ইতিহাস

ইতিহাসের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ কুকুর লাইকা’র করুণ পরিণতি! 

যারা মহাকাশ গবেষণা নিয়ে মোটামুটি জানেন, তারা অবশ্যই ‘লাইকা’ নামটির সাথে পরিচিত। 

১৯৫৭ সালে, তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়া পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম মহাকাশযান স্পুটনিক-১ সফলভাবে উৎক্ষেপণ করে। এরপরই রুশ বিজ্ঞানীরা মহাকাশে পৃথিবী থেকে কোনো প্রাণীকে পাঠানোর ব্যাপারে ভাবতে শুরু করেন।

যেই ভাবা সেই কাজ। প্রাণীবিহীন স্পুটনিক-১ তৈরির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে, ব্লু প্রিন্টের নকশা পুরো অনুসরণ না করেই মাত্র ৪ সপ্তাহের মধ্যেই মহাকাশযান প্রস্তুত করে ফেলে সোভিয়েত মহাকাশ প্রকৌশলীরা। এই যানেই কুকুরের জন্য একটা চাপযুক্ত কামরা তৈরি করা হয়। কারণ, এটা ডিজাইনই করা হয়েছিল শুধুই একটি কুকুরের জন্য। স্পুটনিক-২ এর প্রধানত তিনটি জিনিস ছিল; অক্সিজেন জেনারেটর, কার্বন ডাইঅক্সাইড অবজারভার এবং কুকুরটির কেবিন ঠান্ডা রাখার জন্য একটি ফ্যান। এছাড়া ছিল তার জন্য ৭ দিন বেঁচে থাকার মতো কিছু খাবার এবং মলমূত্র ত্যাগ করার জন্য একটি ব্যাগ।

এর আগে মহাকাশযান স্পুটনিক-১ ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর, পৃথিবীর কক্ষপথ পরিভ্রমণ করে ইতিহাস তৈরি করেছিল। এবারের পরিকল্পনা হল স্পুটনিক-২ পৃথিবীর কক্ষপথের সর্বশেষ ধাপে ঢুকবে। যা হবে আরেকটি নতুন রেকর্ড। স্পুটনিক-২ এর ওজন ছিল ১১২০ পাউন্ড, যা স্পুটনিক-১ এর প্রায় ছয় গুণ। 

স্পেসক্রাফট স্পুটনিক-২ তৈরি করে ফেলার পর রুশ বিজ্ঞানীদের প্রয়োজন ছিল শুধুই একটি কুকুর, আর তারা জেনেশুনে রাস্তার একটা কুকুরকেই বেছে নেয়। কারণ, রাস্তার কুকুররা ঘরে পোষা কুকুরদের তুলনায় বেশি সহনশীল। যা তাদের অভিযানের জন্য বেশি উপযুক্ত। তাই তারা খুঁজে নিয়েছিল মস্কোর রাস্তায় বেওয়ারিশভাবে ঘুরে বেড়ানো ‘লাইকা’ কে।

কিন্তু এর পরই শান্ত স্বভাবের লাইকার জীবনে নেমে আসে দুর্যোগ। মুক্ত লাইকাকে পরাধীনতার শিকল পরিয়ে দিনের পর দিন নিষ্ঠুরভাবে ট্রেনিং দেয়া হয় মহাকাশে পাঠানোর জন্য। যেহেতু স্পুটনিক-২ একটি ছোট আকৃতির স্পেসক্রাফট, তাই লাইকাকে একটি ছোট খাঁচার মধ্যে ২০ দিন আটকে রাখা হয়, যাতে সে স্পেসক্রাফটের ছোট্ট কেবিনে অভ্যস্ত হতে পারে। সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা কুকুরটির স্বাভাবিক খাবারদাবারও বদলে ফেলেছিল৷ এমনই নির্মম সব ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে লাইকাকে তৈরি করা হয়েছিল মহাকাশ অভিযানে পাঠানোর জন্য। যা আপাতদৃষ্টিতে ট্রেনিং মনে হলেও অসহায় লাইকার জন্য ছিলো টর্চার।

উৎক্ষেপণের ৩ দিন আগে লাইকাকে তার জন্য নির্দিষ্ট চাপ যুক্ত, বদ্ধ কক্ষটিতে প্রবেশ করানো হয়। এই কেবিনটা এতই ছোট ছিল যে, কুকুরটা যে একটু নড়াচড়া করবে সে সুযোগও ছিল না। ধাতব কাঠামোতে আবদ্ধ মহাকাশের পোশাক পরার আগে লাইকাকে নতুন করে পরিষ্কার করে, প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সেন্সর এবং পয়ঃনিষ্কাশন যন্ত্র শরীরে যুক্ত করা হয়। 

