান নির্বাচন করেন। ১৯৮৮ সালের ২৬ আগস্ট থেকে ২০০৬ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি ফ্রান্সের ‘শার্লে দি গৌলে’ বিমানবন্দরে থেকেছেন। থাকা, খাওয়া সব কিছুরই সঙ্গী ছিল এই বিমানবন্দর। সেখানে বসে তিনি তার জীবনের গল্প লিখতেন এবং বই আর খবরের কাগজ পড়ে ও লেখালেখি করে সময় পার করতেন। মাঝখানে ১৯৯৫ সালে, অনেক প্রচেষ্টার পর বেলজিয়ামে শর্ত সাপেক্ষে যাবার অনুমতি পান নাসেরি। কিন্তু ইংল্যান্ডে যাবার মূল উদ্দেশ্য থাকায় তা গ্রহণ করেননি তিনি।

তাকে বিমানবন্দর থেকে অন্যত্র সরানোর অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। মামলাও হয়েছে। কিন্তু ১৯৯২ সালে, ফ্রান্সের আদালত জানিয়ে দেয়, নাসেরি বেআইনিভাবে বিমানবন্দরে প্রবেশ করেননি। তাই তাকে সেখান থেকে সরানো যাবে না। 

নাসেরির বিমানবন্দরের জীবন অবসান হয় ২০০৬ সালের জুলাই মাসে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে হস্তান্তরের মাধ্যমে। এর আগ পর্যন্ত কেউ তাকে বিমানবন্দর থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি।

হাসপাতালে ভর্তি করার পরই তার থাকার জায়গা ভেঙে ফেলেন বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। অবশেষে ২০০৭ সালের ৬ মার্চ, ফ্রান্সের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘রেড ক্রস’র মাধ্যমে ফ্রান্সে বসবাসের অনুমতি পান তিনি। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কিছু দিন তাকে বিমানবন্দরের কাছে একটি হোটেলে রাখা হয়। পরে তাকে অভিবাসীদের একটি হোমে নিয়ে যাওয়া হয়।

২০০৪ সালে নাসেরির আত্মজীবনী ‘দ্য টার্মিনাল ম্যান’ প্রকাশিত হয়। তার জীবনের উপর ভিত্তি করে ‘লস্ট ইন ট্রানজিট’ নামে একটি ফরাসি ফিল্ম মুক্তি পেয়েছিল। লেখক-পরিচালক অ্যালেক্সি কুরোস তাকে নিয়ে তথ্যচিত্র বানিয়েছেন। এছাড়াও তাকে নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিনে অসংখ্যবার লেখালেখি হয়েছে।

গত ১১ নভেম্বর শনিবার, হার্ট অ্যাটাকে মারা যান নাসেরি।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button