আন্তর্জাতিকইতিহাস

কাতার কিভাবে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ হলো!

পারস্য উপসাগরের এককোণায় ছোট্ট একটা দেশ কাতার। যার আয়তন মাত্র ১১,৫৮১ বর্গ কিলোমিটার। আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের ৯০ তম দেশ কাতার বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ ছোট। কাতারের জনসংখ্যা ৩০ লাখেরও কম। এর মধ্যে মাত্র ৩ লাখ লোক কাতারের নাগরিক এবং বাকি সবাই প্রবাসী। 

১৯৭১ সালের ১ সেপ্টেম্বর, ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে এই ছোট দেশটি। অতীতের এই ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল দুর্গম ও চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার অতি দরিদ্র একটি দেশ। কাতারের প্রায় পুরোটা অঞ্চলই হলো মরুভূমি। গ্রীষ্মকালে কাতার উপদ্বীপের তাপমাত্রা প্রায় ৫০ ডিগ্রী সেলসিয়াস থাকায়, পৃথিবীর শীর্ষ বসবাসের অযোগ্য স্থানগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। অতীতে কাতারের অর্থনীতি ছিল মাছ ধরা এবং মুক্তা শিকারের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ১৯২০ সালে, জাপানে মুক্তার চাষ শুরু হওয়ায় কাতারি মুক্তাশিল্প ধ্বংস হয়ে যায়।

কিন্তু কাতারের এই শোচনীয় অবস্থা খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দরিদ্র এই দেশটির ভাগ্যের চাকা বদলে যায় অভাবনীয় উপায়ে। বর্তমানে দেশটির চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাথাপিছু আয়ের ভিত্তিতে কাতার পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ। ২০১৬ সালের হিসেব অনুযায়ী, কাতারের নাগরিকদের মাথাপিছু বার্ষিক আয় ১ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। যা বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের ৭১ গুণ বেশি। 

কিন্তু কিভাবে হলো এই অবিশ্বাস্য পরিবর্তন! 

মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলো মত কাতারেরও ধনী হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদ। মরুভূমির বালির নিচে লুকিয়ে থাকা বিশাল জ্বালানি ভান্ডারই কাতারের অর্থের যোগানদাতা। তবে কাতার তার প্রতিবেশীদের মতো শুধু খনিজ তেলই নয়, সেই সঙ্গে পেয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি।

১৯৪০ সালে, কাতারে সর্বপ্রথম তেলের খনি আবিষ্কৃত হয়। এরপর ১৯৬০ এর দশক পর্যন্ত দেশটির খনিজ সম্পদ বিদেশিদের দ্বারা শোষিত হতে থাকে। তখনও পর্যন্ত কাতারি জনগণের জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। ১৯৭০ সালে, শেল কোম্পানি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক গ্যাসের খনি ‘দ্য নর্থ ফিল্ড’ আবিষ্কার করেন। কিন্তু তখন প্রাকৃতিক গ্যাস খুব একটা লাভজনক ব্যবসায় ছিলো না। তখনকার দিনে গ্যাস শুধুমাত্র পাইপের মধ্যেই সরবরাহ করা সম্ভব ছিল, আর মধ্যপ্রাচ্যের কোণায় পড়ে থাকা কাতার তখন শিল্পোন্নত দেশগুলোর চেয়ে অনেক দূরে। সে কারণে এত বিপুল সম্পদ থাকার পরও ৯০ দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কাতারের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।

কাতার শীর্ষ ধনী দেশ হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন সাবেক আমির হামাদ বিন খলিফা আল থানী। তিনি ১৯৯৫ সালে, তার পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে কাতারের রাজক্ষমতা ছিনিয়ে নেন তিনি। হামাদ বিন খলিফার মূল লক্ষ্য ছিল কাতারের প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদকে কাজে লাগানো।

ফলস্বরূপ ক্ষমতায় এসেই প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের নতুন পদ্ধতি আবিষ্কারের উপর বিনিয়োগ করা শুরু করেন তিনি। যে পদ্ধতির নাম লিকুইফ্যাকশন বা তরলীকরণ। যার ফলে গ্যাস পরিবহণের জন্য আর পাইপের প্রয়োজন হবে না, তরল প্রাকৃতিক গ্যাস সহজেই জাহাজের মাধ্যমে রপ্তানি করা যাবে, যেমনটা করা হয় তেলের ক্ষেত্রে। তবে সমস্যা হলো, গ্যাস তরল করতে হলে একে কমপক্ষে -১৬১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় রাখতে হবে। কাতারের মতো উষ্ণ এলাকায় যা ধরে রাখা ছিলো একেবারেই অসম্ভব। তাই এই প্রযুক্তিকে আরো সহজলভ্য করা ছাড়া উপায় ছিলো না তাদের। 

