ইতিহাস

যেভাবে ইসলামের আগমন এবং বিস্তার ঘটে বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশীয়ায়!

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি দ্বীপরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া। অনেক দ্বীপের সমষ্টিতে গড়ে ওঠা বিশ্বের প্রাচীনতম জনপদ। যার আয়তন ১৯ লাখ ১৯ হাজার ৪৪০ কি.মি.। ২০১৭ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই দেশটির প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৯৪০ জন মানুষের বসবাস। যাদের সরকারি ভাষা বাহাসা ইন্দোনেশিয়া হলেও বেশির ভাগ ইন্দোনেশীয় স্থানীয় মাতৃভাষায়ই কথা বলে।

জনসংখ্যার দিক দিয়ে ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। বিশ্বের মুসলিম জনসংখ্যার প্রায় ১৩% এই দেশটিতে বাস করে। ইন্দোনেশিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৮% মুসলমান। সৌদি হজ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রায় ২ লাখ ২১ হাজার নর-নারী হজে যান, যেখানে বাংলাদেশ থেকে যান ১ লাখ ২৭ হাজার। এখানকার মুসলিমদের ধর্মচর্চায় উচ্চাকাঙ্ক্ষার অন্যতম প্রমাণ হচ্ছে- এ দেশের কোনো মুসলিম নারী বা পুরুষ হজ সম্পাদন করা ছাড়া বিয়ের পাত্র বা পাত্রী পান না।

যদিও ইতিহাসের বিকৃত উপস্থাপনকারীরা জোর গলায় দাবি করে যে, এখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং তলোয়ারের জোরে। তবে সত্যিকার অর্থে, বৃহৎ এই অঞ্চলে ইসলামের আগমন ঘটেছিল কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং তীর-তলোয়ারের হস্তক্ষেপ ছাড়াই।

এ অঞ্চলে ইসলামের আগমন ঘটেছিল প্রায় ৮ অথবা ৯ শতাব্দী আগেই। ঐতিহাসিক সূত্র মতে, হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষে অথবা তৃতীয় শতাব্দীর শুরুতে সুমাত্রা এবং মালয় দ্বীপপুঞ্জের কিছু বন্দরে মুসলিম ব্যবসায়ীগণ নোঙ্গর ফেলেন। জানা যায়, আম্মান, হাজরামাউত এবং ইয়ামানের দক্ষিণ উপকূলের ব্যবসায়ীগণ সবার আগে এই অঞ্চলে আগমন করেন এবং সুমাত্রার পশ্চিম উপকূলে নিজেদের ব্যবসায়িক ঘাঁটি স্থাপন করেন। এই ব্যবসায়ীগণ ছিলেন শাফেয়ী মাজহাবের অনুসারী। 

আব্বাসীয় খিলাফতের আমলে আরবদের সঙ্গে ব্যাবসায়িক সম্পর্ক আরো দৃঢ় হলে, এই জনপদের একদল নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের সঙ্গে দেখা করেন। সফর থেকে ফেরার পথে তারা নিজেদের মধ্যে ধারণ করে নিয়ে যান ইসলামের শ্বাশ্বত আকিদাহ-বিশ্বাস। অতঃপর নিজ নিজ অঞ্চলে পৌঁছে তারা ইসলামের দাওয়াতকে বিস্তৃত করার মহতি মিশনে নিবেদিত হন। তাঁদের মাধ্যমেই সর্বপ্রথম ইন্দোনেশিয়ায় ইসলামের বাণী প্রচারিত হয়।

এ ব্যাপারে প্রাচ্যবিদ টমাস আরনল্ড তার ‘দ্য প্রিচিং অব ইসলাম’ গ্রন্থে বলছেন, ‘খ্রিস্ট্রীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষদিকে এসে শ্রীলংকার পথ ধরে চীনের সাথে মুসলিমদের ব্যবসায়িক প্রসার ঘটে। এর ফলে অষ্টম শতাব্দীতেই সেখানে আরব ব্যবসায়ীদেরকে দলবদ্ধভাবে চলাফেরা করতে দেখা গেছে। পর্তুগিজ ফিরিঙ্গিদের আগমনের আগ পর্যন্ত খ্রিস্টীয় দশম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত সময়ে প্রাচ্যের আরবরাই ছিল এ অঞ্চলের বাণিজ্যে শীর্ষ অবস্থানে। ছিল না তাদের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী। এ থেকেই বোঝা যায় যে, আরবরা বেশ আগেই এ অঞ্চলে তাদের ব্যবসায়িক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছিল।

ঐতিহাসিক সূত্রগুলো থেকে, এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে হাজরামাউত এবং আম্মান অঞ্চলের মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা জানা যায়। সেই হিজরি প্রথম শতাব্দীতে ইসলাম প্রচারের ঊষালগ্ন থেকে দশম হিজরি শতাব্দীতে পর্তুগিজ ফিরিঙ্গিদের আগমন পর্যন্ত সহস্র বছর ধরে এই সামুদ্রিক নাবিক এবং ব্যবসায়ীগণ এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন। হিজরি নবম শতকে পুরো অঞ্চলে ইসলাম বিস্তার লাভ করে। 

