আন্তর্জাতিকপ্রযুক্তি

দ্য লাইন সিটিঃ সৌদি আরবের নির্মানাধীন ভবিষ্যতের শহর

এখনও পর্যন্ত জ্বালানি তেলই সৌদি আরবের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। কিন্তু দেশকে এই তেল নির্ভরশীলতা থেকে বের করে আনতে চাইছেন সৌদি যুবরাজ এবং ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। সেই লক্ষ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় শহর তৈরির একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছেন সৌদি আরব। যেটি ‘নিওম সিটি’ নামে পরিচিত। আর এই সিটি নির্মাণের সময়সীমা নির্ধারন করা হয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যেই।

জর্ডান এবং মিশর সীমান্তে লোহিত সাগর ও আকাবা উপসাগরকে কেন্দ্র করে সুয়েজ খাল সংলগ্ন সাড়ে ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ‘নিওম’ নামের এ বিশাল মেগাসিটি নির্মাণ করা হবে। যেখান থেকে ঠিক ৫ কিমি দূরেই রয়েছে ইজিপশিয়ান সিটির ট্যুরিস্ট হটস্পট ‘শার্ম আল শেখ’। 

এই নিওম প্রকল্পের অধীনেই দূষণমুক্ত একটি শহর গড়ে তুলে নজির গড়ার ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। সব কিছু ঠিক থাকলে ২০২৪ সালের মধ্যেই সেই শহর পুরোপুরি তৈরি হয়ে যাবে। পরিবেশবান্ধব এই শহরের নাম রাখা হয়েছে ‘দ্য লাইন।’ ওপর থেকে দেখলে মনে হবে কেউ যেন জঙ্গলের মধ্যে একটি লাইন এঁকে দিয়েছেন। সেই জন্যেই এই শহরের এমন নামকরণ। যেটি সৌদি আরবের নিজস্ব তহবিলের মালিকানাধীন এবং ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’ নামক একটি পরিকল্পনার অংশ।

মাত্র ২০০ মিটার চওড়া, ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৫০০ মিটার ওপরের এই শহরের কাজ শুরু হয়েছে ২০২১ সাল থেকেই। এর মধ্য দিয়ে শহর সম্পর্কে আমাদের চিরায়ত ধারণাই বদলে দিতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতান্ত্রিক এ দেশটি।

দ্য লাইন’-এর বাইরের দিক গ্লাস দ্বারা নির্মিত হবে। রাতের বেলায় পুরো এলাকা জুড়ে আকাশে থাকবে বিশাল কৃত্রিম চাঁদ। আসল চাঁদের মতোই তার আলোয় আলোকিত হয়ে থাকবে পুরো এলাকা। নিওম প্রকল্পে কৃত্রিম মেঘমালা তৈরি করার প্রযুক্তি থাকবে। এসব মেঘের ফলে মরুভূমিতে আরও বেশি করে বৃষ্টি হবে। শিক্ষার ব্যবস্থায় থাকবে হলোগ্রাফিক শিক্ষক, যেমনটা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে দেখা যায়।

১০৫ মাইল দীর্ঘ এলাকায় গড়ে উঠা এই শহরটি কে ৩ টি স্তরে ভাগ করা হয়েছে। যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি কমনোর জন্যই তিনটি স্তরে ভাগ করা হয়েছে শহরটিকে।

৩টি স্তরের একেবারে ওপরের স্তর থাকবে মাটির ওপরে। যেটি হবে সবুজ গাছপালায় ভরপুর। সেখানে থাকবে না কোন গাড়ি চলার রাস্তা, শুধু পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে পারবে মানুষ। এর নিচের দুটি স্তর থাকবে ভূগর্ভস্থ। সেখানে গাড়ি চলাচলের রাস্তা থাকবে। দ্বিতীয় স্তরটির নাম দেওয়া হয়েছে, সার্ভিস লেয়ার। যেটি মূলত পরিকাঠামো পর্যবেক্ষণের জন্য তৈরি হবে। যেখানে দোকান, ইন্ডাস্ট্রি, অফিস এবং শপিং মলসহ সবরকমের কমার্সিয়াল কাজ চলবে। আর এই শহরের মেরুদণ্ড হিসেবে তৈরি হবে তৃতীয় স্তরটি। কারণ, ওখানেই থাকবে আল্ট্রা-হাইস্পিড ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম। যেটি দিয়ে দ্রুত গতিসম্পন্ন ট্রেন এবং অন্যান্য যানবাহন যাতায়াত করবে। ফলে ওপরের স্তর থাকবে সম্পূর্ণ দূষণমুক্ত।

