আন্তর্জাতিকসাম্প্রতিক

২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে দুর্ভিক্ষের সম্ভাবনা! বাংলাদেশের করণীয় কি! 

সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান ডেভিড বিসলি জানান, করোনা মহামারির শুরুর পর্যায়ে বিশ্বজুড়ে যতসংখ্যক মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিল, মহামারির ২.৫ বছরে এই সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। মহামারির আগ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ক্ষুধার যে ঢেউ ছিল, মহামারির প্রভাবে তা সুনামিতে পরিণত হয়েছে।

তিনি আরো জানান, এটা অবিশ্বাস্যভাবে উদ্বেগজনক যে ৪৫টি দেশের ৫০ লাখ মানুষ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে এবং দেশগুলোতে দুর্ভিক্ষ দরজায় কড়া নাড়ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সত্যিই কী দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে?

উত্তর….হ্যাঁ। বর্তমানে খাদ্যপণ্যের মূল্য যে হারে বাড়ছে, তা অবধারিত থাকলে ২০২৩ সালের মধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য সংকট শুরু হবে। আর এই পরিস্থিতিতে এখনই যদি কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে চলমান খাদ্যপণ্যের দামজনিত সংকট, খাদ্য না পাওয়ার সংকটে পরিণত হবে। ফলে শিগগিরই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু এর পিছনে মূল কারণগুলো কি! সে ব্যাপারে একটু পর্যালোচনা করা যাক।

খাদ্যসংকটের একটি প্রধান কারণ, করোনা মহামারি। এই মহামারি বিশ্ব অর্থনীতিতে যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে সেটি এখনো কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি। ওই সময়ে চাহিদার চেয়ে কম খাদ্যশস্য উৎপাদন হওয়ায় বিশ্বে দেখা যায় খাদ্যসংকট৷ মহামারি শুরুর আগে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষের সংখ্যা ছিল সাড়ে ১৩ কোটি। করোনা মহামারির পর জিনিসপত্রের দাম ৪৫ শতাংশের বেশি বেড়ে যাওয়ায় এই সংখ্যা হয়েছে দ্বিগুণের ও বেশি।

করোনা মহামারির পর আসলো রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধ।  সেই যুদ্ধের ফলে দেয়া হয়েছে নানা নিষেধাজ্ঞা। জানা যায়, পৃথিবীতে যত মানুষ খাদ্যসংকটে ভুগছে তার মধ্যে ৬০ শতাংশ বসবাস করে যুদ্ধ-বিগ্রহকবলিত এলাকায়। ইউক্রেনে হামলা শুরুতেই কৃষ্ণসাগরের কয়েকটি বন্দর দখলে নেয় রুশ সেনারা। ফলে এসব বন্দর দিয়ে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়াও যুদ্ধ শুরু হওয়ায় খাদ্যশস্য উৎপাদনের বীজ পর্যন্ত বপন করতে পারেনি ইউক্রেন। আর বীজই যদি বপন না করতে পারে, তাহলে আগামী বছর শস্য টা আসবে কই থেকে! আর সবাই জানে, ইউক্রেন এবং রাশিয়া থেকে কৃষি পণ্যের একটা বড় অংশ বিশ্ব জুড়ে আমদানি হয়। গত জুলাইয়ে কৃষ্ণ সাগরে রুশ বাহিনীর অবরুদ্ধ করে রাখা তিনটি বন্দর থেকে ইউক্রেনে শস্য পাঠানোর অনুমতি সংক্রান্ত চুক্তি হওয়া এবং বিশ্ব বাজারে রাশিয়ার সার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা সত্ত্বেও এ বছর বিশ্বে একাধিক দুর্ভিক্ষ দেখা দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ বিষয়ে বিসলে বলেন, বিশ্বের প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ দুর্ভিক্ষের মুখে। তারা ৮২টি দেশের নাগরিক। এবং তাদের অন্তত ৩৪ কোটি ৫০ লাখ চুড়ান্ত খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ’ তিনি সতর্কতা দিয়ে বলেন, ‘রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে শিগগিরই এই সংখ্যার সঙ্গে আরও ৭০ কোটি মানুষ যুক্ত হবেন।

খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ কৃষি উৎপাদনের জন্য সার ও ডিজেলের মতো উপকরণের দাম বৃদ্ধি। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন চালানোর পরই মূলত জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পায়। চাষের জন্যে সেচ ব্যবস্থায় দরকার জ্বালানি। আর জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে উৎপাদনে। কিছু কিছু দেশ আছে যারা অন্য দেশ থেকে সার আমদানি করে, নিজেরা ফসল উৎপাদন করে। তার মধ্যে অন্যতম ব্রেড বাস্কেট নামে খ্যাত ব্রাজিল। ফলে ব্রাজিল যদি সারের অভাবে খাদ্য উৎপাদন না করতে পারে, তাহলে বৈশ্বিক ভাবে তার ফলাফল হবে ভয়াবহ। এছাড়াও আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক তাদের রিপোর্টে বলেছে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সারের ব্যাপক সংকট তৈরি হয়েছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে আফ্রিকা মহাদেশে খাদ্য উৎপাদন ২০% কমে যাবে। সেইসাথে এ বিষয়ে নজর দেওয়া না হলে আগামী বছর সার হবে একটি দুষ্প্রাপ্য বস্তু। 

এছাড়াও রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি প্রতিবেদনে বলেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় এখন তাদের পরিচালনা ব্যয় যতটা বেড়েছে সেটি দিয়ে তারা প্রতি মাসে ৪০ লাখ মানুষের খাদ্য নিশ্চয়তা দিতে পারত।

শেষ কারণটি জলবায়ুজনিত। কৃত্রিম এসব সংকটের মধ্যে বিশ্বকে বিপদে ফেলতে প্রাকৃতিক দুর্যোগও থেমে নেই। ঘূর্ণিঝড়, খরা ও বন্যার কারণে ফসলহানির শঙ্কাও বৃদ্ধি পেয়েছে। পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশই হয়তো বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে, নয়তো খরায় ভুগছে।

আর এসবের ফলশ্রুতিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ খাদ্য রপ্তানি বন্ধ করেছে কিংবা রপ্তানি নিরুৎসাহিত করার জন্য শুল্ক আরোপ করেছে। বিশ্বজুড়ে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিলে বিভিন্ন দেশ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরো জোরালো করতে পারে। খাদ্যমূল্য যদি অনেক বেড়ে যায় তখন দরিদ্র মানুষ খাবার কিনতে পারে না। আর এই লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতি দরিদ্র মানুষের জন্য বড় ধরনের সঙ্কট তৈরি করে। ফলাফলস্বরূপ দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়।

বিশ্বজুড়ে এমন পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, নিত্য পণ্যের দাম বাড়ছে, বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং জ্বালানি প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বেড়ে যাচ্ছে।

ইতিমধ্যেই ২০২৩ সালে বিশ্বে দুর্ভিক্ষ এবং অর্থনৈতিক মন্দা আরও ব্যাপকভাবে দেখা দিতে পারে এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।  সেই সঙ্গে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে প্রতিটি ইঞ্চি জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনারও আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, জমিস্বল্পতার কারণে আমাদের খাদ্যশস্যের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে কৃষিজমির অকৃষি খাতে ব্যবহার যথাসম্ভব বন্ধ করতে হবে। বিদ্যুৎ, পানি সবকিছু ব্যবহারে সাশ্রয়ী হতে হবে। এছাড়াও দুর্যোগ যথা সংঘাত, চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া, অর্থনৈতিক মন্দা প্রভৃতি মোকাবেলায় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে যেমন জরুরি, জাতীয় ক্ষেত্রেও তেমনি। তার মতে, এখন থেকে সচেষ্ট হলে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ আসবে না, বরং বিশ্ব খাদ্যসংকটে বাংলাদেশ অন্য অনেক দেশকে খাদ্য সহায়তা করতে পারবে। এজন্য তিনি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সংরক্ষণাগার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, কোনো দুর্যোগে আমাদের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আমরা যেন জমানো খাদ্যটা ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারি, সেদিকে আমাদের সকলকে নজর দিতে হবে।

নিজেদের খাদ্য উৎপাদন এবং সংরক্ষণে আমরা সকলেই যদি একটু মনযোগী হই, সাশ্রয়ী হই তাহলেই দুর্ভিক্ষের কবল থেকে নিজেদের রক্ষা করা সম্ভব। 

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also
Close
Back to top button