জীবনী

ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বিলাল (রা:) এর জীবনী

হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের ১০ বছর পর ৫৮০ সালে, সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলীয় জনবসতি ‘হেজাজ’-এ জন্মগ্রহণ করেন হজরত বিলাল (রা.)। তাঁর পুরো নাম বিলাল ইবনে রাবাহ। যিনি ছিলেন নবী মুহাম্মদ (সা.) এর একজন ঘনিষ্ঠ ও প্রসিদ্ধ কৃষ্ণাঙ্গ সাহাবী।

বিলাল (রা.) এর পিতা রাবাহ ছিলেন একজন আরব দাস এবং তাঁর মাতা হামামাহ ছিলেন একজন প্রাক্তন আবিসিনিয় রাজকুমারী। যাকে আমুল-ফিল এর ঘটনার সময় আটক করে দাসী করে রাখা হয়। তাঁর স্থান হয় সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের এক ব্যক্তি খলফের ঘরে। সেখানেই আবিসিনিয়ার আরেক দাস রাবাহ এর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। তাঁদের ঘরেই জন্ম নেন ইসলামের একনিষ্ঠ কাণ্ডারি হযরত বিলাল (রা)। দাস হিসেবে জন্মানোয় বাবা মায়ের মৃত্যুর পর বিলাল (রা:) কেও তাঁর মনিব উমাইয়া ইবন খালাফ এর জন্য কাজ করতে হয়। একজন ক্রীতদাসের ছেলে হিসেবে তাঁকেও হতে হয় ক্রীতদাস।

হযরত বিলাল (রা:) কঠোর পরিশ্রমী ছিলেন বলে একজন ভাল দাস হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। বর্ণনা মতে, কালো বর্ণের হজরত বিলাল (রা.) বেশ লম্বা এবং শক্তিশালী ছিলেন। তাঁর চুল ছিল কোঁকড়ানো এবং নাক ছিল চ্যাপ্টা। সেই সঙ্গে মোটা ঠোঁট এবং সাদা উজ্জ্বল চোখের অধিকারী ছিলেন হজরত তিনি। তাঁর দুই চোয়াল ছিল পবিত্র দাড়িতে পরিপূর্ণ।

তবে তাঁর কণ্ঠ ছিল অদ্বিতীয়। এ ব্যাপারে সবাই একমত যে তিনি অত্যন্ত শ্রুতিমধুর, ভরাট এবং মিষ্টি কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন।

অত্যন্ত দায়িত্ববান হওয়ার তাঁর কাছেই আরবের পুতুলগুলোর ঘরের চাবি থাকতো। কিন্তু বর্ণবাদ এবং আরবের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে সেসময় তিনি সমাজের উচুস্তরে যেতে পারেননি।

একদিন মারা গেলেন খলফ। মনিব হলেন খলফের পুত্র উমাইয়া। উমাইয়া ছিলেন নির্মম। বিলালের উপর নেমে আসলো অকথ্য নির্যাতন। কিশোর বিলালের কাজে এতটুকু ভুলত্রুটি পেলেই তাঁর উপর অসহ্য নির্যাতন চালাতেন উমাইয়া। তাঁর জীবনের সকল কষ্ট এবং স্বপ্নের কথা বলতেন বন্ধু আম্মার ইবনে ইয়াসিন (রা) এর সাথে। আম্মার (রা)-ও তাঁরই মত একজন হতভাগ্য ক্রীতদাস। আম্মারের কাছেই বিলাল (রা) শুনলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর নাম।

মুহাম্মাদ (সাঃ) যখন তার নবুয়াতের কথা ঘোষণা করে আল্লাহর বা ইসলাম ধর্মমতে এক ঈশ্বরের বাণী প্রচার করা শুরু করলেন, বিলাল তখন থেকে অবতীর্ণ সকল আয়াত মনোযোগ সহকারে শুনতেন। মুহাম্মাদের ধর্মপ্রচার বিলালকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করে। সে সময়ই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। সেইসাথে তিনি মূর্তিপূজা সহ সকল প্রকার পূজা ত্যাগ করেন।

বিলালের মনিব উমাইয়া ইবনে খালাফ বিলালের ইসলাম গ্রহণের কথা জানতে পেরে তাঁকে ইসলাম ত্যাগ করার জন্য জোর করতে থাকেন এবং তাতে ব্যর্থ হয়ে তার উপর অমানবিক নির্যাতন শুরু করেন।

উমাইয়ার নির্দেশে বিলালকে মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে শুইয়ে রাখা হতো এবং তাঁর বুকের উপর একটি বড় আকারের ভারি পাথর রেখে দেয়া হত। যে কারণে সে সময় তাঁর নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে যেত। এরপরেও তিনি ইসলাম ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানালে উক্ত পাথরের উপর একজন মানুষকে উঠিয়ে তাকে লাফাতে বলা হত।

রাত্রে শিকলে বেধে তাঁকে বেত্রাঘাত করা হতো এবং পরদিন উত্তপ্ত জমিনের উপর ফেলে রাখা হত আর ক্ষত-বিক্ষত শরীরকে আরও বেশী ক্ষত-বিক্ষত করা হত। যেন তিনি অতিষ্ঠ হয়ে ইসলাম ত্যাগ করেন, নতুবা ছটফট করতে করতে মৃত্যুমুখে পতিত হন।

