জীবনী

মাহমুদুল হাসান সোহাগঃ অন্য রকম বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা!

ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ার স্বপ্ন দেখা প্রতিটি শিক্ষার্থীই জানেন, ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রস্তুতি নেওয়ার জন্যে ‘উদ্ভাস’ এর মত বন্ধুত্বপূর্ণ এবং শিক্ষার্থী সহায়ক প্রতিষ্ঠান আর দ্বিতীয় টি নেই। যার প্রতিষ্ঠাতার লক্ষ্যই ছিলো, এমন একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা কোনো বাধা ছাড়াই যত ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পারবে। বলছিলাম, বর্তমান তরুণ উদ্যোক্তাদের আইকন মাহমুদুল হাসান সোহাগের কথা।

মাহমুদুল হাসান সোহাগ ১৯৮১ সালের ৭ জুন, জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আবুল হোসেন পেশায় একজন শিক্ষক এবং মাতা মনোয়ারা বেগম, ডাক বিভাগের একজন কর্মকর্তা। এই দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট সোহাগ। সরিষাবাড়ীর স্থানীয় প্রতিষ্ঠান নাসিরউদ্দিন কিন্ডারগার্টেনে প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয় তার। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে, রিয়াজ উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিকে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ঢাকা বোর্ডে ৫ম স্থান অধিকার করেন তিনি। ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। ২০০০ সালে, পুনরায় ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসিতে ঢাকা বোর্ডে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৪র্থ স্থান অধিকার করেন তিনি। পড়ালেখায় ভালো হওয়ায় তার মা-বাবা চেয়েছেন ছেলেকে ডাক্তার বানাবেন, কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন প্রকৌশলী হতে। সেই ইচ্ছে থেকেই এরপর বুয়েটে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন।

ছাত্র থাকাকালেই তিনি বুয়েট আইআইসিটিতে রিসার্চ এসিসটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন এবং পড়াশোনা শেষে রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সেখানেই যোগদান করেন। সেটাই তার জীবনের প্রথম এবং শেষ চাকরি। তিনি সবসময় চেয়েছিলেন একজন উদ্যোক্তা হবেন। বুয়েটে অধ্যয়নরত থাকাকালীনই বিভিন্ন প্রযুক্তি আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন। যার মূল লক্ষ্য ছিল দেশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা।

তবে মাহমুদুল হাসানের উদ্যোক্তা–জীবনের শুরু আরও আগে, ১৯ বছর বয়সে। ২০০০ সালে, বুয়েটে ভর্তি হওয়ার পরপরই সেশনজটের কারণে অখণ্ড অবকাশের সুযোগ পাওয়া যায়। তিনি খেয়াল করেন যে, ক্লাসে শিক্ষকদের পড়ানোর পর প্রশ্ন করার তেমন একটা সুযোগ থাকে না। শিক্ষকেরাও প্রশ্ন করাকে তেমন একটা পছন্দ তো করেনই না, বরং অনেকে প্রশ্ন করার ব্যাপারটিকে নিরুৎসাহিত করেন। সে সময়ই তিনি এমন একটি প্রতিষ্টান গড়ার পরিকল্পনা করেন, যেখানে প্রশ্ন করায় কোনো বাধা থাকবে না। সেই ভাবনা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে মিলে মাত্র ৬ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে একটা একাডেমিক কেয়ার চালু করেন, নাম দেন ‘উদ্ভাস’। 

টিউশনির টাকা জমিয়ে মাসিক ৮০০ টাকা ভাড়ায় একটি ছোট কক্ষ ভাড়া নিয়ে উদ্ভাসের যাত্রা শুরু। প্রথম ৭ বছর বেশ কষ্ট করতে হয়েছে তাদের। প্রতিষ্ঠার কয়েকমাস পর ছাত্রসংখ্যা কমতে থাকায়, জমে যায় বেশ কয়েকমাসের বকেয়া বাসা ভাড়া। এমন পরিস্থিতিতে বেশ কয়েকজন পার্টনার বিদায় নিয়ে নিলেও সোহাগ ও আরেক পার্টনার আবুল হাসান চালিয়ে নেন উদ্ভাস। সময়ের পালাবদলে সেই উদ্ভাস এখন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি সহযোগী শিক্ষা সংস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে তাদের প্রায় ৬০ টিরও বেশি শাখা রয়েছে।

