ইতিহাস

রাশিয়া কিভাবে এত বড় সাম্রাজ্যের অধিকারী হল!

আয়তনের দিক থেকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ দেশ রাশিয়া। যার বর্তমান আয়তন ১,৭১,২৫,১৯১ বর্গ কি.মি., যা বিশ্বের মোট ভূমির এক–অষ্টমাংশ। ইউরেশিয়ার কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অবস্থিত রাশিয়া আয়তনের দিক থেকে ইউরোপ, ওশেনিয়া ও অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ ৩টির চেয়ে বড় এবং দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের চেয়ে সামান্য ছোট! আয়তনের দিক থেকে ইউরোপ ও এশিয়া উভয় মহাদেশের বৃহত্তম এই রাষ্ট্রটিকে অন্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে বলা যায়, এটি ফ্রান্স থেকে ২৭ গুণ, জার্মানি থেকে ৪৭ গুণ এবং ভারত থেকে ৬ গুণ এবং বাংলাদেশ থেকে ১১৬ গুন বড়।  

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রাশিয়া এই বিশাল ভূখণ্ডের অধিকারী হলো কীভাবে?

রাশিয়ার আকৃতি এত বড় হওয়ার কারণটি এর ইতিহাসেই পাওয়া যায়। রুশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১,০০০ বছরেরও বেশি সময় আগে। একটি ইউরোপীয় জাতি হয়েও পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য জাতির মত সমুদ্র অতিক্রম করে দূরদূরান্তের অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করার মাধ্যমে সাম্রাজ্য বিস্তার করেনি রুশরা। তারা মূলত পূর্ব ইউরোপীয় সমভূমি থেকে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো একে একে অধিকার করে নেয়ার মাধ্যমে নিজেদের সাম্রাজ্য সৃষ্টি করেছিল। নানা যুদ্ধ–বিগ্রহ, সন্ধি, উপনিবেশ স্থাপন, অনুসন্ধান এবং কূটনীতির মাধ্যমে ক্রমে পূর্ব ইউরোপের একটি ক্ষুদ্র অঞ্চল থেকে রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ১৫শ এবং ১৬শ শতাব্দীতে রাশিয়া অনেকগুলো ছোট ছোট অঞ্চলে ভাগ হয়ে গেলে, মোঙ্গলরা এবং অন্যান্য যাযাবররা সেখানে আধিপত্য বিস্তার করা শুরু করে। এটি ততক্ষণ পর্যন্ত চলতে থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত মস্কো তাদের সবাইকে হারিয়ে কিছু রুশ অঞ্চল দখল করে।

বর্তমান রুশদের পূর্বপুরুষ স্লাভিক জাতিগোষ্ঠী বাল্টিক সাগর ও কৃষ্ণসাগরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চল থেকে আগত ভাইকিংদের সাথে সংমিশ্রণ ঘটায়। রুরিক নামক একজন ভাইকিং নেতা ৮৬২ সালে, নভগরোদ রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর মধ্য দিয়ে প্রথম রুশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। রুরিকের উত্তরসূরীরা ৮৭৯ সালে ‘কিয়েভস্কায়া রুশ’ নামে একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলে। কিন্তু ক্রমে কিয়েভস্কায়া রুশে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পেতে থাকে এবং রাষ্ট্রটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বশাসিত রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১২৮৩ সালে, নভগরোদ থেকে আগত রুরিকের উত্তরসূরীদের একাংশ মস্কোতে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গড়ে তোলেন, যেটি ‘ভেলিকোয়ে ক্নিয়াঝেস্তভো মস্কোভস্কোয়ে’ বা ‘বৃহৎ মস্কো রাজ্য’ নামে পরিচিত। পরবর্তী দুই শতাব্দীতে ধীরে ধীরে মাস্কোভির সীমানা বিস্তৃত হতে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মাস্কোভি কর্তৃক ১৩২০–এর দশকে ভ্লাদিমির–সুজদাল এবং ১৪৭৮ সালে নভগরোদ জয়। ১৪৮০ সালে, মাস্কোভি সোনালি হোর্ডের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এবং অবশিষ্ট রুশ রাষ্ট্রগুলোকে নিজস্ব শাসনাধীনে আনার প্রক্রিয়া আরম্ভ করে।

১৪৮৫ সালে, মাস্কোভি ‘ৎভের’ দখল করে নেয় এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্র লিথুয়ানিয়ার সঙ্গে বেশ কয়েকটি যুদ্ধের মাধ্যমে বিস্তৃত এক অঞ্চল দখল করে নেয়, যার ফলে ১৫০৩ সালের মধ্যে মাস্কোভির আয়তন ৩ গুণ বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও ১৫১০ থেকে ১৫২২ সালের মধ্যে আরো ৫ টি রাজ্য দখল করে নেয় মাস্কোভি। এর মধ্য দিয়ে জাতিগত রুশ–অধ্যুষিত সবগুলো স্বতন্ত্র রাষ্ট্র মাস্কোভির অন্তর্গত হয় এবং মাস্কোভির শাসকরা আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদেরকে বাইজান্টাইন সম্রাটদের উত্তরসূরী হিসেবে ঘোষণা করেন।