এছাড়াও তাঁকে বলা হত জন্তুর মতো চারপায়ে চলাফেরা করার জন্য। আদেশ অমান্য করলেই শাস্তি। কখনো বা বিলালের গলায় দড়ি বেঁধে ছেলেদের হাতে তুলে দিত। ছেলেরা তাঁকে মক্কার রাস্তায় রাস্তায় টেনে হিচড়ে নিয়ে যেত। যার ফলে অজ্ঞান হয়ে যেত বিলাল। 

উমাইয়া বিলালকে লোভ দেখান, ইসলাম ত্যাগ করলেই উঠিয়ে নেবেন শাস্তি, নতুবা মাত্রা আরো বাড়বে। কিন্তু বিলাল তাঁর আদর্শ থেকে সরেননি একচুলও। এত কিছুর পরেও বিলাল অবিরাম “আহাদ, আহাদ” (এক ঈশ্বর, এক ঈশ্বর) বলে চিৎকার করত। ফলাফলে আরো ক্ষেপে যান উমাইয়া। নির্যাতন ক্রমাগত বেড়েই চললো।

বিলালের উপর এই ভয়াবহ নির্যাতনের খবর গেলো নবী করীম (সা) এর কাছেও। কেঁদে উঠলো তাঁর অন্তর। পরবর্তীতে নবীজির চাচা হযরত আব্বাস (রা) বিলাল (রা) কে ক্রয় করে মুক্ত করে দেন। 

৬২২ খ্রিষ্টাব্দে হিজরতের বছরে, হযরত বিলাল (রা:) অন্যান্য মুসলিমদের সাথে মদিনায় হিজরত করেন। পরবর্তী এক দশক জুড়ে, তিনি মুহাম্মাদ (সা.) এর সকল সামরিক অভিযানে তার সঙ্গ দিয়েছেন। বিলাল মুহাম্মাদ (সা.) এর বর্শা বহনকারী হওয়ার সম্মাননা অর্জন করেন। 

কিছুদিন পরের কথা। নবীজি (সা) মদিনা সফরে গেলেন। নামাজ পড়ার জন্য মসজিদ তৈরি হলো। কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো লোকজনকে একত্রিত করা নিয়ে। কী করা যায় তা নিয়ে ভাবতে লাগলেন সবাই। একদিন নবীজির আরেকজন প্রিয় সাহাবা আবদুল্লাহ বিন যায়েদ (রা) স্বপ্নাদেশের মাধ্যমে আযানের কথাগুলো শুনলেন। নবীজিকে শোনাতেই তা তাঁর পছন্দ হলো। তিনি আবদুল্লাহ বিন যায়েদকে আদেশ দিলেন বিলাল (রা)-কে কথাগুলো শিখিয়ে দেয়ার জন্য। বিলাল (রা) এর কণ্ঠস্বর অত্যন্ত সুরেলা এবং মিষ্টি হওয়ায় নবীজি (সা) বললেন, “বিলালই হবে ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন।” তারপর থেকে বিলালের আযানেই আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিতো সকল ধর্মপ্রাণ মুসলিম। তাঁর আযানে মন এক অদ্ভুত পবিত্রতায় ছেয়ে যেত।

বিলাল (রা) ইসলামের প্রতি তাঁর ভালোবাসা, ত্যাগ আর নিষ্ঠার পুরস্কার স্বরূপ লাভ করলেন সারা মুসলিম জাহানের প্রথম মুয়াজ্জিন হওয়ার গৌরব। তিনি নবী করিম (সাঃ) এর এবং প্রায় সমস্ত সাহাবাদেরই প্রিয়ভাজন ছিলেন। নবীজিকে তিনি প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন।

একসময় অসুস্থ হয়ে নবীজি (সা) ইন্তেকাল করলেন। শোকে বিহ্বল বিলাল (রা) মদিনা ছেড়ে চলে যেতে চাইলেন। কিন্তু খলীফা আবু বকর (রা) এর অনুরোধে মদিনায় থেকে গেলেও রাসুলের (সা) মৃত্যুর পর যতদিন বেঁচে ছিলেন, তাঁর মুখে কোনো হাসি ছিলো না।

লোকে তাঁর সুমধুর কণ্ঠের আযান শুনতে চাইতো। কিন্তু তিনি রাজী হতেন না। অনেক চেষ্টার পরেও বিফল হওয়ায় সাহাবীরা নবীজির দুই দৌহিত্র হযরত হাসান (রা) এবং হযরত হোসাইন (রা) দ্বারা অনুরোধ করানোর পর  বিলাল (রা) আযান দিতে রাজি হন। এই ছিলো তাঁর শেষ আযান। এই আযান তিনি আর শেষ করতে পারেন নি। আযানের মাঝেই অজ্ঞান হয়ে যান।

এরপর মদিনা ছেড়ে তিনি চলে যান সিরিয়ায়। রাসুল (সাঃ)-কে ছাড়া তাঁর জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছিলো। একসময় চিরবিদায়ের ডাক এলো। দামেস্কের ফাওলান নামক স্থানে ৬৪১ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করলেন ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হযরত বিলাল (রাঃ)। দাফন করা হলো ফাওলানের বাবুস সাগীর গোরস্থানে। আল্লাহর রাস্তা আর নিজের আদর্শের জন্য আমরণ লড়াই করে যাওয়া সেই অকুতোভয় বীর সৈনিক আজও সেখানেই চির নিদ্রায় শায়িত আছেন।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button