ইতিহাস

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের হত্যাকান্ড!  কি ঘটেছিলো সেদিন! 

বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেতা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে এক নির্মম হত্যাকাণ্ডের স্বীকার হন। যেই ঘটনার অনেক কিছুই এখনো ধোয়াশাই রয়ে গেছে।

আসলে কি ঘটেছিলো সেদিন!

জানা যায়, ১৯৮১ সালের ২৯ মে, জিয়াউর রহমান তার রাজনৈতিক দল, বিএনপির স্থানীয় নেতাদের মধ্যে সংঘটিত একটি সংঘর্ষের মধ্যস্থতা করতে রাজধানী থেকে চট্টগ্রামে যান। ৩০ মে, ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অবস্থান করছিলেন তিনি। ওইদিন ভোররাতে চট্টগ্রাম সেনানিবাস থেকে একদল সেনা কর্মকর্তা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সামরিক বাহনে চেপে বেরিয়ে আসেন। তাদের গন্তব্য ৭ কিলোমিটার দূরে শহরের কেন্দ্রস্থল কাজীর দেউরিতে সরকারি কর্মকর্তাদের অতিথিশালা সার্কিট হাউস। ভোর ৪টায় কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অফিসারদের তিনটি দল সার্কিট হাউজ আক্রমণ করে। এ আক্রমণে মোট ১৬ জন অফিসার জড়িত ছিলেন, যারা সকলেই ছিলেন কমিশনপ্রাপ্ত অফিসার। তাদের ১১টি সাবমেশিন গান, ৩টি রকেট লাঞ্চার এবং ৩টি গ্রেনেড ফায়ারিং রাইফেল ছিল। আক্রমণকারী দলের মূল হোতা লে. কর্নেল মতিউর রহমান, লে. কর্নেল মাহবুব, মেজর খালেদ, এবং লে. কর্নেল ফজলে হোসেন সার্কিট হাউজে রকেট নিক্ষেপ করে ভবনের দেয়ালে দুটি গর্ত সৃষ্টি করার মাধ্যমে আক্রমণ শুরু করেন। গুলি করতে করতে তাদের একটি দল দোতলায় উঠে যায়।

এরপর অফিসাররা কক্ষগুলোতে জিয়াউর রহমানকে খুঁজতে থাকেন। কিন্তু খুব বেশি কষ্ট করতে হয়নি। গোলাগুলির শব্দ শুনে বাইরে কী হচ্ছে তা দেখতে নিজেই দরজা ফাঁক করেন জিয়া। মেজর মোজাফফর এবং ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন সর্বপ্রথম জিয়াকে খুঁজে পান। মোসলেহ উদ্দিন জিয়াকে জানান যে, তাকে তাদের সঙ্গে সেনানিবাসে যেতে হবে। এরপর কর্নেল মতিউর রহমান আরেকটি দল নিয়ে উপস্থিত হন এবং জিয়াকে অনেক কাছ থেকে একটি এসএমজি দিয়ে গুলি করে। বলা হয়, এক সামরিক অফিসার তার স্টেনগানের এক ম্যাগাজিন গুলি পুরোটাই জিয়ার ওপর চালিয়ে দেন। ৯ মিনিটেই অপারেশন শেষ। ভোর সাড়ে ৪টার কিছু পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে ২৪ ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল আবুল মনজুরকে মেজর মোজাফফর হোসেন ফোন করে জানালেন, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড।’

মেশিনগানের ব্রাশ ফায়ারে জিয়াউর রহমানের মুখের একপাশ উড়ে গিয়েছিল। একটি চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। পেছনের দেয়ালে লেগেছিল বীভৎসতার চিহ্ন। বারান্দায় পড়ে থাকা প্রেসিডেন্টের রাতের পোশাক সাদা ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবি লাল হয়েছিল রক্তে।