১৫৪৭ সালের ১৬ জানুয়ারি, মাস্কোভির শাসক চতুর্থ ইভান জুলিয়াস সিজারের নামানুসারে ‘জার’ উপাধি গ্রহণ করেন। বর্তমান রাশিয়া যে ইউরোপ ও এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত ভূখণ্ডের অধিকারী একটি বহুজাতিক, বহুধর্মাবলম্বী ও বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠেছে, এটির মূল কৃতিত্ব জার চতুর্থ ইভানের। ইভানের নেতৃত্বে রাশিয়া ১৫৫২ ও ১৫৫৬ সালে মোঙ্গল–শাসিত তাতার মুসলিম–অধ্যুষিত দুইটি রাষ্ট্র কাজান ও অস্ত্রাখান জয় করে, এবং এর মধ্য দিয়ে তাতার মুসলিমরা রুশ রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। ইভানের সময়েই রুশরা সাইবেরিয়ার বিস্তৃত জনবিরল অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা ও উপনিবেশ স্থাপন আরম্ভ করে।

মূলত এশিয়ার পতিত ভূমি সাইবেরিয়া দখল করেই প্রকান্ড আকার লাভ করে রাশিয়া। সাইবেরিয়া জনবিরল জায়গা এবং এটা কোনো সাম্রাজ্যের দখলে ছিল না। ফলশ্রুতিতে ফাঁকা মাঠে গোল দেয় রাশিয়া। 

হাজার হাজার মাইল বিস্তৃত এই অঞ্চলটি পুরো রাশিয়ার প্রায় ৭৭ ভাগ জুড়ে রয়েছে। যদি সাইবেরিয়ার আয়তনকে একটি দেশ হিসেবে তুলনা করা হয়, তবে এর আয়তন প্রায় কানাডার কাছাকাছি। অর্থাৎ সাইবেরিয়া যদি কখনো নিজেকে রাশিয়ার থেকে আলাদা করতে চায় তবে এটি বিশ্বের বৃহত্তম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হবে।

বলতে গেলে এই সাইবেরিয়াই রাশিয়াকে ভৌগালিকভাবে পৃথিবীর সব থেকে বৃহত্তম দেশে পরিণত করেছে। আন্তর্জাতিক ভৌগালিক ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির কলোসভ দুটি প্রধান দিক তুলে ধরেছেন, যার কারণে সাইবেরিয়া এবং সুদূর পূর্ব অঞ্চল প্রসারিত করার সময় কোনো প্রকার ঝামেলা হয়নি।

প্রথমত, এই বিস্তৃত এবং শীতল অঞ্চলগুলোয় জনসংখ্যা ছিল খুব কম। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২ জন, এবং ১৭শ শতাব্দীতে এই সংখ্যা আরো কম ছিল। দ্বিতীয়ত, সাইবেরিয়ায় বেশিরভাগ উপজাতির জনগণের রাশিয়ায় যোগ দিতে দেশটির কোনো আপত্তি ছিল না। যেখানে কিনা মানুষের পক্ষে জীবনযাপন করা পুরোপুরি চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। ফলে পূর্বাংশের অঞ্চলগুলিতে বিজয় অর্জনে, মস্কো কোনো বড় সমস্যার মুখোমুখি হয়নি।

যদিও কিছু সাইবেরিয়ান উপজাতি প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্তু তাদের অস্ত্র আর জনসংখ্যা রাশিয়ানদের সাথে পাল্লা দেয়ার মত ছিল না। উপরন্ত রাশানদের বয়ে আনাে গুটি বসন্তে বেশিরভাগ সাইবেরিয়ান প্রাণ হারায়। পরবর্তীতে রাশিয়া তাদের ইউরোপীয় নাগরিকদের সাইবেরিয়ায় পাঠাতে থাকে এবং সাইবেরিয়াকে চিরতরে নিজের করে নেয়।

এখনো পর্যন্ত সাইবেরিয়া এবং সুদূর প্রাচ্যের বৃহৎ অংশগুলো, বিশেষত উত্তরে, বেশির ভাগ অঞ্চলই জনশূন্যই রয়েছে এবং সেখানে এটিকে কঠোর জলবায়ু দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উত্তর মেরু বা আর্কটিক অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে এবং উত্তর মেরুর বিস্তৃত অঞ্চলে রাশিয়া নিজস্ব অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তৎপর হয়ে উঠেছে। তদুপরি, দক্ষিণ মেরু বা অ্যান্টার্কটিকা অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের জন্যও সম্প্রতি রাশিয়া আগ্রহ দেখিয়েছে। শেষ পর্যন্ত রুশদের বিস্তৃতি কতদূর পর্যন্ত পৌঁছায়, সেটি এখন দেখার অপেক্ষা।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button