ইতিহাস

বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আইনস্টাইনের জীবনের উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা

‘জিনিয়াস’ শব্দটির প্রকৃত উদাহরণ আইনস্টাইন শুধু উচ্চ বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মানুষ এবং পৃথিবীর সেরা বিজ্ঞানীই নন, তার রসবোধ ছিল অত্যন্ত উঁচুমাপের। প্রকৃতির জটিল সব রহস্য নিয়ে যিনি ভাবতে পারেন, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন কখনো সরল সহজ, কখনো তীক্ষ্ণ ব্যাঙ্গাত্মক, কখনো ভীষণ রসিক এবং প্রায় সবসময়ই, প্রচন্ড ভুলোমনা! তাঁর জীবনের কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়েই আজকের আয়োজন।

১.

আইনস্টাইন বিশ্বখ্যাত তাঁর আপেক্ষিক তত্ত্বের জন্য। ১৯৩০-এর দশকে সরবোনে বক্তৃতা দেওয়ার সময় হাস্যরসপ্রিয় আইনস্টাইন তার এই যুগান্তকারী তত্ত্বের আবিষ্কার নিয়ে একবার কৌতুক করে বলেছিলেন, ‘যদি আমার আপেক্ষিক তত্ত্ব সত্য প্রমাণিত হয়, তবে জার্মানি আমাকে জার্মান হিসেবে দাবি করবে। আর ফ্রান্স বলবে যে আমি পুরো বিশ্বের নাগরিক। কিন্তু যদি তত্ত্বটা ভুল প্রমাণিত হয়, তখন ফ্রান্স বলবে, আমি একজন জার্মান এবং জার্মানি বলবে আমি ইহুদি।’

২.

এই কিংবদন্তি মানুষটি ছোটবেলায় তুলনামূলকভাবে অনেক দেরিতে কথা বলতে শেখেন। ফলে তাঁর মা-বাবা বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। একদিন রাতে খাবার টেবিলে বসে সকলে খাচ্ছেন, এমন সময় বালক আইনস্টাইন চিৎকার করে বললেন, ‘এই স্যুপটা বড্ড গরম।’ তাঁর বাবা-মা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। ছেলের মুখে প্রথম কথা শুনে বাবা-মা বেশ অবাক হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এর আগে কেন তুমি কোনো কথা বলোনি?’ উত্তরে আইনস্টাইন বললেন, ‘কারণ, এর আগে সবকিছু ঠিকঠাক ছিল!’

৩.

১৯৩১ সালে, কৌতুক অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন আইনস্টাইনকে একবার জিজ্ঞেস করেন, ‘সবাই আমাকে সহজেই বোঝে, এজন্যই আমার এত জনপ্রিয়তা। কিন্তু মানুষ আপনাকে কেন এত পছন্দ করে বুঝলাম না।’ আইনস্টাইন সহাস্যে প্রত্যুত্তরে করেন, ‘কেউ আমাকে সহজে বুঝতে পারে না বলেই আমার এই জনপ্রিয়তা’।

৪.

বিজ্ঞানীরা বরাবরই কিছুটা ভুলোমনা হয়ে থাকেন, তবে এদিক থেকে নোবেলজয়ী বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বোধ হয় একটু বেশিই এগিয়ে ছিলেন! একবার তিনি ট্রেনে চেপে যাচ্ছিলেন। চেকার এসে টিকেট দেখতে চাইলেন। কিন্তু আইনস্টাইন তাঁর টিকিটটি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শুধু বিড়বিড় করছেন, ‘কোথায় যে রাখলাম টিকেটটা!’ চেকার আইনস্টাইনকে চিনতে পেরে বললেন, ‘স্যার আপনাকে আমি চিনতে পেরেছি। আপনি নিশ্চয়ই টিকিট কেটে উঠেছেন। আপনাকে টিকিট দেখাতে হবে না।’ আইনস্টাইন চিন্তিত মুখে বললেন, ‘না না! ওটা তো খুঁজে পেতেই হবে! না পেলে জানব কী করে, আমি কোথায় যাচ্ছিলাম!’

৫.

আইনস্টাইনের কাছে একবার আপেক্ষিকতার সহজ ব্যাখ্যা জানতে চাওয়া হলো। উত্তরে আইনস্টাইন বললেন, ‘আপনার হাত একটা জ্বলন্ত চুলার উপর ১ মিনিট ধরে রাখুন, মনে হবে এক ঘন্টা পার হয়ে গেছে। কিন্তু একজন সুন্দরী মেয়ের পাশে একঘন্টা বসে থাকুন, আপনার কাছে মনে হবে মাত্র এক মিনিট পার হলো…এটাই আপেক্ষিকতা।’

৬.

একবার আইনস্টাইন বাইরে থেকে বাসায় ফিরে দরজায় কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে তাঁর স্ত্রী ভাবলেন অন্য কেউ হয়তো আইনস্টাইনকে খুঁজতে এসেছেন, তাই তিনি বেশ বিরক্ত হয়ে চেচিয়ে বললেন, ‘আইনস্টাইন বাড়িতে নেই।’ সাথে সাথেই, চিন্তিত আইনস্টাইন কোনো কথা না বলে উল্টো হাঁটা ধরলেন।

৮.