তার অসামান্য মেধার স্বাক্ষর তিনি শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপেই রেখেছেন। রকমারি ডট কম, টেকশপ বাংলাদেশ লিমিটেড, পাই ল্যাবস বাংলাদেশ লিমিটেড, অন্যরকম সফটওয়ার লিমিটেড, অন্যরকম প্রকাশনী লিঃ, অন্যরকম সল্যুশনস লিমিটেড, অন্যরকম ওয়েব সার্ভিসেস লিমিটেড, অন্যরকম ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি লিমিটেডসহ এমন বেশ কিছু ব্যতিক্রমী ধারার প্রতিষ্ঠানের মাদার কোম্পানি অন্যরকম গ্রুপ এবং উদ্ভাস ও উন্মেষের সম্মানিত চেয়ারম্যান তিনি। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের গণিত অলিম্পিয়াডে একাডেমিক কাউন্সিলর হিসেবেও নিয়োজিত ছিলেন।

উদ্ভাসের পাশাপাশি ‘স্বপ্নধারা পাঠশালা’ নামের আরও একটি শিক্ষামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছে অন্যরকম পরিবার। সাইফুজ্জামান সোহাগ নামের এক যুবকের শুরু করা বস্তির সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ানোর স্কুলটি প্রতিষ্ঠাতার আকস্মিক মৃত্যুতে প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে অন্যরকম গ্রুপ সেটির দায়িত্ব নেয়। এখন সোহাগ স্বপ্নধারা পাঠশালার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পাশাপাশি উদ্ভাবন ও উদ্যোগের ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহী করা হয়। এই পাঠশালায় একটি কম্পিউটার ল্যাবও আছে।

প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আবিষ্কারেও পিছয়ে নেই এই উদ্যোক্তা। বাংলাদেশে প্রথম ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) তৈরি করে জনাব সোহাগ আলোচনায় এসেছেন বেশ আগেই। ২০১৪ সালের সিটিকর্পোরেশন নির্বাচনগুলোসহ বাংলাদেশের বেশ কিছু নির্বাচনে তার কোম্পানি পাই ল্যাবস বাংলাদেশ লিমিটেড থেকে নির্মিত ইভিএম ব্যভহৃত হয়েছে। এছাড়া তিনি ইজি ভোটিং কাউন্ট সিস্টেম (ইভিচিএস) ও ইজি ওমআর সল্যুশন সফটওয়্যারেরও জনক।

তিনি এক ইন্টারভিউতে উল্লেখ করেন, মাননীয়  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইভিএম প্রদর্শনের সময়ই “রকমারি” প্রজেক্ট এর কথা বলেছিলেন তিনি। ২০১২ সালে, প্রতিষ্ঠিত “রকমারি” ১০ বছরে পা দিয়েছে। অনেক চড়াই উৎরাই পার করে আজকে রকমারি বই প্রেমীদের নিত্যদিনের সঙ্গী। শুধু তা–ই নয়, রকমারি ও অন্যান্য ই-কমার্সের হাত ধরে দেশের ই-কমার্সেরও একটি জোয়ার তৈরি হয়েছে এই এক দশকে।

দেশের ই-কমার্স খাতে যুগান্তকারী ভুমিকা রাখার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম সম্মাননায় ভূষিত হন সোহাগ। ২০১৯ সালে, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে পেয়েছেন উদ্যোক্তা সম্মাননা- ২০১৯, আনোয়ারুল কাদির ইনোভেটর অ্যাওয়ার্ড, প্রথম আলো উদীয়মান তরুণ উদ্যোক্তা সম্মাননা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে তরুণ উদ্যোক্তা এবং ইভিএম জি কো-ইনভেন্টর হিসেবে অবদান রাখায় ‘বিশেষ সম্মাননা’ পুরস্কার। এছাড়াও বিশ্বের সর্ববৃহৎ সিটি স্কুল ‘সিটি মন্টেসরি স্কুল’ কর্তৃক ‘অ্যাম্বাসেডর অব পিস’ সম্মাননাসহ পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। এছাড়াও ২০১২ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা ইউনিভার্সিটি আয়োজিত এন্টারপ্রেনার একচেঞ্জ প্রোগ্রামের আওতায় দেড় মাস ব্যাপী এক কর্মশালায় অংশগ্রহণের জন্যে বাংলাদেশের অঅন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। 

সোহাগের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ২,০০০ এর বেশি কর্মী কাজ করছেন। খণ্ডকালীন কর্মীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি। আসলে অত্যাধিক জনসংখ্যাকে আমরা সমস্যা মনে করি; কিন্তু বাস্তবতায় জনসংখ্যাকে ঠিকমতো কাজে না লাগাতে পারাটা সমস্যা। আমাদের লক্ষ্য যদি হয় জনশক্তিকে দক্ষ করে তোলা, সমৃদ্ধ করা। তবেই আমরা অর্থনীতিতে অন্যদের থেকে এগিয়ে যাব।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button