সাম্প্রতিক

সামরিক শক্তির দিক দিয়ে বাংলাদেশের চাইতে কতটা এগিয়ে মিয়ানমার!

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে, মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো। পরবর্তীতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা বিবৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে অর্থ সাহায্য এবং অস্ত্র সরবারহ কমানোর আহ্বান জানায়। মূলত দেশটির জনগণের ওপর নিপীড়ন বন্ধের জন্য এ পদক্ষেপের আহ্বান জানায় সংস্থাটি। তবুও সামরিক শক্তির দিক থেকে মিয়ানমার তার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশ শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের থেকেও দেশটির অবস্থান বেশ শক্তিশালী। যেটা বাংলাদেশের জন্যে মারাত্মক দুঃশ্চিন্তার উদ্রেককারী একটি বিষয়। কারণ, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে কখনো সরাসরি যুদ্ধ না লাগলেও পুশব্যাক-পুশইন, জেলে আটক, রোহিঙ্গা নির্যাতন ইত্যাদি ইস্যুতে সীমান্তে বিরোধ রয়েছে দুই দেশের। 

বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের সামরিক শক্তির কোনো পূর্ণাঙ্গ চিত্র আগে পাওয়া না গেলেও সম্প্রতি গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স বিশ্বের ১৪২টি রাষ্ট্রের সামরিক শক্তির যে সূচক প্রকাশ করেছে, তাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সামরিক শক্তির একটি ধারণা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমারের তুলনায় জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে থাকলেও সামরিক দিক থেকে বেশ পিছিয়ে রয়েছে।

গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স ২০২২ অনুযায়ী, সামরিক সামর্থ্যের দিক থেকে মিয়ানমারের অবস্থান ৩৯ নম্বরে রয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান এই তালিকায় ৪৬। অর্থাৎ সামরিক শক্তির দিক দিয়ে বাংলাদেশের চাইতে ৭ ধাপ এগিয়ে রয়েছে মিয়ানমার। এই তালিকায় প্রথম পাঁচটি অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারত ও জাপান। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সামরিক শক্তির দিক থেকে ১৮ তম অবস্থানে আছে মিয়ানমার।

এই সুচকের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের রয়েছে সমরাস্ত্রের বিপুল ভাণ্ডার। মিয়ানমারের চেয়ে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় তিন গুণ হলেও সেনাসদস্যের সংখ্যায় মিয়ানমার অনেক এগিয়ে। সেনা সংখ্যার দিক দিয়ে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় ভিয়েতনামের পর মিয়ানমারের অবস্থান। মিয়ানমারের সক্রিয় সেনাসদস্যের সংখ্যা আনুমানিক সাড়ে ৪ লাখ এবং প্যারা-মিলিটারি বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ৫০ হাজার। অন্যদিকে বাংলাদেশের রয়েছে মোট ১ লাখ ৬৫ হাজার সক্রিয় সেনাসদস্য এবং ৬৮ লাখ প্যারা-মিলিটারি। দুই দেশের কোনোটিরই রিজার্ভ সেনাসদস্য নেই।

যদিও গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার ইনডেক্স বলছে, ২০২২ সালে প্রতিরক্ষা খাতে মিয়ানমারের বরাদ্দ ২২৮ কোটি মার্কিন ডলার, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাজেট ৩৮০ কোটি ডলারের। কিন্তু প্রতি বছর দেশটি তাদের সামরিক সামর্থ্য বাড়িয়ে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের আকার। 

স্থলপথে আক্রমণ চালানোর জন্যে মিয়ানমারের আছে ৬৬৪টি ট্যাংক আছে, বিপরীতে বাংলাদেশের রয়েছে ৩২০টি। মিহানমারের টানা কামান আছে ১৮৬৯টি। বাংলাদেশের ৯০টির বিমানের বিপরীতে মিয়ানমারের রয়েছে ২৮০টি বিমানের এক বহর। এসব বিমানের মধ্যে মধ্যে ফাইটার বা ইন্টারসেপ্টর এয়ারক্রাফট ৫৫টি, প্রশিক্ষণ বিমান ৯৩টি এবং আক্রমণ চালানোর জন্য সংরক্ষিত বিমানের সংখ্যা ২১টি। যেখানে বাংলাদেশের ফাইটার বিমান ৪৪টি এবং প্রশিক্ষণ বিমান ৬৩টি। এছাড়া মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীতে ২৬টি যুদ্ধবিমান পরিবাহী যান, ৮০টি সামরিক হেলিকপ্টার ও ৯টি অ্যাটাক হেলিকপ্টার থাকলেও বাংলাদেশে এসবের কিছুই নেই। 

