সাম্প্রতিক

ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী কে এই ঋষি সুনাক!

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসেছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষি সুনাক। ইতোমধ্যেই তরুণ প্রজন্মের নেতা হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে যথেষ্ট গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন তিনি।

ঋষি সুনাক ১৯৮০ সালের ১২ মে, দক্ষিণ-পূর্ব ব্রিটেনের সাউদাম্পটনে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা যশবীর সুনাক জন্মগ্রহণ করেন কেনিয়ায়। তিনি পেশায় একজন জিপি (জেনারেল প্র্যাকটিশনার) ছিলেন। তার মা ঊষা সুনাক জন্মগ্রহণ করেন তৎকালীন তাঙ্গানিকায়, যা বর্তমানে তানজানিয়ার অংশ। তিনি একজন ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। ঋষির দাদা-দাদি ব্রিটিশ ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। ঋষি সুনাকের বাবা-মা ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেও তারা একসময় থাকতেন পূর্ব আফ্রিকায়, এবং ১৯৬০ এর দশকে সন্তানদের সঙ্গে নিয়ে পূর্ব আফ্রিকা থেকে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান।

ব্রিটেনের রমসি, হ্যাম্পশায়ারের স্ট্রউড স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন ঋষি। পরে উইনচেস্টার কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়ালেখা করেন। ২০০১ সালে, অক্সফোর্ডের লিঙ্কন কলেজে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। মেধাবী ছাত্র সুনাক আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে এমবিএ-ও করেন।

সেখানেই তার সঙ্গে পরিচয় হয় ভারতীয় ধনকুবের এবং আইটি সেবা কম্পানি ইনফোসিসের প্রতিষ্ঠাতা নারায়ণ মূর্তির মেয়ে অক্ষতার সঙ্গে। সেখান থেকেই প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে তাদের। পরে ২০০৯ সালে, বিয়ে করেন তারা। বর্তমানে এই দম্পতির দুই মেয়ে রয়েছে।

পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই চাকরি শুরু করেন সুনাক। ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত মার্কিন বিনিয়োগ কম্পানি গোল্ডম্যান সাক্‌সে চাকরি করেছেন তিনি। পরবর্তীতে হেজ ফান্ড ফার্মের অংশীদার হন। রাজনীতিতে আসার আগে ঋষি একটি বিলিয়ন পাউন্ডের গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ কোম্পানি যুক্তরাজ্যে ছোট ব্যবসায় বিনিয়োগে সহায়তা করত।

ব্যবসায় থেকেই সরাসরি রাজনীতিতে নাম লেখান সুনাক। ২০১৪ সালে, ইয়র্কশায়ারের রিচমন্ড আসনে প্রথমবার কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী হন। ক্ষমতার রাজনীতিতে দ্রুত উত্থান হয় তার। ২০১৫ সালে, ইয়র্কশায়ারের রিচমন্ড আসন থেকে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন তিনি। থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

২০১৯ সালে, বরিস জনসন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কনজারভেটিভ পার্টির রাজনীতিতে তার গুরুত্ব আরও বাড়ে। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে, বরিস জনসনের সঙ্গে মনোমালিন্যের জের ধরে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাজিদ জাভিদ পদত্যাগ করলে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন ঋষি সুনাক।

তবে বাজেট বিতর্কের জেরে গত ৫ জুলাই পদত্যাগ করেন ঋষি। তার পদত্যাগে বরিস জনসন সরকারের ওপর চাপ আরো বেড়ে যায়। যার জেরে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ব্রিটিশ এই প্রধানমন্ত্রী।

এরপর বরিসের উত্তরসূরী হওয়ার প্রতিযোগিতায় নাম লেখান ঋষি। তবে সুনাক অর্থমন্ত্রী থাকাকালীনই জানাজানি হয়, তার স্ত্রী অক্ষতা ট্যাক্সের কারণে ‘নন ডমিসাইলড’ – অর্থাৎ বিদেশে তার উপার্জিত অর্থের জন্য তিনি ব্রিটেনে কোনও আয়কর দেন না। এ ঘটনা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বিরাট অস্থিরতা বয়ে এনেছিল। শেষপর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বী লিজ ট্রাসের কাছে হেরে যান তিনি। শেষমেশ তারই সরকারের দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন বাজেটে আর্থিক খাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ায় দলের ভেতর প্রচণ্ড চাপে পড়ে গত সপ্তাহে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী লিজ ট্রাস। এর পরপরই আবারও নেতৃত্বের ব্যাপারে তার প্রার্থিতা ঘোষণা করেন ঋষি সুনাক।

এবার আর ঋষির পথে কেউ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেননি। ফলে ব্রিটেনের ইতিহাসে প্রথমবারের মত ভারতীয় বংশোদ্ভূত অভিবাসীর সন্তান, একজন অশ্বেতাঙ্গ, এশীয় এবং প্রথম হিন্দু ধর্মাবলম্বী নেতা হিসাবে দেশ চালাবেন। এখানেই শেষ নয়, গত ২০০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে মাত্র ৪২ বছর বয়সে প্রথম যুক্তরাজ্যের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীও হচ্ছেন তিনি।

বর্তমানে মাত্র ৪২ বছর বয়সী সুনাককে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে ধনী এমপি বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু তার সম্পদের পরিমাণ ঠিক কত, সে ব্যাপারে প্রকাশ্যে কখনো কোনো মন্তব্য করেননি তিনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্যমতে, বর্তমানে ৭৩০ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পত্তি রয়েছে সুনাক পরিবারের। বিভিন্ন সময়ে তার দলের ভেতর থেকেই প্রশ্ন উঠেছে প্রাইভেট স্কুলে পড়া এবং কোটিপতি ঋষি সুনাক অর্থনৈতিক সংকটে পড়া সাধারণ মানুষের দুর্দশা কতটা অনুধাবন করবেন! সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা….

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also
Close
Back to top button