প্রযুক্তি

দুই কোরিয়া বিভক্তির ইতিহাস

কোরিয়া মূলত রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল, ১৩৯২ সালে জেসন রাজবংশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে কোরিয়া একক রাজতান্ত্রিক সম্রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতিতে কোরিয়রা অত্যন্ত একক এবং ঐক্যবদ্ধ ও শান্তি সমৃদ্ধির দেশ ছিল।

দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সুপারপাওয়ার সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঠাণ্ডা যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির অপ্রত্যাশিত ফলাফল হিসেবে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভক্ত হয়ে আছে, শুধু বিভক্ত হয়েই ক্ষান্ত হয়নি, চলেছে নানা উত্তেজনা এবং তা কখনো কখনো যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। কিন্তু কেন এমনটা হয়েছিলো? কি কারনে আলাদা হয়ে আছে দুই কোরিয়া?আজ আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তুই এসব প্রশ্নের উওর জানা ও পেছনের ইতিহাস জানা।

কোরিয়ার বিভক্তের সূত্রপাত:

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে কোরিয়া থেকে জাপানকে উৎখাত করতে দুই পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একসাথে ঝাপিয়ে পড়ে। কোরিয়ার দক্ষিন দিক থেকে আক্রমণ করে মার্কিন সেনাবাহিনী এবং উত্তর দিক থেকে আক্রমণ করে সোভিয়েত কমিউনিস্ট এর রেড আর্মি। ১৯৪৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের যৌথ বাহিনীর কাছে জাপানী বাহিনী আত্মসমর্পণ করে।১৯৪৫ সালের আগস্টে উভয় দেশের দুইজন মিলিটারি অফিসার ৩৮° অক্ষরেখা বরাবর কোরিয়াকে ভাগ করে নেয়। দক্ষিণের অংশ দখল করে নেয় আমেরিকা আর উত্তরের অংশ সোভিয়েত। এরপরই উত্তরে গড়ে উঠে সোভিয়েত মদদপুষ্ট কমিউনিস্ট শাসন ব্যবস্থা এবং দক্ষিণ দিকে আমেরিকার সামরিক সরকার গঠিত হয়।১৯৪৮ সালে, শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্র অধিকৃত দক্ষিণ কোরিয়াতে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অপরদিকে সোভিয়েত সরকার উত্তর কোরিয়ার সামরিক কর্মকর্তা কিম ইল সুংকে উত্তর কোরিয়া শাসনের দায়ভার প্রদান করেন। উত্তর কোরিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় আলাদা দুই সরকার থাকায় মতভেদ শুরু হতে থাকে এবং প্রত্যেক অংশই কোরিয়ার সার্বভৌম ক্ষমতা দাবি করতে থাকে। ফলাফল স্বরূপ শুরু হয় কোরিয়ান যুদ্ধ।

কোরীয়া যুদ্ধঃ

১৯৫০ সালের মাঝামাঝি কোরিয়া যুদ্ধ শুরু হয়, যা ৩ বছর স্থায়ী হয়েছিল। ১৯৫৩ সালে দু’পক্ষের মাঝে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ৩৮ ডিগ্রী সীমারেখায় দু’দেশের মাঝে তিন মাইল ব্যাপী ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ নির্ধারণ করা হয়। এর মাধ্যমে দুই কোরিয়ার সম্পর্কের চূড়ান্ত ইতি ঘটে। এর মাধ্যমে কোরিয়া বিভক্তির ষোলকলা পূর্ণ হয়।জাপানের শাসণ থেকে কোরিয়া মুক্তিই ছিল কোরিয়া বিভক্তির মূল কারণ। তবে কোরিয়া বিভাজন পূর্নতা পায় কোরিয়া যুদ্ধের মাধ্যমে। দুই কোরিয়া সম্প্রীতি বজায় রাখতে অনেক সময় চেষ্টা করা হলেও তা এখনো সফলতার মুখ দেখেনি।

ফলাফল ও শান্তিচুক্তি:

যুক্তরাষ্ট্র যে কোন মূল্যে এই যুদ্ধে জয় পেতে চাচ্ছিল আবার চায়নার সাথেও সংঘাত এড়াতে ছিল বদ্ধপরিকর। ১৯৫১ সালের জুলাই মাস থেকেই উত্তর-দক্ষিণ কোরিয়ার মাঝামাঝি পাঞ্জুমান গ্রামে শান্তি আলোচনা শুরু হয়। যদিও অন্যদিকে ঠিকই যুদ্ধ চলতে থাকে। তবে দুই পক্ষই অস্ত্র বিরতিতে সম্মত ছিল। কিন্তু যুদ্ধবন্দীদের কি করা হবে তা নিয়ে রয়ে যায় বিস্তর বিতর্ক। চায়না ও দক্ষিণ কোরিয়া বন্দি সৈন্যদের মুক্ত করে দিতে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্র বেঁকে বসে। এরপর চলেছে এক দীর্ঘ দরকষাকষি। প্রায় দুই বছর কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে ও জাতিসংঘের জোরালো হস্তক্ষেপে ১৯৫৩ সালের ২৭ জুলাই একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হয়। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় আর্মেস্ট্রিচ চুক্তি বাস্তবায়িত হয়। সাধারণত কোরিয়ার জনগণ যে যেখানে অবস্থান করতে চায় সেখানে থাকতে দেয়ার অনুমিত দেয়া হয়। পুরাতন  ৩৮” অক্ষরেখাকে একটু হেরফের করে সাজানো হয়। ফলে দক্ষিণ কোরিয়া এবার প্রায় ১,৫০০ স্কয়ার মাইল যায়গা বেশি পায়। কোরিয়ার এই অংশটি সম্পূর্ণ বেসামরিকীকরণ করা আছে।

কোরীয় যুদ্ধে হতাহত ও ব্যয়:

কোরিয়ান যুদ্ধটা যতটা না সংক্ষিপ্ত হয়েছিল ধ্বংসযজ্ঞ ও হতাহত ততটাই বেশি হয়েছিল। প্রায় উভয় কোরিয়া থেকেই তাদের জনসংখ্যার এক দশমাংশ নিহত হয়। সংখ্যার বিচারে উভয় কোরিয়ার মোটমাট প্রায় ৬ লক্ষ সৈন্য মারা যায়। এমনকি ১৬-১৭ লক্ষ সাধারণ মানুষ এই যুদ্ধে প্রাণ হারায়  যা কিনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধেও সাধারণ মানুষ এই হারে মারা যায়নি। এছাড়াও অগণিত  মানুষ এই যুদ্ধে নিখোঁজ হয়।  দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতায় এগিয়ে আসা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০,০০০ সৈন্য নিহত হয় ও লক্ষাধিক আহত হয়। টাকার অঙ্কেও যুক্তরাষ্ট্রের কম খরচ হয়নি।

তৎকালীন ৩০ মিলিয়ন ডলার যা আজকের ডলার মূল্যে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার তুল্য। সবমিলিয়ে এটা অন্যতম একটা ধ্বংসাত্মক যুদ্ধই ছিল যার ক্ষত এখনো দুই কোরিয়ার মানুষ বয়ে বেড়াচ্ছে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button