জানা যায়, হাজরামাউত এবং আম্মান অঞ্চলের আরব ব্যবসায়ীগণ এ অঞ্চলে আগমনের পর ভারতবর্ষের দক্ষিণ উপকূল এবং মালাবার অঞ্চলের সম্ভ্রান্ত মহিলাগণের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। এ অঞ্চলে ইসলামকে মজবুত এবং প্রোথিত করার ক্ষেত্রে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে মধ্য জাভা রাজ্যের রাজার সঙ্গে মুসলিম রাজকুমারী আত্তাশামবিনার বিবাহ ছিল এক্ষেত্রে একটি বিরাট মাইলফলক। এই বিদূষী মুসলিম রাজকুমারী শর্ত দিয়েছিলেন, তাকে বিয়ে করতে হলে আগে রাজাকে মুসলিম হতে হবে। তার কথা অনুযায়ী রাজা ইসলাম গ্রহণ করে। এই রাজার ইসলাম গ্রহণের মধ্য দিয়ে সূচনা হয় একটি নতুন ইসলামি বসন্তের। এ সময়ে মধ্য জাভা থেকে ইসলাম ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং আশপাশের অঞ্চলে গড়ে উঠতে শুরু করে ছোট ছোট ইসলামি রাজ্য। জাভার পশ্চিমাঞ্চলে রাজা হাসানুদ্দিন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বানতাম রাজ্য। এদিকে জাভার পূর্বাঞ্চলে সানাকানি নামক এক সামরিক ব্যক্তি প্রতিষ্ঠা করেন মাতরাম রাজ্য। এভাবেই জাভা দ্বীপটি হয়ে উঠে এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের প্রধানতম কেন্দ্র। এখানে থেকেই অন্য দ্বীপগুলোতে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। অতঃপর ১৫১১ খ্রিস্টাব্দে, পর্তুগিজ উপনিবেশের কয়েক মাস পূর্বে এই রাজ্যগুলো একীভূত হয়ে যায়।

এছাড়াও সুমাত্রা দ্বীপের উত্তরে গড়ে উঠেছিল আতশিহ রাজ্য এবং দক্ষিণে গড়ে উঠে বালমাবাং রাজ্য। টমাস আরনল্ড এর মতে, ‘মুসলিম ব্যবসায়ী এবং মুহাজিরগণ ভেবে দেখলেন যে, এ অঞ্চলের লোকদের মনে ইসলামকে প্রবিষ্ট করার সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে তাদের স্থানীয় ভাষা ও রীতিনীতির সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলা এবং স্থানীয় মহিলাদেরকে বিয়ে করা। অবশেষে তারা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের মনে ইসলামের সুমহান আদর্শ গেঁথে দিতে সক্ষম হন। সেইসাথে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জীবনযাপন শুরু করেন। মুহাজির মুসলিমগণ স্থানীয়দের সঙ্গে এমনভাবে মিশে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল, এ অঞ্চলের মূর্তিপূজারী জনপদের মনে ইসলামকে সহজে প্রবেশ করানো।

এভাবেই তাদের সম্মিলিত এবং সুবিন্যস্ত প্রচেষ্টার ফলে, সে সময়কার শাইখ আবদুল্লাহ আল-আরিফ এবং তার শাগরেদ শাইখ বুরহানুদ্দিনের প্রচেষ্টায় ইসলামের পতাকা গেঁথে যায় সুমাত্রা দ্বীপের আতশিহ রাজ্যে। এ দুজন মনীষী ইসলামি আকিদার প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। শাইখ আল-আরিফ রাজ্যের অভ্যন্তরে এবং পরবর্তী সময়ে শাগরেদ বুরহানুদ্দিন দ্বীপটির উপকূলীয় অঞ্চলে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। সুমাত্রার শাসকদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং দ্বীপটির উপকূলীয় অঞ্চলে ইসলামকে মজবুত করার মধ্যে দিয়ে এ অঞ্চলের ইসলামের বিকাশে নতুন মোড় আসে। ক্রমে ক্রমে ছড়িয়ে যেতে থাকে দ্বীপসমূহের অভ্যন্তরে।

এভাবেই চলতে থাকে ইন্দোনেশীয় অঞ্চলে ইসলামের যাত্রা। এক দ্বীপ ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ে আরেক দ্বীপে। এবং কোনো যুদ্ধ বিগ্রহ ছাড়াই। এই বিশাল অঞ্চলে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল তার সুবিমল আহ্বান নিয়ে। মুসলিম ধর্মপ্রচারক এবং ব্যবসায়ীদের সুন্দর জীবনাচার এবং উত্তম আচরণ দেখে এ অঞ্চলের লোকদের মনে ইসলাম গেড়ে নেয় স্থায়ী আসন। যার ফলশ্রুতিতে তারা লাভ করে সর্ববৃহৎ মুসলিম জনপদের খেতাব। 

তবে ইসলাম বিস্তারের এই পথ সবসময় মসৃন ছিলো না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন উপনিবেশিক শক্তি এসে আঘাত করেছে এবং মুসলিমরা তাদের সঙ্গে সংগ্রাম করেছে। যেই সংগ্রাম এর মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে আজও! 

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button