ফলশ্রুতিতে কাতার কর্তৃপক্ষ গ্যাস তরলীকরণ প্রযুক্তিতে প্রচুর বিনিয়োগ করা শুরু করে। যার ফলাফল তারা হাতে হাতেই পায়। সেই বিনিয়োগের কারণেই কাতার বিশ্বের সর্ববৃহৎ লিকুইফাইড ন্যাচারাল গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়। কাতারের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে বিশাল বিশাল ইন্ড্রাস্টিয়াল কমপ্লেক্স গড়ে তোলার কারণে সেখানে গ্যাস উত্তোলন এবং তরলীকরণে পৃথিবীর যে কোনো দেশের তুলনায় কম খরচ হয়। বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য যেকোনো দেশ ১ টন এলএনজি উৎপাদন করতে যা খরচ করে, কাতার সেই পরিমাণ খরচ করেই ৪ টন জ্বালানি উৎপাদন করে।  সস্তায় বিপুল পরিমাণ তরল গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানির কারণেই কাতার বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশের খেতাব অর্জন করতে পেরেছে।

খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে গেলে কাতারের অর্থনীতি যাতে ভেঙে না পড়ে, সেজন্য হামাদ বিন খলিফা আরো একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন। তিনি ২০০৫ সালে, কাতারের অর্থনীতিকে বহুমুখী করার লক্ষ্যে ‘কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথোরিটি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠান টি বিশ্বের ৪০ টিরও বেশি দেশে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। সিঙ্গাপুর থেকে সিলিকন ভ্যালি কোনো জায়গা কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথোরিটি থেকে বাদ পড়েনি। লন্ডন শহরে ইংল্যান্ডের রানির চেয়েও বেশি সম্পদ আছে, কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথোরিটির। লন্ডন শহরের শীর্ষ ১৫টি আকাশচুম্বী অট্টালিকার ৩৪% ই কাতারের মালিকানাধীন। অথচ যুক্তরাজ্যের কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত মালিকানায় রয়েছে মাত্র ২১%। এখানেই শেষ নয়, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ এবং লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরের ২০% এর মালিক কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথোরিটি। তারা রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ এয়ারপোর্টেরও ২৫% এর মালিক। ২০১৬ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪র্থ সর্বোচ্চ অফিস ইনভেস্টর হয়েছে কাতার। 

এসবের বাইরে কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথোরিটি বিশ্বের বিখ্যাত বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ার হোল্ডার। ভক্সওয়াগন, বার্কলেস ব্যাংক, শেল, উবার, আইবারড্রোলা, টিফানি এন্ড কো এমনকি রাশিয়ার সরকারি তেল কোম্পানি রসনেফটও আছে এই তালিকায়। এই অথোরিটি ইতালিয়ান লাক্সারি ব্র্যান্ড ভ্যালেন্টিনোও কিনে নিয়েছে। এরপর ২০১১ সালে, তারা কিনে নেন ফ্রান্সের বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব প্যারিস সেন্ট-জার্মেইন।

এছাড়াও হামাদ আল-থানি ক্ষমতায় আসার পর বুঝতে পারেন, ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব বিস্তার করতে হবে এবং কাতারকে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে হবে। তা নাহলে একসময়ের নিয়ন্ত্রক সৌদি আরবের সাথে কোনো বিরোধ হলে কাতারের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। তাই ২০০৩ সালে, সৌদি সরকার যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেকে তাদের সৈন্য নিয়ে যেতে অনুরোধ করে কাতার তখন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে মার্কিন সৈন্যকে তাদের দেশে আমন্ত্রণ জানায়। যার কারণে কাতারে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার খরচ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানঘাঁটি ‘আল উদিদ’ তৈরি করা হয়। প্রায় ১১ হাজারের বেশি মার্কিন সৈন্যের বসবাস সেখানে।

এছাড়াও বিশ্ব জনমত গঠনে জোরালো ভূমিকা রাখতে কাতার সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে ‘আলজাজিরা মিডিয়া নেটওয়ার্ক’। সারা পৃথিবী জুড়ে আলজাজিরার প্রায় ৮০ টিরও বেশি নিউজ ব্যুরো রয়েছে। বিবিসির পরে এটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ টেলিভিশন নেটওয়ার্ক। কাতারি মালিকানাধীন আরো একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান হলো ‘বিইন মিডিয়া গ্রুপ’। এই গ্রুপের অধীনে খেলা এবং বিনোদনভিত্তিক ৬০ টি চ্যানেল আছে, যা বিশ্বের ৪৩ টি দেশে ৭ টি ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় সম্প্রচারিত হয়।

কাতারের আন্তর্জাতিক প্রভাব প্রতিবেশী দুই দেশ সৌদি আরব আর আরব আমিরাতের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ালে, ২০১৭ সালের জুন মাসে মিসর এবং বাহরাইনকে সাথে নিয়ে সৌদি আরবের নেতৃত্বে কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ ঘোষণা করা হয়। মূল উদ্দেশ্য ছিলো, ক্ষুদ্র এই দেশটির বৈশ্বিক প্রভাব কমানো। যদিও তাতে কাতারের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং কাতারের অর্থনীতি এগিয়ে গেছে অপ্রতিরোধ্য গতিতে। সেইসাথে কাতারের রাজপরিবার তাদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়িয়ে চলেছে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button