ইতিহাস

আরাকান হত বাংলাদেশের, কিন্তু কিভাবে মায়ানমারের হলো! কি তার পেছনের ইতিহাস!

ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে বার্মা তথা মায়ানমারের দখলে চলে যাওয়া আরাকান বা রাখাইন প্রদেশ মূলত একটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাজ্য ছিলো। ইতিহাসের তথ্য অনুযায়ী, খ্রিস্টপূর্ব ২৬৬৬ অব্দ থেকে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর ধরে স্বাধীন সত্তা, সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা, রাজনৈতিক ঐতিহ্য প্রভৃতি ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে আরাকান। পরবর্তীতে অষ্টাদশ শতকে বর্মি রাজা বোধাপায়া সশস্ত্র আক্রমণের মাধ্যমে আরাকানকে বার্মা বা মিয়ানমার অন্তর্ভুক্ত করে নিলে দেশটি তার স্বাধীনতা হারায়। বরাবরই স্বাধীন ও অতিশয় সমৃদ্ধ একটি দেশ নিতে থাকে পরাধীনতার তিক্ত স্বাদ।

৭ম-৮ম শতাব্দীতে আরাকানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যীয় মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানিদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। পরবর্তী সময়ে চাটগাঁইয়া, রাখাইন, আরাকানি, বার্মিজ, বাঙালি, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষের মিশ্রণে এই জাতি ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

১৭৮৩ সালের দিকে, বার্মা আরাকান আক্রমণ করে দখল করে নেয়। কিন্তু মাত্র ৪২ বছরের জন্য তাদেরকে নিজেদের আয়ত্বে রাখতে পেরেছিল তারা। তার পরই বৃটিশরা তা দখল করে নেয়। ১৮২৪ সালে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বার্মা দখল করে নিলে দীর্ঘ ১০০ বছর পর্যন্ত আরাকানিরা অনেকটা স্বস্তিতে বাস করে। কিন্তু ১৯৪২ সালে, আরাকান জাপানিদের অধীনে চলে যায়।

অবশেষে ১৯৪৫ সালে, আবার ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে। বাংলাদেশের বৃটিশ শাসন থেকে মুক্তি ও পূর্ব পাকিস্তানরূপে বিশ্বের মানচিত্রে আত্মপ্রকাশের পর মাত্র মাস ছয়েকের মধ্যেই ১৯৪৮ সালে বৃটিশ সরকার বার্মাকে স্বাধীনতা প্রদান করে। এতদঞ্চলের বৃটিশ উপনিবেশ ভারতবর্ষ ও বার্মার জনগণের যৌথ নাগরিকত্বের যুগও শেষ হয়ে যায়। আর এই স্বাধীনতার মাধ্যমে ব্রিটিশমুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুনভাবে আরাকানের ওপর হত্যা, নির্যাতন আর উচ্ছেদে মেতে ওঠে বর্মিরা। আরাকানবাসীদের বহিরাগত আখ্যা দিয়ে শুরু করে চরম হত্যাযজ্ঞ। বলা যায়, বার্মার স্বাধীনতা আরাকানের রোহিঙ্গাদের জন্য বয়ে আনে অভিশাপ।

যদিও নাগরিকত্ব ভারতীয়, পাকিস্তানী ও বার্মিজ তিনভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ার সময় আরাকান মিয়ানামার থেকে আলাদা হতে চেয়েছিল। সেইসাথে আরাকানের রোহিঙ্গারা তাদের আরাকান রাজ্যকে আমাদের তথা পূর্ব পাকিস্তানের সাথে একীভূত করার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে। কেননা ঐতিহাসিকভাবে আরাকান মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের অংশ ছিল না।

বরং ৩৯৮ মাইল দীর্ঘ এবং ৬০-৩০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এ রাজ্যটি অনেকটা ফিলিস্তিন, গাজা উপত্যকা বা আমাদের চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সমুদ্র তীরবর্তী উপকূলতুল্য। বার্মার সাথে বলতে গেলে এর কোনো প্রাকৃতিক সংযোগও নেই। একটি বিশাল উচু পর্বতমালা একে প্রাকৃতিকভাবে বার্মা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। বরং ভৌগলিক অবস্থানের দিক দিয়ে এরা বাংলাদেশ ও বাঙালীদের কাছাকাছি। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের ভাষা, ধর্ম ও চেহারায় সাদৃশ্যতার ইতিহাসটি পরিস্ফূট হয়েছে। বাংলা ও আরাকান সীমান্তগত দিক থেকে শুধু প্রতিবেশীই নয়, বরং ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত বেশিরভাগ সময় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের কোনো কোনো অঞ্চল প্রায় বিচ্ছিন্নভাবে আরাকানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়াও বাংলার সাথে আরাকানের ছিল গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক। সেইসাথে অনেক বাঙালি মুসলমান আরাকান রাজ দরবারে কাজ করতেন। তাই এমন একটি জাতিসত্তার জন্যে এমন ইছা পোষণ করাটাই ছিল স্বাভাবিক।

