জীবনীসাম্প্রতিক

দ্রৌপদী মুর্মুঃ ভারতের প্রথম আদিবাসী নারী রাষ্ট্রপতি

ভারতের ১৫তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন শাসক বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের প্রার্থী দ্রৌপদী মুর্মু। বিজেপির পছন্দের প্রার্থী দ্রৌপদীই প্রথম কোনও আদিবাসী নারী যিনি ভারতের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে চলেছেন। গত ২১ জুলাই বৃহস্পতিবার, ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ৪ দফা ভোটের মধ্যে ৩ দফার ভোট গণনার পরই তার জয় নিশ্চিত হয়ে যায়। তিনিই দেশটির প্রথম আদিবাসী নারী, যিনি রাইসিনা হিলসের মসনদে বসলেন ৫০ শতাংশের বেশি ভোটমূল্য পেয়ে।

সরকারি অফিসের কেরানি, স্কুলশিক্ষিকা, কাউন্সিলর, বিধায়ক, মন্ত্রী, রাজ্যপাল থেকে ভারতের রাষ্ট্রপতির আসনে বসেছেন সাঁওতাল পরিবারে জন্ম নেওয়া দ্রৌপদী মুর্মু। দেশটির রাষ্ট্রপতি পদে আসিন হওয়া দ্বিতীয় নারী তিনি। তাকে নিয়েই আজকের আয়োজন।

দ্রৌপদী মুর্মু ১৯৫৮ সালের ২০ জুন, ওড়িশার ময়ুরভাঞ্জ জেলার বাইদাপোসি গ্রামে বিরাঞ্চি নারায়ণ টুডুর কাছে একটি সাঁওতালি উপজাতি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এবং দাদা উভয়েই পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার অধীনে গ্রামের প্রধান ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই আর পাঁচটা প্রান্তিক পরিবারের সাধারণ কন্যাসন্তানের মতোই বেড়ে ওঠেন দ্রৌপদী।

গ্রাম প্রধানের মেয়ে দ্রৌপদী প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে পড়াশোনা করেন রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বরের রমাদেবী উইমেন’স কলেজে। তার কর্মজীবন শুরু হয় রাজ্য সরকারের একজন কেরানি হিসেবে। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্যের কৃষি ও জ্বালানি অধিদপ্তরে একজন জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবেও কাজ করেছেন। রাজ্য রাজনীতিতে আসার আগে মুর্মু একজন স্কুল শিক্ষক হিসাবে শুরু করেছিলেন। ১৯৯৪ থেকে ৯৭ সাল পর্যন্ত রাইরংপুরে শ্রী অরবিন্দ ইনটেগরাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারে একজন সহকারী অধ্যাপক এবং ওড়িশা সরকারের সেচ বিভাগে জুনিয়র সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন।

দ্রৌপদীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। সেবার তিনি রাইরংপুর জেলার স্থানীয় নির্বাচনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। পরবর্তীসময়ে রায়রংপুর উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারর্সনও হয়েছিলেন।

ওড়িশার দুবারের বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন এ আদিবাসী নেত্রী। ২০০০ সাল এবং ২০০৪ সালে বিজেপির পক্ষে ময়ূরভঞ্জ জেলার রায়রাংপুর কেন্দ্র থেকে ভোটে জিতেছিলেন তিনি। ২০০০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বিজু জনতা দল ও বিজেপির জোট সরকারে মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাঁওতাল এ রাজনীতিক। শুরুতে বাণিজ্য ও পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিলেও পরবর্তী সময়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার অর্পণ করা হয় তাকে।

২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্য বিজেপির ‘পিছিয়ে পড়া আদিবাসী’ শাখার প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০০৭ সালে, ওড়িশার সেরা বিধায়ক হিসেবে ‘নীলকণ্ঠ পুরস্কার’ পান দ্রৌপদী। ২০০৯ সালে, বিজেডির সঙ্গে বিজেপির জোট ছিন্ন হয়ে গেলেও মুর্মু বিধানসভা ভোটে জিতে যান।