নৌশক্তিতেও মিয়ানমার বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। মিয়ানমারের রয়েছে ১৫৫টি জাহাজ, বাংলাদেশের রয়েছে ১১২টি। উপকূলে টহল দেয়ার জন্য মিয়ানমারের রয়েছে ১৩৩টি নৌযান, বাংলাদেশের রয়েছে মাত্র ৩০টি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৬৭টি হেলিকপ্টারের বিপরীতে মিয়ানমারের রয়েছে ৮৬টি হেলিকপ্টার। বাংলাদেশের সাঁজোয়া যানের সংখ্যা ৮৩৭টি, মিয়ানমারের ১৫৮৭টি।

স্বয়ংক্রিয় আর্টিলারিতেও অনেক এগিয়ে মিয়ানমার। দেশটির স্বয়ংক্রিয় আর্টিলারির সংখ্যা ১৯০টি, বাংলাদেশের মাত্র ২৭টি৷ ফিল্ড আর্টিলারিতেও মিয়ানমার কয়েকগুণ এগিয়ে আছে। মিয়ানমারের ১৮৬৯টি ফিল্ড আর্টিলারির বিপরীতে বাংলাদেশের রয়েছে কেবল ৩৭১টি ফিল্ড আর্টিলারি। বাংলাদেশের ৬৯টি রকেট প্রজেক্টরের বিপরীতে মিয়ানমারের রয়েছে ৪৮৬টি রকেট প্রজেক্টর।

তবে কিছু ক্ষেত্রে মিয়ানমারের চেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের রয়েছে ৮টি ফ্রিগেট, অন্যদিকে মিয়ানমারের রয়েছে ৫টি। বাংলাদেশের করভেটের সংখ্যা মিয়ানমারের দ্বিগুণ। মিয়ানমারের তিনটির বদলে বাংলাদেশের আছে ৬টি। সাবমেরিনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে মিয়ানমারের। বাংলাদেশের ২টি সাবমেরিনের বদলে মিয়ানমারের রয়েছে ১টি। সেই সঙ্গে মাইন ওয়ারফেয়ার ক্রাফট আছে ২টি।

জনগণের ওপর নজরদারি করার জন্য ইসরায়েলের কাছ থেকে পেগাসাস নামের একটি সফটওয়্যারও কিনেছে মিয়ানমারের সামরিক সরকার। এই সফটওয়্যার দিয়ে মোবাইল ফোন হ্যাক করে গোপনে নজরদারি চালানো যায় যেকোন ব্যক্তির ওপর।

এসবের বাইরেও মিয়ানমার রাশিয়ার কাছ থেকে ২৮৫টি আর-৭৩ এবং ১০০টি আর-২৭ মিসাইল সংগ্রহ করেছে। এসব মিসাইল মিগ-২৯ বিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য এসব বিমান মিয়ানমার ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে সংগ্রহ করে। আর-২৭ মাঝারি পাল্লার এয়ার টু এয়ার ট্যাকটিক্যাল মিসাইল। এর আওতা ১৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত। ইরাক-ইরান যুদ্ধ ছাড়াও সর্বশেষ ইয়েমেনে হামলায় সৌদি নেতৃত্বধীন জোট ব্যবহার করেছে এ মিসাইল।

এছাড়াও মিয়ানমারের কাছে রয়েছে রাশিয়ার তৈরি দীর্ঘ পাল্লার এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। এর নাম এস-২০০ দুবনা। তবে মিয়ানমারের কাছে ঠিক কতটি এ সিস্টেম রয়েছে তা অজানা। তবে রাশিয়ার তৈরি মাঝারি পাল্লার সারফেস টু এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম রয়েছে ৮টি। এ ছাড়া চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং বেলারুশের তৈরি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মাঝারি পাল্লার সারফেস টু এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম রয়েছে মিয়ানমারের কাছে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also
Close
Back to top button