জানা-অজানা

কাবা ঘরের অভ্যন্তরে কি আছে!

মুসলিম উম্মাহর ক্বেবলা পবিত্র কাবা শরিফ। এটি মুমিন মুসলমানের সবচেয়ে প্রিয় ও পবিত্র স্থান। ভৌগোলিকভাবেই পৃথিবীর মধ্যস্থলে কাবার অবস্থান। যে কারণে এটি পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল হিসেবে বিবেচিত। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কাবা জিয়ারতে আসে লাখোকোটি মুসলিম জনতা। তারা লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলে কাবা চত্ত্বর।

মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানিত এই ঘরের দরজা সব সময় বন্ধ থাকে। সেজন্য সাধারণ মানুষ মক্কায় গেলেও কাবা শরীফের ভেতরের দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য হয় না। যদিও একসময় কাবা ঘরের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। পরে কাবা ঘরে সবার অবাধ প্রবেশ বন্ধ করে দেয়া হয়। এখন শুধু বিশেষ নিয়ম মেনে বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র প্রধান ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাই ভেতরে প্রবেশ করতে পারে।

কি আছে এই কাবা ঘরের ভেতর! সেটা নিয়েই আজকের আয়োজন।

সৌদি গেজেটের তথ্য মতে, কাবা ঘরের উচ্চতা পূর্ব দিকে ১৪ মিটার, পশ্চিম দিকে ১২.১১ মিটার, উত্তর দিকে ১১.২৮ মিটার এবং দক্ষিণ দিকে ১২.১১ মিটার। কাবার পূর্ব কোনা হচ্ছে রুকন-আল- আসওয়াদ” (কাল পাথর অথবা “আল-হাজারুল-আসওয়াদ”); উত্তর কোনা হল “রুকন-আল-ইরাকী” (ইরাকী কোণ); পশ্চিমে রয়েছে “রুকন-আল-সামী” (পূর্ব-ভূমধ্য সাগরীয় কোণ) এবং দক্ষিণে “রুকন-আল-ইয়ামানী” ।  পূর্বে কাবা ঘরের ২টি দরজা ও একটি জানালা ছিল। একটি দরজা প্রবেশের জন্য আর অন্যটি বের হওয়ার জন্য। বর্তমানে একটি দরজাই রাখা হয়েছে। যেটি মূলত বাদশা খালেদের একটি উপহার। এই দরজাটি  ভূমি থেকে ২.৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এটির দৈর্ঘ্য ৩.০৬ মিটার ও প্রস্থ ১.৬৮ মিটার। ১০ সে.মি. পুরত্বের বিশ্বের সবচেয়ে দামি কাঠে তৈরি এই দরজায় ব্যবহার হয়েছে ২৮০ কেজির খাঁটি সোনা। খোদিত আছে পবিত্র কোরানের বিভিন্ন আয়াত। 

কাবা কালো সিল্কের উপরে স্বর্ণ-খচিত ক্যালিগ্রাফি করা কাপড়ের গিলাফে আবৃত থাকে। কাপড়টি ‘কিসওয়াহ’ নামে পরিচিত ; যা প্রতিবছর পরিবর্তন করা হয়। এর দুই তৃতীয়াংশে স্বর্ণ দিয়ে কোরানের বাণী এম্রোয়ডারি করা হয়। একটি কিসওয়া তৈরিতে প্রয়োজন পড়ে ৬৭০ কেজি রেশম ও ১৫ কেজি স্বর্ণ। কিসওয়াতে ব্যবহৃত সিল্ক আসে ইতালি থেকে। জার্মানি থেকে আনা হয় সোনা-রূপার প্রলেপ দেয়া সূতা। এতে মোট খরচ হয়ে থাকে ৫০ কোটি টাকার বেশি।