একদিন সন্ধ্যাবেলায় প্রিন্সটনের ডিরেকটরের বাড়িতে ফোন এলো, ‘দয়া করে যদি আইনস্টাইনের বাড়ির নম্বরটা জানান!’ কিন্তু কঠিন গলায় ‘আইনস্টাইনের বাড়ির নম্বর কাউকে জানানো হবে না’ বলে ফোনটা নামিয়ে রাখেন ডিরেকটর। খানিক পরে আবার ফোন বেজে উঠল। ওপাশ থেকে শোনা গেল, ‘আমি আইনস্টাইন বলছি, বাড়ির নম্বর আর রাস্তা দুটোই ভুলে গিয়েছি। যদি দয়া করে বলে দেন।’

৯.

মানুষ মাত্রই কি ভুল হয়? নিজের ভুলভ্রান্তি নিয়ে কী ভাবতেন আইনস্টাইন? ১৯৩৫ সালে, প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য আপনার কী কী দরকার?’ আইনস্টাইন বললেন, ‘একটা ডেস্ক, কিছু কাগজ আর একটা পেনসিল। সঙ্গে দরকার বড় একটা ডাস্টবিন, যেখানে আমার সব ভুল করা বা ভুলে ভরা কাগজগুলো ফেলব।

১০.

একবার এক ছাত্র আইনস্টাইনকে জিজ্ঞেস করল, ‘গত বছর পরীক্ষায় যেসব প্রশ্ন পড়েছিল, এবারের পরীক্ষায়ও ঠিকঠিক ওই সব প্রশ্নই পড়েছে।’ ‘ঠিক বলেছ।’ আইনস্টাইন বললেন, ‘কিন্তু এ বছরের উত্তরগুলো আগেরবারের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা!’

১১.

আইনস্টাইনের স্ত্রীর নিজের স্বামী সম্পর্কে কেমন ধারণা ছিল ! তাঁর স্ত্রীকে একবার জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব কি আপনি বুঝতে পারেন?’ জবাবে তিনি বললেন, ‘না, কিন্তু আমি আমার স্বামীকে বুঝি। আমি জানি, তাঁকে বিশ্বাস করা যায়।’

১২.

এত সুন্দর ব্যাখ্যা যিনি দিতে পারেন, তিনিই কিন্তু অনেক সময় জীবনের সহজ ব্যাপারগুলো বুঝতে পারতেন না। একবার আইনস্টাইন বাড়ি বানালেন। বাড়িটা কেমন হল একদিন তিনি তা দেখতেও গেলেন। ঘুরে ঘুরে সব দেখে তিনি জানতে চাইলেন, ছোট্ট বিড়ালছানাটির জন্য কেন কোন আলাদা ছোট দরজা বানানো হয় নি? সে ঘরে ঢুকবে কী করে? আইনস্টাইনকে কোনোভাবেই বোঝানো গেল না যে, বিড়াল মূল দরজা দিয়েও ঢুকতে পারে! অবশেষে তাঁকে খুশি করার জন্য বড় দরজার পাশে আরেকটি ছোট দরজা তৈরি করে দেওয়া হল, যেন তাঁর আদরের বেড়ালছানাটি নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারে।

১৩.

গুজব আছে, সুন্দরী অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো আইনস্টাইনের প্রতি দুর্বল ছিলেন। তাই একদিন মনরো আইনস্টাইনকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন এইভাবে, ‘চলুন না, আমরা বিয়ে করে ফেলি? তাহলে আমাদের সন্তানেরা হবে সৌন্দর্য ও জ্ঞানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তান। ওরা দেখতে হবে আমার মত আর বুদ্ধিতে আপনার মত।’ আইনস্টাইন তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘আর যদি উল্টোটা হয়?

১৪.

একবার মাউন্ট উইলসন মানমন্দির পরিদর্শনে গেছেন আইনস্টাইনের স্ত্রী। সেখানকার বিশাল অপটিক্যাল টেলিস্কোপটি ছিল পৃথিবীর বৃহত্তম। এক জ্যোতির্বিদ তাঁকে জানালেন, এসব স্পর্শকাতর যন্ত্রপাতির প্রধান কাজ মহাবিশ্বের বিস্তার, আকৃতি নির্ণয়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলে উঠলেন, ‘ও। আমার স্বামী তো পুরোনো একটা খামের পেছনেই এটা করে ফেলে!’

১৫.

আলবার্ট আইনস্টাইন একবার বিজ্ঞানীদের সম্মেলনে যোগ দিতে যান। সেখানে একজন বিশিষ্ট জ্যোতির্বিদ মন্তব্য করেন, ‘অসীম বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে একজন জ্যোতির্বিদ গুরুত্বহীন একটি বিন্দু ছাড়া কিছুই নন।’ জবাবে আইনস্টাইন বলেন, ‘তবে আমার ব্যাপারটি হচ্ছে কি, ‘কোনো মানুষকে যদি আমি এ রকম গুরুত্বহীন বিন্দু মনে করি, দেখি যে ওই ব্যক্তি একজন জ্যোতির্বিদ’।

১৬.

আইনস্টাইনের এক সহকর্মী একদিন তাঁর টেলিফোন নম্বরটা চাইলেন। আইনস্টাইন তখন টেলিফোন গাইডে নিজের নম্বর খুঁজতে শুরু করেন। সহকর্মী বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘কী ব্যাপার, তুমি তোমার নিজের নম্বরটাও মনে রাখতে পারো না?’ এ কথায় আইনস্টাইন উল্টো যুক্তি দেখিয়ে বললেন, ‘যেটা আপনি বইতে পাবেন, সে তথ্যটা মুখস্থ করে মস্তিস্ক খরচ করবেন কেন?’

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button