প্রযুক্তি

বাঙ্গালি বীর তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা

ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে তিতুমীরের নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে। তার আসল নাম মীর নাসির আলী।তিতুমীর চব্বিশ পরগনা জেলার বারাসাত মহকুমার চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।বাবা সৈয়দ মীর হাসান আলী এবং মা আবিদা রোকেয়া খাতুন। গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের পর তিনি স্থানীয় একটি মাদরাসায় লেখাপড়া করেন। পবিত্র হজ পালন করতে গিয়ে মক্কায় অবস্থানকালে তিতুমীর মুক্তিসংগ্রামের পথপ্রদর্শক সৈয়দ আহমদ শহীদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। ১৮২৭ সালে দেশে ফিরে তিতুমীর জীবন শুরু করেছিলেন একজন সমাজ ও ধর্মীয় সংস্কারক হিসেবে।  উত্তর ভারত ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে যখন ওয়াহাবি আন্দোলনের (তাহরিক-ই-মুহম্মদিয়া) জোয়ার চলছে, তখন পশ্চিম বঙ্গের বারাসাত অঞ্চলে তিতুমীরের নেতৃত্বে এই আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করে। উনিশ শতকে ভারতবর্ষে মুসলমান সমাজের ধর্মীয়, সামাজিক কুসংস্কার দূর করে মুসলিম সম্প্রদায়কে ধর্মীয় অনুশাসন পালনের সঠিক পথ নির্দেশ করাই এই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল। বাংলার ওয়াহাবিরাও তিতুমীরের নেতৃত্বে একই উদ্দেশ্যে সংগঠিত হয়েছিল। তিতুমীরের নেতৃত্বে পরিচালিত ‘তাহরিক-ই-মুহম্মদিয়া’ আন্দোলন বা ওয়াহাবি আন্দোলন ছিল উত্তর ভারতের সৈয়দ আহমদ শহীদের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত।

তিনি শুধু ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধেই লড়াই করেননি, বাংলার জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন তাঁর বাঁশের কেল্লা থেকে। তিতুমীর হিন্দু ও মুসলমান কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করেন এবং জমিদার ও ব্রিটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে নিতে উৎসাহিত করেন। চব্বিশ পরগনা ও নদীয়ার অনেক কৃষক তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁর আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কৃষকদের নিয়ে তিতুমীরের আন্দোলন অল্প কিছুদিনের মধ্যেই গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়। প্রজাদের ওপর অত্যাচারের প্রতিকার তিতুমীর করতে চেয়েছিলেন শান্তিপূর্ণভাবে ও সমঝোতার মাধ্যমে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে বারাসাতে ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। কম্পানির বিরুদ্ধে এটাই ছিল তাঁর প্রথম বিদ্রোহ। তিনি চব্বিশ পরগনার কিছু অংশ, নদীয়া ও ফরিদপুরের একাংশ নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। এই বিদ্রোহ ‘বারাসাতের বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত। এই বিদ্রোহে তিরাশি হাজার কৃষক সেনা তিতুমীরের পক্ষে যোগ দিয়েছিল। বারাসাত বিদ্রোহের পর তিতুমীর বুঝতে পারেন ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য। ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হলে প্রয়োজন সমর প্রস্তুতি ও উপযুক্ত সেনা প্রশিক্ষণ। সেনাবাহিনীর আত্মরক্ষার প্রয়োজনেএকটি দুর্গ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করেন। সময় ও অর্থাভাবে তিনি ১৮৩১ সালে কলকাতার নিকটবর্তী বারাসাতের নারিকেলবাড়িয়া গ্রামে একটি বাঁশের কেল্লা বা দুর্গ নির্মাণ করেন। বাঁশ ও কাদা দিয়ে তিনি ও তাঁর অনুসারীরা এই কেল্লা নির্মাণ করেছিলেন। ইতিহাসে এই কেল্লাই নারিকেলবাড়িয়া বাঁশের কেল্লা নামে বিখ্যাত।  এই কেল্লা তিনি প্রচলিত অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করেন। কৃষক-প্রজাদের নিয়ে প্রচলিত ও সনাতন অস্ত্রে সজ্জিত এই বাহিনীকে সামরিক কায়দায় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। এই বিরাট বাহিনী স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ও সংগ্রামী চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে তিতুমীরের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা স্থাপন করে। ইংরেজ সরকার তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার সন্ধান পেয়ে তিতুমীরকে দমন করতে উদ্যত হন। তদানীন্তন বড়লাট উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক তিতুমীরকে দমন করার জন্য ১৮৩১ সালে ১৭ নভেম্বর লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে বিরাট এক সামরিক বাহিনী প্রেরণ করেন। নদীয়া ও গোবরডাঙার জমিদাররাও তাদের পাইক বরকন্দাজদের একত্র করে ইংরেজ বাহিনীর সাথে মিলিত হয়। অবশেষে উভয়পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইংরেজদের আধুনিক মারণাস্ত্র ও গোলার আঘাতে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে। কিন্তু আত্মসমর্পণ বা পলায়নের চেয়ে দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ শ্রেয়তর মনে করে তিতুমীর ও তার ৪০ জন অনুসারী সম্মুখ সমরে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে শহীদ হন ১৯ শে নভেম্বর।

দেশের জন্য তিতুমীরের এই আত্মত্যাগ ইতিহাসে তাকে স্থায়ী আসন দিয়েছে।তিতুমীরকে স্মরণ করে দিবসটি বাংলাদেশসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে পালিত হয়ে থাকে। ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা তাঁকে স্মরণ করেন ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে লড়াকু সৈনিক হিসেবে। আর বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও কৃষক সংগঠন তাঁকে মনে করে অত্যাচারী জমিদার এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কৃষক নেতা হিসেবে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button