ইতিহাস

হজরত নূহ (আ.) এবং এক মহাপ্লাবনের কাহিনী!

পৃথিবীতে আল্লাহর যত গজব নাজিল হয়েছিল নুহ (আ.) এর সময়ের মহাপ্লাবন তার মধ্যে অন্যতম। এই ঘটনা ছিল মানবজাতির জন্য একটি মহা দৃষ্টান্ত ও শিক্ষা। যা পৃথিবীতে এক নতুন সভ্যতার জন্ম দিয়েছিল। পবিত্র কোরআনের একাধিক স্থানে হজরত নূহ (আ.)-এর সময়ের মহাপ্লাবনের বর্ণনা এসেছে। পূর্ববর্তী আসমানি গ্রন্থেও গুরুত্বের সঙ্গে নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। 

হজরত নূহ (আ.) এর পূর্বপুরুষের মধ্যে ৫ জন বিখ্যাত সাধক পুরুষ ছিলেন। তাদের নাম ছিল ‘ওয়াদ’, ‘সুয়া’, ‘ইয়াগুস’, ‘ইয়াউক’ ও ‘নাসর’। তাঁদের ইন্তেকালের পর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁদের স্মরণীয় করে রাখার জন্যে তাঁদের প্রতিকৃতি বা ভাস্কর্য স্থাপন করে। অতঃপর উক্ত লোকদের মৃত্যুর পরে তাঁদের পরবর্তীগণ শয়তানের ধোঁকায় পড়ে ঐ মূর্তিগুলিকেই সরাসরি উপাস্য হিসাবে পূজা শুরু করে দেয়। এভাবে যুগের পর যুগ চলতে লাগল, এক সময় পিতাদের মৃত্যু হলো ও সন্তানেরা বৃদ্ধ হলো, তারা এসব মূর্তিগুলোকে আরো সম্মান করে নিজেদের কাছে নিয়ে এলো, তাদের সামনে রাখল, এভাবে মূর্তিগুলো ওই সম্প্রদায়ের নিকট অনেক সম্মানের পাত্রে পরিণত হলো। এরপর পরবর্তী প্রজন্ম এলো, তারা এসবের ইবাদত করা শুরু করল। এভাবেই আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে ধীরে ধীরে গোটা সম্প্রদায়ের লোকেরা মূর্তি পূজায় লিপ্ত হয়ে যায়।

এমন এক সময়ে আল্লাহ তায়ালা হজরত নূহকে (আ.)-কে নবী হিসেবে প্রেরণ করলেন। আল্লাহর নির্দেশে হজরত নূহ (আ.)- তাঁর  সম্প্রদায়ের লোকদের তাওহিদের পথে আহ্বান করেন, মূর্তির পূঁজা করতে নিষেধ করেন, কিন্তু তারা হজরত নূহকেই মিথ্যারোপ করে, পথভ্রষ্ট বলে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু তিনি তাদেরকে আল্লাহর আজাব থেকে সতর্ক করতেই থাকলেন। সেইসাথে দৃঢ়কণ্ঠে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে, বিভিন্ন উপমা ও দলিল প্রমাণের মাধ্যমে তাদেরকে আল্লাহর একত্ববাদের দিকে দাওয়াত দিতে থাকেন। কিন্তু তারা সত্য গ্রহণ করল না।

সত্য গ্রহণে তাদের ছিল চরম অনীহা। হজরত নূহ (আ.) যতবার তাদের দাওয়াত দিয়েছেন, তারা কানে আঙুল দিয়ে রেখেছে, মুখমন্ডল বস্ত্রাবৃত করেছে, জেদ করেছে এবং খুব ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছে। এমন বৈরী পরিবেশে তিনি সাড়ে ৯শ বছর সম্প্রদায়ের লোকদের আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে থাকেন। যখন নুহ (আ.) নিশ্চিত হলেন যে, তাঁর জাতি যুক্তিসংগত দাওয়াত গ্রহণ করেবে না, তারা হেদায়েতের পথে আসবে না, তখন তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের থেকে নিজেকে রক্ষা করতে আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলেন।

সুরা নূহ এর ২৬-২৭ নাম্বার আয়াতে বলা আছে, “তাই তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, ‘হে আমার পালনকর্তা! আপনি পৃথিবীতে কোনো কাফের গৃহবাসীকে রেহাই দেবেন না। যদি আপনি তাদেরকে রেহাই দেন, তবে তারা আপনার বান্দাদেরকে পথভ্রষ্ট করবে এবং জন্ম দিতে থাকবে কেবল পাপাচারী, কাফের।’