কাবা ঘরের সিলিংয়ে তিনটি কাঠের পিলার আছে। প্রতিটি পিলারের ব্যাস ৪৪ সে.মি.। যেখানে ঝুলে আছে বিভিন্ন ডিজাইনের প্রদীপমালা। কাবার মেঝে ও দেয়াল মার্বেল পাথরে মোজাইককৃত। এছাড়াও মর্মর পাথরের তিনটি ফলক রয়েছে। একটি দরজার ডান পাশে পূর্ব দেয়ালে, দ্বিতীয়টি উত্তর পাশের দেয়ালে, তৃতীয়টি পশ্চিম পাশের দেয়ালে। দেয়ালের ওপরের অংশে সাঁটানো সবুজ রেশমি কাপড় রয়েছে। এসব কাপড়ে স্বর্নের মাধ্যমে অঙ্কন করা আছে পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত। প্রতি তিন বছর পর পর পরিবর্তন করা হয় রেশমি কাপড় গুলো। ঘরটির ছাদ লম্বায় ১২৭ সে.মি আর প্রস্থে ১০৪ সে.মি.। কাবা ঘরে আলো প্রবেশের জন্য একটি ভেন্টিলেটার রয়েছে। কাঁচ দিয়ে ঢাকা এ ভেন্টিলেটারটি প্রস্থের দিকে স্থাপিত। 

কাবার ভেতরে একটি সিন্দুকে রয়েছে উন্নত মানের সুরভি। এছাড়াও রয়েছে বিশ্বনবীর ইবাদাত করার স্থান, সৌদি বাদশার স্মারক, একটি বাক্স আকৃতির টেবিল। যেখানে কাবাঘর মোছার জন্য কয়েকটি মখমল তোয়ালে এবং বিভিন্ন যুগের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী কয়েকটি মশাল ও পিদিম রয়েছে। যেগুলো ইতিহাসের বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দেশের রাজা-বাদশারা পবিত্র কাবা শরিফের জন্য উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন সেগুলো।

পবিত্র কাবা ঘরের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর ভেতরে বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা নেই। কাবার ভেতরে ডান পাশে একটি সোনার দরজা আছে। এই দরজার নাম ‘বাবুত তাওবা’। কাবার ছাদে ওঠার জন্য এটি দিয়ে কাবার সিঁড়ির দিকে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। 

মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা ঘরের চাবি বনি শায়বাহ গোত্রের ওসমান ইবনে তালহা রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে হস্তান্তর করেন। বংশ পরম্পরায় এখনো তারাই কাবা ঘরের চাবির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। 

রাষ্ট্রীয় কিংবা বিদেশি মেহমান না আসলে বছরে দুইবার কাবা ঘরের দরজা খোলা হয়। আর সে সময় কাবা ঘরের অভ্যন্তর বিশেষ পানি দ্বারা প্রতি বছর দুবার ধোয়া হয়, শাবান মাসের ১৫ তারিখ এবং মহররম মাসের মাঝামঝি সময়। পবিত্র কাবা শরীফ পরিষ্কারের জন্য প্রথমে দরজার সাথে লাগানো হয় বিশেষ সিঁড়ি। এরপর সারি বেঁধে ভেতরে প্রবেশ করেন সবাই। এই কাজের জন্য দরজা খোলা থাকে মাত্র ২ ঘন্টা। এ সময় কাবা ঘরের চারপাশে অবস্থান করেন স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের সদস্যরা। সাধারণত  জমজমের পানি, খাঁটি গোলাপজল,  উন্নতমানের সুগন্ধি ‘উদ’ এবং কস্তুরি ব্যবহার করা হয় কাবাঘর পরিস্কার করার জন্য। প্রথমে গোলাপের সুগন্ধিযুক্ত জমজমের পানি ঢালা হয় মেঝেতে। তারপর খালি হাতে খেজুরপাতা দিয়ে পরিস্কার করা হয়। সবশেষে দেয়াল এবং মেঝে মোছা হয় কোমল সাদা কাপড় এবং উন্নত মানের টিস্যু দিয়ে। এরপর দেয়ালগুলি পারফিউম দিয়ে সুগন্ধযুক্ত করা হয়। আর এ কাজে নেতৃত্ব দেন দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম সৌদির বাদশাহসহ দেশটির উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button