১৯৫৭ সালের ৩ নভেম্বর; পৃথিবীতে লাইকার জীবনের শেষ দিন৷ স্পুটনিক-২ স্পেসক্রাফট লাইকাকে নিয়ে উড়াল দেয়ার আগে একজন সোভিয়েত টেকনিশিয়ান লাইকার নাকে চুমু খেলেন, উপস্থিত সবাই লাইকাকে অশ্রুসিক্ত চিরবিদায় জানায়। কারণ, সোভিয়েত বিজ্ঞানীরা জানতো কীভাবে মহাকাশে যেতে হয়, কারণ তারা ইতোমধ্যেই স্পুটনিক-১ সফলভাবে লঞ্চ করেছে। তবে তারা যেটা জানতো না সেটা হলো, মহাকাশ থেকে কীভাবে ফিরে আসতে হয়। তাই লাইকা যে আর কোনোদিন ফিরে আসবেনা সেটা ছিলো নিশ্চিত।

যাই হোক, সাধারণ অভিকর্ষ মাত্রার চেয়ে ৫ গুণ বেশি শক্তি দিয়ে ভোর ৫:৩০ এ মহাকাশযান স্পুটনিক-২ কে উৎক্ষেপণ করা হয়। সেই সাথে লাইকাও রওয়ানা দিল অজানা গন্ত্যব্যে, চিরদিনের জন্য। কিন্তু টেকনিশিয়ানের ভুলে মহাকাশযানের একটি অংশ রকেট থেকে আলাদা হতে পারেনি। আর, এই ত্রুটির কারণে লাইকাকে বহনকারী মহাকাশযান স্পুটনিক-২ এর কেবিনে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, সেইসাথে বাড়তে থাকে লাইকার হার্টবিটও। তীব্র তাপে লাইকার হার্টবিট স্বাভাবিক ১০০ থেকে ২৪০ এ পৌঁছে যায়!

মূলত এরপরই শুরু হয়, লাইকার জীবনের সবচেয়ে দূর্বিষহ সময়ের। মস্কোর রাস্তা থেকে ২০০০ মাইল উপরে পৃথিবীর নির্জন কক্ষপথে লাইকার ভ্রমণ ছিল অমানবিক। প্রচণ্ড ভয় এবং উত্তাপে তার হৃদপিণ্ড দ্রুত চলছিল, শ্বাসের গতি হয় প্রায় ৪ গুণ বেশি। উত্তপ্ত, ভীত, ক্ষুধার্ত লাইকা মহাকাশযানে করে পৃথিবীর নির্জন কক্ষপথে একাকী ঘুরে বেড়াচ্ছিল, যা ছিল মূলত এক আত্মঘাতী মিশন।

১০৩ মিনিটে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে লাইকা পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করে, তখনো সে জীবিত ছিল। কিন্তু এরপর লাইকার কেবিনের তাপমাত্রা এতই বেড়ে গিয়েছিল যে, একসময় কেবিনের সেন্সর থেকে সংকেত আসাও বন্ধ হয়ে যায়। সেই মুহুর্তে দূরের আকাশে ভাসমান স্পেসক্রাফটের উত্তপ্ত ছোট্ট কেবিনে শিকলে বাঁধা অবস্থায় মৃত্যুর সাথে লড়তে থাকা অসহায় লাইকার অবস্থা কেমন হয়েছিল তা সহজেই বোধগম্য। প্রচণ্ড গরমে পুড়তে পুড়তে জীবনের সাথে টানা ৩ ঘন্টা লড়াই করে অবশেষে হার মানে লাইকা, মহাকাশেই মৃত্যু হয় তার। মৃত লাইকাকে নিয়ে স্পুটনিক-২ আরো ৫ মাস কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে।

যদিও বিজ্ঞানীরা জানান, যদি সব কিছু ঠিক থাকত, খাবার, পানি আর অক্সিজেনের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকত মহাকাশযানে, তাহলেও লাইকা বাঁচত না। কক্ষপথে ২৫৭০ বার পরিভ্রমণ শেষে মহাকাশযান পৃথিবীর আবহাওয়ামণ্ডলীতে প্রবেশ করার পরপরই মারা যেত লাইকা।

এই পরীক্ষার পরই মনুষ্যবাহী নভোযান প্রকল্প শুরু হতে পেরেছিল। কারণ লাইকা পুরো ভ্রমণের সময় বেঁচে না থাকলেও এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন, মহাকাশযানে ওজনহীন থাকা সত্ত্বেও যাত্রীর পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব। লাইকার সেই জীবন উৎসর্গের কারণেই আজ মানুষ মহাকাশে যেতে পারছে।

তবে একটা কথা বলে রাখা প্রয়োজন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, লাইকার আগেও স্পেসে প্রথম যাত্রা সূচনা করা প্রাণীটি হচ্ছে মাছি! ১৯৫০ সালের আগে কোনো মানুষকে মহাকাশ অভিযানে পাঠানো চ্যালেঞ্জিং ছিল বিজ্ঞানীদের জন্য। তাই বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে মাছি, ইঁদুর, বানর প্রভৃতি প্রাণীকে মহাকাশ অভিযানে পাঠিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্পেস মিশনে মানুষ পাঠানো সম্ভব কিনা পরীক্ষা করা। কিন্তু মহাশূন্যে পাঠানোর পরে এই প্রাণীগুলো মারা গিয়েছিল। এরকমই একটি মিশনের বলি হয়েছিল লাইকা নামের সেই কুকুরটি।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button