আল্লাহ তায়ালা নূহ (আ.)-এর দোয়া কবুল করলেন এবং অহির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিলেন। এ সম্পর্কে সুরা মুমিনুন এর ২৭ নাম্বার আয়াতে বলা আছে, ‘আল্লাহ তায়ালা বললেন, ‘তুমি একটি নৌকা তৈরি করো। এরপর যখন আমার আদেশ আসবে এবং চুল্লি প্লাবিত হবে, তখন নৌকায় তুলে নেবে প্রত্যেক জীবের এক জোড়া এবং তোমার পরিবারবর্গকে, তাদের মধ্যে যাদের বিপক্ষে পূর্বে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাদের ছাড়া। এবং তুমি জালেমদের সম্পর্কে আমাকে কিছু বলবে না। নিশ্চয় তারা নিমজ্জিত হবে।’

নূহ (আ.) যখন নৌকা বানাতে শুরু করেন তখন সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁকে নানাভাবে তিরস্কার করতে লাগল এবং তাতে বাধা প্রদানের চেষ্টা করল। তারা বলত, হে নূহ! আশপাশে কোথাও তো নদীনালা নেই, তা হলে তুমি এই জাহাজ নির্মাণ করছ কেন? মাটিতেই কি জাহাজ চালাবে? তারা টিপ্পনি কেটে বলত, এতদিন ছিলে নবী, নবুয়তি ছেড়ে এখন হয়েছ কাঠমিস্ত্রি!

কিন্তু নূহ (আ.) জানতেন, অচিরেই তাদের উপর নেমে আসবে চিরস্থায়ী গজব। তাই তিনি তাদের কথায় কর্ণপাত না করে আল্লাহর নির্দেশ পালনে মনোনিবেশ করেন এবং যথাসময়ে নৌকার নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন। অবশেষে একদিন শুরু হলো মহাপ্লাবন। আল্লাহ তাআলা আকাশের দরজা খুলে দিলেন এবং মাটিতে ফাটলের সৃষ্টি করলেন। ফলে আসমান থেকে মুষলধারে বৃষ্টি নামল এবং মাটি ফুড়ে পানির ফোয়ারা বের হতে থাকল। গাছপালা এবং বাড়িঘর ভেসে যেতে লাগল। অবিশ্বাসীরা দিগ্বিদিক ছুটতে লাগল। নূহ (আ.) ঈমানদার ব্যক্তিবর্গ এবং জোড়া জোড়া প্রাণী নিয়ে নৌকায় চড়লেন। অবিশ্বাসীদের দলভুক্ত হওয়ায় নূহ (আ.)-এর এক সন্তানও মহাপ্লাবনে মারা যায়। তাকে রক্ষার জন্য শেষ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন হজরত নূহ (আ.)। 

এই প্লাবনে নৌকার আরোহী ছাড়া পৃথিবীর সব প্রাণী মারা যায়। সবকিছু ধ্বংস হওয়ার পর আল্লাহর হুকুমে আসমানের বৃষ্টি থামে, জমিন পানি শোষণ করে নেয়। ঈমানদারদের দ্বারা পৃথিবী আবার নতুন করে আবাদ হয়। সবুজ গাছপালা এবং ফুল-পাখিতে ভরে ওঠে দুনিয়া। সেই ঈমানদারদের জন্যই কেবল সুশোভিত হয় দুনিয়া। টিকেও থাকে ঈমানদারদের উসিলায়। 

এ ঘটনাটি এমন এক সময়ের সাথে সম্পর্কিত যখন সমগ্র মানব জাতি দুনিয়ার একই এলাকায় অবস্থান করত, তারপর সেখান থেকে তাদের বংশধরেরা দুনিয়ার চতুরদিকে ছড়িয়ে পড়ে৷ তাই সকল জাতি তাদের উন্মেষকালীন ইতিহাসে একটি সর্বব্যাপী প্লাবনের ঘটনা নির্দেশ করেছে৷ অবশ্য কালের আবর্তনের এর যথার্থ বিস্তারিত তথ্যাদি বিস্মৃত হয়ে গেছে এবং প্রত্যেকে নিজের চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী আসল ঘটনার গায়ে প্রলেপ লাগিয়ে এক একটা বিরাট কল্পকাহিনী তৈরী করেছে৷

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button