আন্তর্জাতিকজানা-অজানা

লুঠতরাজ আর চুরির সামগ্রী দিয়ে গড়ে তোলা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য!

দুনিয়ার সব দেশেই চোর চুরি করা সম্পদ লুকিয়ে রাখে। কিন্তু এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো ব্রিটিশরা। চুরি করা সম্পদ দিয়ে রীতিমত প্রদর্শনীর আয়োজন করে তারা। আর এই প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হচ্ছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে অবস্থিত মানুষের ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক নিদর্শনের খনি ব্রিটিশ মিউজিয়াম, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাদুঘরগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি জাদুঘর। বিশ্বের সব অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতির শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত, প্রায় ১৩ মিলিয়ন নিদর্শন এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। দূর্ভাগ্যবশত এসবের বেশির ভাগই অন্য দেশ থেকে চুরি করে বা লুঠ করে আনা সম্পদ। যেখানেই মূল্যবান যা কিছু পেয়েছে, সব নিজেদের পকেটে এনে ভরেছে ব্রিটিশরা। 

এসব সম্পদের কথা বলতে গেলে সবার আগেই বলতে হয় পৃথিবী বিখ্যাত কোহিনূর হীরার কথা। যার উৎপত্তিস্থল ভারতবর্ষ। এই হীরাটি ইংল্যান্ডের রানি গর্বের সঙ্গে তাঁর মুকুটের মধ্যমণি করেছিলেন। যেটি বর্তমানে ব্রিটিশ টাওয়ার মিউজিয়ামে রক্ষিত। এই হীরার ওজন ২১.৬ গ্রাম। ১০৫.৬ মেট্রিক ক্যাডেটস হীরকখণ্ড। গোয়ালিয়রের গোলকোন্ডার খনি থেকে পাওয়া যায় হীরা। রাজপরিবারের রত্নাকর দাম নির্ণয় করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘পুরো পৃথিবীর অর্ধদিনের ব্যয় নির্বাহ করা যাবে এই হীরে দিয়ে।’ ইংরেজরা কোহিনূর হীরে চুরি করেছিল না-কি তাদের উপহার দেওয়া হয়েছিল, এই নিয়ে যথষ্ট বিতর্ক থাকলেও বেশিরভাগ মানুষ চুরি বলেই বিশ্বাস করেন। 

শুধু ভারতের কোহিনূর হিরেই নয়, উপনিবেশ গড়ার পর বিশ্বের বহু দেশ থেকে বিভিন্ন মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়েছিল ব্রিটিশরা, যা গুনে শেষ করা যাবে না। সেই জিনিসগুলোর মধ্যে আজও বহু জিনিস শোভা পাচ্ছে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। আসুন দেখে নেওয়া যাক, সেই তালিকায় উল্লেখযোগ্য কী কী রয়েছে…..

এই তালিকায় প্রথমেই রয়েছে ভারতের সুলতান টিপু সুলতানের মহামূল্যবান একটি আংটি। টিপু সুলতান তাঁর জীবদ্দশায় এই আংটিটি সবসময় আঙুলে পরে থাকতেন। ১৭৯৯ সালে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে যুদ্ধে টিপু সুলতানকে যখন হত্যা করা হয়। যুদ্ধ জয়ের স্মারক হিসাবে ইংরেজ সৈন্যরা টিপু সুলতানের তলোয়ার এবং আঙটি নিয়ে যায় ইংল্যান্ডে । তারপর থেকে এগুলি দেখা যেত ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। যদিও ২০০৪ সালে, নিলামে কিনে টিপু সুলতানের তরোয়াল দেশে ফেরান ভারতীয় নাগরিক বিজয় মালিয়া। ভাবা যায়!

এরপর বলতে হয়, গ্রিসের এলগিন মার্বেলের নাম। এটি হলো প্রাচীন গ্রিক মার্বেল পাথরের ভাস্কর্যের সমন্বয়। গ্রিসের কয়েকজন পৃথিবী বিখ্যাত শিল্পী মার্বেল পাথর খোদাই করে অসাধারণ কিছু মূর্তি তৈরি করেন। ১৮০৩ সালে, গ্রিসে উপনিবেশ গঠন করার পর লর্ড এলগিন এই বিশ্ববিখ্যাত মূর্তিগুলি গ্রিস থেকে চুরি করে নিয়ে আসে। লুঠ করা ঐতিহাসিক শ্বেতপাথরের মূর্তিগুলোর নামকরণও করা হয়েছে চোরের নাম অনুসারে। ১৯২৫ সাল পর্যন্ত, বহুবার অনুরোধ করা পরেও সেগুলি আর গ্রিসকে ফেরত দেয়নি ব্রিটেন। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে প্রদর্শিত হয় এগুলো।