এই শহরটি পৃথিবীর অন্য সব শহর থেকে একেবারেই আলাদা হবে। যেখানে এই সম্পূর্ণ শহরটি এবং এতে মজুদ থাকা  ইলেকট্রিক সিস্টেম, ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম, ইন্ডাস্ট্রি সবকিছুই চলবে নবায়নযোগ্য শক্তি দ্বারা। এমনকি এখানে পানীয় জলের সাপ্লাই এর জন্যে ব্যবহার করা হবে সম্পূর্ণ নতুন একটি পদ্ধতি। যার জন্যে কাঁচ দিয়ে তৈরি একটি বিশাল গ্লোব তৈরি করা হচ্ছে। যেটাকে সমুদ্রের পানি দিয়ে পূর্ণ করে সোলার আয়নার মাধ্যমে গরম করা হবে। ফলশ্রুতিতে ভেতরের পানি যখন গরম হয়ে বাষ্পে পরিনত হবে তখন সেটাকে পাইপের মাধ্যমে বের করে নেওয়া হবে। মিরর লাইনের প্রাথমিক নকশাটি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মরফোসিস আর্কিটেক্টস। যেটি প্রতিষ্ঠা করেছেন প্রিটজকার আর্কিটেকচার পুরস্কার বিজয়ী থম মেইন। তার মতে, এই প্রযুক্তির মাধম্যে প্রতিদিন ৫ কোটি লিটার শুদ্ধ পানীয় বানানো সম্ভব। 

প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের বিপরীতে গিয়ে বরং এই পরিবেশ কে পূজি করেই এই শহর নির্মাণ করা হচ্ছে। যার মধ্যে থাকবে ভার্টিকাল ভিলেজ, আউটডোর স্কি রিসোর্ট, মাউন্টেন ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম, হেলথ সেন্টার এবং এন্টারটেইনমেন্ট সেন্টার।

এই শহরের ইলেক্ট্রিসিটির চাহিদা মেটানোর জন্যে ১০০ শতাংশ নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার করা হবে। যেখানে উইন্ড টাওয়ার এবং সোলার প্যানেলের মাধ্যমে এমন কিছু প্ল্যান্ট লাগানো হবে যেটা পানি এবং বাতাস কে ইলেক্ট্রোক্যামিক্যাল সেল এর মাধ্যমে গ্রিন অ্যামোনিয়া তে পরিবর্তন করে দেবে। যেটা খুবই কার্যকরী একটা ফুয়েল। এছাড়াও শহরটি যাতে ‘কার্বন-পজিটিভ’ হয় এবং ১০০ শতাংশ ক্লিন এনার্জি (দূষণহীণ শক্তি) ব্যবহার করে, তা নিশ্চিত করা হবে।

এই শহরে ১০ লাখ মানুষ একসঙ্গে বাস করতে পারবে। শহরের নকশা এমনভাবে বানানো হবে, যেন হাসপাতাল, স্কুল, রেস্টুরেন্টসহ সব জায়গায় পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। এই শহর থেকে আশপাশের অঞ্চলের যোগাযোগ স্থাপন হবে তৃতীয় স্তরের যাতায়াত ব্যবস্থার মাধ্যমে।

যেহেতু সৌদি আরব তার অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করতে এবং তেলের উপর নির্ভরতা কমাতে এমন শহর নির্মাণের প্রকল্প নিয়েছে তাই কোনো দিক দিয়েই ত্রুটি রাখেনি। এই প্রকল্পে ইতমধ্যেই ২০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে তারা। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত তিন লক্ষ ৮০ হাজার মানষের কর্মসংস্থান হবে। ২০৩০ সাল নাগাদ দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধি পাবে ৪৮০০ কোটি ডলার।

যদিও নিওম নির্মাণের সময়সীমা ২০৩০ সাল বলা হয়েছে। কিন্তু ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে নির্মাণ কাজ শুরু করা মিরর লাইনের একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন করলে বলা যায়, এটি পর্যায়ক্রমে নির্মাণ করতে হবে এবং পুরো কাজ শেষ করতে ৫০ বছর সময় লাগতে পারে।

তবে এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, নিওম সিটি নির্মাণের পর তা সৌদি আরবের অর্থনীতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করবে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button