জিয়ার লাশ এতটাই ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল যে তাকে চিনতে পারা কঠিন ছিল। চট্টগ্রামের তখনকার পুলিশ সুপার সৈয়দ শফিউদ্দীন আহমেদের পরিবারের সদস্যরা জানান, জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দায়িত্বরত কোনো বেসামরিক কর্মকর্তা হিসেবে শফিউদ্দীন আহমেদই প্রথম ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি বারান্দায় পড়ে থাকা প্রেসিডেন্টের ছিন্নভিন্ন দেহ দেখে সেখানেই স্ট্রোক করেন।

জিয়ার সঙ্গে ওইদিন সার্কিট হাউসে গুলিতে নিহত হয়েছিলেন আরও দুই সেনা কর্মকর্তা– লে. কর্নেল আহসান এবং ক্যাপ্টেন আশরাফুল হাফিজ খান। এরা ছিলেন রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা বাহিনী বা প্রেসিডেন্টস গার্ড রেজিমেন্টের সদস্য।

জানা যায়, জিয়ার মৃত্যুর পর তার মরদেহ রাঙ্গুনিয়ায় এক পাহাড়ের পাদদেশে মাটিচাপা দেওয়া হয়। এই কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল মেজর মোজাফফরের ওপর। কর্নেল মতিউর তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন জিয়ার লাশ সার্কিট হাউস থেকে নিয়ে চট্টগ্রামের কোনো পাহাড়ের খাদে ফেলে দিয়ে আসতে। কিন্তু পাহাড়ের কোনো খাদে ফেলে না দিয়ে মেজর মোজাফফর রাঙ্গুনিয়ায় এক গ্রামের কাছে সমতলে গ্রামবাসীর সহযোগিতায় সেখানে কবর দেন। গ্রামবাসীর সহায়তায় একই গর্তে ৩ জনের লাশ সমাহিত করেন তারা। 

যদিও পরবর্তীতে ১ জুন, রাঙ্গুনিয়া থেকে সেটা উদ্ধার করে চট্টগাম সিএমএইচে নিয়ে আসা হয়। তার লাশ সনাক্ত করেন তার পিএস লে.কর্নেল মাহফুজ। এরপর পোস্টমর্টেম ও সেলাই করার পর কফিনে ভরে সেটাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। যেটা নিয়ে পরবর্তীতে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিলো। কারণ, জিয়াউর রহমানের মরদেহ উদ্ধার ও ঢাকায় দাফনের আগে-পরে কোনো স্বজন বা সহকর্মী তা দেখেননি বা শনাক্তও করেননি। যে একজন মাত্র ব্যক্তি তাকে শনাক্ত করেছিলেন, তাকে সরিয়ে দেয়া হয় এই হত্যাকাণ্ডের দায়ে ফাঁসিতে ঝোলানোর মধ্য দিয়ে।

জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের সব দিক আজও উন্মোচিত হয়নি। অনেকে বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর যেভাবে দ্রুততার সঙ্গে বিচারের নামে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়া হয় এবং এটির সঙ্গে যুক্ত নন এমন অনেককে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়, সেটি সন্দেহ উদ্রেককারী। সেইসাথে, জিয়াউর রহমানকে হত্যার মূল উদ্দেশ্য কি ছিলো, সেটা নিয়েও রয়েছে অনেক বিতর্ক।

কথাসাহিত্যিক মশিউল আলমের মতে, ‘চট্টগ্রাম সেনানিবাসে সৈনিক ও অফিসারদের মধ্যে একটা ক্ষোভ ছিল যে, জিয়াউর রহমান পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসারদের বেশি সুযোগ- সুবিধা দিচ্ছেন। এর মধ্যে এরশাদও ছিলেন। তাদের মূল দাবিটাই ছিল যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে তাদের কথা শুনতে হবে। তাদের প্রাধান্য দিতে হবে। যারা পাকিস্তানফেরত তাদের এত সুযোগ-সুবিধা দেয়া যাবে না।’

আক্রমণকারীদের মধ্যে, লে. কর্নেল মতিউর রহমান এবং কর্নেল মাহবুবকে পলায়নরত অবস্থায় হত্যা করা হয়। মেজর খালেদ এবং মেজর মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন গ্রেপ্তার হন এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা লাভ করেন।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button