এরপরেই আসে আফ্রিকা থেকে ব্রিটেনে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হিরের নাম। যা ‘গ্রেট স্টার অফ আফ্রিকা’ নাম পরিচিত। এটা এমন একটা হিরে, যার নামকরণ করা হয় খনির মালিক টমাস কুলিনানের নামে। লন্ডনে বিক্রি করা হয়। অথচ প্রায় দু’বছর এই হিরে চূড়ান্ত আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কেউ কেনেননি। এরপর ট্রান্সভাল কলোনি গভর্নমেন্ট কুলিনান কিনে নিয়ে যান এবং ব্রিটিশ রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডকে উপহার দেন। তিনিই এই হিরে আমস্টারডামে জোফেস অ্যাশার অ্যান্ড কোংকে দিয়ে কাটিং করান।

জাদুঘরে প্রবেশ করলেই বিশাল যে পাথরখন্ড চোখে পড়ে, সেটার নাম ‘রোসেটা স্টোন’। ১৭৯৯ সালের ১৯ জুলাই, সর্বপ্রথম আবিষ্কৃত হয় রোসেটা স্টোন। এই শিলালিপিতে প্রাচীন গ্রিক ও মিশরীয় ভাষায় লেখা আছে। খ্রিস্টপূর্ব ১৯৬ সালের এই শিলালিপিটি ১৮ শতকে ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধে জেতার পর মিশর থেকে ব্রিটিশরা লুঠ করে নিয়ে যায়। এই বিশেষ আকারের পাথরগুলির প্রচুর ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। এগুলিও ব্রিটিশরা বর্তমানে তাদের এই মিউজিয়ামে রেখে দিয়েছে। 

১৮৯৭ সালে, তৎকালীন বেনিন সাম্রাজ্যে (বর্তমান নাইজেরিয়া) ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক বাহিনীর লুটপাটের সময় চুরি হয়েছিল ব্রোঞ্জের তৈরি বহু ভাস্কর্য। যেগুলো পরবর্তীতে ‘বেনিন ব্রোঞ্জ’ নামে পরিচিতি পায়। এগুলোরও স্থান হয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে।

মধ্যভারতের ভোজশালার মন্দিরে ছিল এক অপূর্ব সাদা সরস্বতী প্রতিমা। কিন্তু হঠাৎ করেই কোন হদিস না রেখে মন্দির থেকে সেটি উধাও হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৮৮৬ সালে, ব্রিটিশ মিউজিয়ামে দেখা যায় এটিকে। বাকিটা আর না-ই বা বলি।

২০০৯ সালের কথা। ফ্রান্সের প্যারিসে সেবার ১৮ শতকের ব্রোঞ্জ নির্মিত একটি ইঁদুরের মাথা ও একটি খরগোশের মাথা নিলামে তোলা হয়। মূর্তি দুটি ব্যাক্তি মালিকানার। কিন্তু চীন দাবি জানায় যে, মূর্তি দুইটি চীনের। কথাটা মিথ্যে ছিলো না। ১৮৬০ সালে, আফিম যুদ্ধের সময় ফ্রেঞ্চ ও ব্রিটিশ সৈনিকেরা চীনে আসলে আরো অনেক কিছুর সাথে এই মূর্তিও তুলে নিয়ে যায়।

এভাবেই ব্রিটিশরা সারা বিশ্বের কত হীরে-জহরত, সোনা-দানা, মূল্যবান শৈল্পিক সামগ্রী লুঠ করে নিজেদের সম্পদ গড়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই।

বর্তমানে অনেক দেশই নিজেদের সামগ্রী ফিরে পেতে চাপ দিচ্ছে ব্রিটিশদের। নিজেদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ঐতিহ্য, ইতিহাস, গৌরব কে না ধারন করতে চায়! কিন্তু ব্রিটেনের দাবি, সে দেশের মিউজিয়াম এত বছর ধরে সারা বিশ্বের ইতিহাস মানুষের সামনে তুলে ধরেছে। আর সেই পরম্পরা অক্ষুণ্ণ রাখতেই এইসব বহুমূল্য ঐতিহাসিক বস্তুর কোনোটিকেই ফেরত দিতে নারাজ তারা। 

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button