এসবের মাঝেই বিয়ে হয়েছিল দ্রৌপদীর। কোল আলো করে আসে তিন ছেলে-মেয়েও। কিন্তু যৌবনেই বিধবা হন দ্রৌপদী। হৃদরোগে মারা যান স্বামী শ্যামচরণ মুর্মু। একা হাতে তিন সন্তানকে নিয়ে কঠিনতর লড়াই শুরু হয় তার। তবে রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে সঙ্গেই ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে তুমুল বিপর্যয়। ২০০৯ সালে, রহস্যজনকভাবে মারা যায় দ্রৌপদীর এক ছেলে। সে শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ২০১২ সালে, পথ দুর্ঘটনায় মারা যান আরেক ছেলেও। মেয়ে ইতিশ্রীকে নিয়ে একা হয়ে পড়েন দ্রৌপদী। একসময় মেয়ের বিয়ে দেন ভুবনেশ্বরের বাসিন্দা এক ব্যাংক অফিসারের সঙ্গে।

এত আঘাতেও ভেঙে পড়েননি দ্রৌপদী। ২০১৫ সালে, তিনি ঝাড়খণ্ড রাজ্যের প্রথম মহিলা রাজ্যপাল (গভর্নর) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপরই সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিদায় নেন তিনি। দ্রৌপদীই ওড়িশার প্রথম আদিবাসী নেত্রী যিনি রাজ্যপালের দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

২০১৭ সালে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে আলোচনায় আসেন দ্রৌপদী। সে সময় সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে তার নামও রয়েছে বলে গুঞ্জন ওঠে। কিন্তু সেবার বিহারের রাজ্যপাল ও দলিত নেতা রাম নাথ কোবিন্দকে সরকার রাষ্ট্রপতি পদের জন্য বেছে নিয়েছিল। তখনো ঝাড়খণ্ডের গভর্নরের দায়িত্বে আসীন ছিলেন দ্রৌপদী। ২০২১ সালের ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা ছয় বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।। তিনিই ঝাড়খণ্ডের প্রথম রাজ্যপাল, যিনি পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করেছিলেন। জানা যায়, দ্রৌপদী মুর্মু বেশ সুনামের সঙ্গেই সে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার কার্যালয়ের দরজা সব সময় সব শ্রেণির মানুষের জন্য খোলা থাকত।

রাজ্যপালের দায়িত্ব ছাড়ার পর দ্রৌপদী ধ্যান করে সময় কাটাতে থাকেন। সঙ্গে রাইরংপুরে নানা সমাজকল্যাণমূলক কাজে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন।

গত কয়েক দশক ধরেই ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জন্য কাজ করে যাচ্ছিলেন দ্রৌপদী। গত ২১ জুন, বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএ থেকে দ্রৌপদীকে তাদের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। আদিবাসী আবেগে ভর করেই এবারের রাষ্টপতি নির্বাচনের প্রার্থী দাঁড় করিয়েছিল বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট। অন্যদিকে দ্রৌপদী মুর্মুর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিরোধীরা দাঁড় করায় তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রস্তাবিত ভারতের সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বিজেপির একসময়ের শীর্ষ নেতা যশোবন্ত সিনহাকে।

বর্তমানে তার বয়স ৬৪ বছর। বয়স দিয়েও তিনি দুটি নতুন রেকর্ড গড়েছেন। তিনিই এখন ভারতের সর্বকনিষ্ঠ রাষ্ট্রপতি। ভারতের স্বাধীনতার পর জন্ম নেওয়া কেউ এই প্রথম দেশটির সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন। প্রতিপক্ষ যশবন্ত সিনহাকে পরাজিত করে শেষ পর্যন্ত নিজের কর্মজীবনের একটা বৃত্ত পূরণ করলেন দ্রৌপদী।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button