কিন্তু এখানেও বৃটিশ বেনিয়ারা একটা কূটনৈতিক চাল চেলে ঠিক কাশ্মীরের মুসলিম জনগণের মত আরাকানী ও রোহিঙ্গাদেরকেও একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেয়। এই কূটনৈতিক চালের পেছনে মূলত দায়ী ব্রিটিশদের ভবিষ্যতবানী। তারা তখনই বুঝতে পেরেছিলো, একটা সময় পূর্ব পাকিস্তান ভাগ হয়ে আলাদা দেশ হবে। তখন যদি আরাকান রাজ্যটি তাদের দখলে থাকে, তাহলে এই দেশটি বঙ্গোপসাগরে সম্পূর্ণরূপে নিজেদের দখলদারিত্ব চালাবে। তখন এই দেশ হবে বিশাল একটা পাওয়ার হাউজ। আর একটি মুসলিম দেশ এতটা শক্তিশালী হবে, সেটা তারা কোনভাবেই মেনে নিতে পারেনি।

তাই তৎকালীন সময়ে তারা ঠিক করে দেয়, আপাতত আরাকান প্রদেশ টি বার্মার অংশরূপেই বিদ্যমান থাকবে। পরবর্তীতে ১০ বছর পর যদি বার্মিজ শাসনের অভিজ্ঞতা তাদের কাছে সুখকর বিবেচিত না হয়, তাহলে গণভোটের মাধ্যমে আরাকানীরা তাদের ভাগ্যনির্ধারনের অধিকার লাভ করবে। সে হিসেবে ১৯৫৮ সালে তাদের সে গণভোট ও জাতীয়তা নির্ধারণের অধিকার লাভের অঙ্গীকার ছিল। এ সময় কায়েদে আজম মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ পাক গভর্ণর জেনারেল হিসাবে অংসান সান সূচির সাথে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ব্যাপারে আলাপ করলে অংসান তাকে তাদের নিরাপত্তার আশ্বাসও দিয়েছিলেন। মুজাহিদদের আক্রমণে দিশেহারা ভারত যেমন জাতিসংঘে নালিশ জানিয়ে পরবর্তীতে গণভোটের অধিকার প্রদান করে কাশ্মীরীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দেবে বলে অঙ্গীকার করে ‘আপাতত’ কাশ্মীরকে ভারতভুক্তই রাখে, তেমনি বৃটিশ শাসকদের মাধ্যমে বার্মাও রোহিঙ্গা জাতি ও আরাকানবাসীদেরকে ১৯৫৮ সালে গণভোট প্রদানের অঙ্গীকার দিয়ে তাদের শাসনাধীন রেখে দেয়। নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে ১৯৪৬ সালে আরাকানীরা ‘আরাকান মুসলিম লীগ’ গঠন করে। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। 

১৯৮২ সালে, মিয়ানমারে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব হরণ করা হয়। দেশটির সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের ‘অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসী’ এবং সু চির দল ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা এখন রাষ্ট্র্রবিহীন নাগরিক, ভাসমান এক জাতিগোষ্ঠী। ১৯৬২ সাল থেকে ধর্মচর্চা, শিক্ষা, চাকরি, চিকিৎসা সেবা ও অবৈধ চলাফেরার অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, জিন্নাহ আরাকানের ব্যাপারে সঠিক ভূমিকা গ্রহণ করলে আজ রোহিঙ্গাদের ইতিহাস ভিন্ন হতে পারত। কিন্তু জিন্নাহর ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আরাকান বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেনি। সেইসাথে পারেনি তার স্বাধীন অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনতে। তবে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত না করলেও সে সময় তাদের একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে থাকার সুযোগ করে দেওয়া যেত। কিন্তু জিন্নাহর গাফিলতির কারণে এ সুযোগও হাতছাড়া হয়ে যায়। আর এর ফলাফল তো এখন পুরো বিশ্ববাসীর জানা।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button