ইতিহাস

বাংলার অন্যতম বড় খলনায়ক-খন্দকার মোশতাক

“খন্দকার মোশতাক আহমেদ” এ মানুষটিকে তুলনা করা হয় ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর আলী খাঁ এর সাথে।অথচ আমরা যদি একটু পিছনে ফিরে দেখি, মোশতাক আহমেদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট বন্ধু এমনকি উনি ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্র,আইন ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের অধীনে দায়িত্বরত ছিলেন। আওয়ামীলীগের এত কাছের একজন হয়েও তিনি জড়িত ছিলেন বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের সাথে এবং বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর পর ই নিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব। কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ১৯১৯ সালে জন্ম তার,তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতকের পর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাষানীর হাত ধরে ১৯৪২ সালে আওয়ামী মুসলিমলীগে যোগ দেন। রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার পর আওয়ামীলীগের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে কাজ করেন এবং তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর অতিভক্ত।দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু তাকে বিদ্যুত,স্যাচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী নি্যুক্ত করেন।১৯৭৫ সালে তাকে বানিজ্য মন্ত্রী করা হয়।বঙ্গবন্ধুর এত কাছের একজন হয়েও তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুনের প্রধান পরিকল্পনাকারী। তিনি নিজে এবং তার আত্মীয়দের ও সেনাসদস্যদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যার পর, ঐ দিনই মোশতাক নিজেকে রাষ্ট্রপতির আসনে অধিষ্ঠিত করেন এবং বঙ্গবন্ধুর ক্ষুনী দের “সূর্য সন্তান “বলে আখ্যায়িত করেন।শুধু তাই নয় ১৯৭৫ সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর পৃথিবীর ইতিহাসে এক কলঙ্কময় আইন প্রনয়ন করেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের বিচারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন এবং ইনডেমনিটি আদেশ জাড়ি করেন।” জয় বাংলা” স্লোগান পর্যন্ত বাতিল করে দেন তিনি, এর বদলে “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” স্লোগান চালু করেন। ইনডেমনিটি হলো কোনো বিচারকার্যকে বাধা প্রদান সংক্রান্ত অধ্যাদেশ বা আইন।কোনো অভিযান বা অভ্যুত্থানের ক্ষয়ক্ষতি আদালতের বহির্ভূত রাখার জন্য আইনসভা যে বিল পাস করে তাকেই ইনডেমনিটি বিল বলে। এই শব্দের অর্থ শাস্তি এড়াইবার ব্যবস্থা অর্থাৎ ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ হলো সেই অধ্যাদেশ যার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের শাস্তি এড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিলো।অধ্যাদেশটিতে দুটি অংশ আছে- প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবৎ আইনের পরিপন্থি যা কিছুই ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। দ্বিতীয় অংশে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবে তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। সংবিধানের গণতন্ত্র বিষয়টি খর্ব হবে বলে অনেকে বিরোধিতা করলেও রাষ্ট্রপতি একক ক্ষমতা বলে সংশোধনী বিল পাস করায়।এ আইনটি ১৯৭৫ সালের ৫০ নং অধ্যাদেশ হিসেবে অভিহিত ছিলো। ১৯৭৯ সালে আইনটি সংসদ কর্তৃক অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর পর সংশোধিত আইনে বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যার ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সপ্তম জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইনটি বাতিল করেন। যার ফলে বঙ্গন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ আবার খুলে যায়।২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ হাইকোর্ট সংবিধানের ৫ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেন। পৃথিবীর কোনো সংবিধানে লেখা নেই যে, খুনিদের বিচার করা যাবে না। অথচ তা বাংলাদেশেই প্রথম ঘটেছিলো; এমনকি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর ২০ বছর পার হলেও কোন রাষ্ট্রপতি বা সরকার প্রধান সেটি বাতিল না করে উল্টো নিজেদের সুবিধা নেওয়ার জন্য ইনডেমনিটি বহাল রাখেন।
মোশারফের শাসনামলেই জাতীয় চার নেতাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। কারাবন্দী করা হয় আওয়ামীলীগের শতশত নেতাকর্মীকে। এত ষড়যন্ত্রের পরও ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে সক্ষম হন নি তিনি।ক্ষমতা গ্রহনের মাত্র তিরাশি দিনের মাথায় ১৯৭৫ সালের ৫ এ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি।৬ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে তাকে বন্দি করা হয়।পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের শাসন আমলে তাকে মুক্তি দেওয়া হয় কিন্তু সামরিক শাসন অপসারণের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকায় তাকে আবারো গ্রেফতার করা হয় এছাড়াও তার বিরুদ্ধে দুটি দূর্নীতির অভিযোগ আনা হয় আদালত তাকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ডে দন্ডিত করে। মুক্তির পর রাজনীতি শুরু করলেও সেখানে তেমন কোন অগ্রসরতা লাভ করতে পারেনি।পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ৫ ই মার্চ তিনি মৃত্যু বরন করেন।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button