প্রযুক্তিসাম্প্রতিক

জেমস ওয়েব কি এবং কিভাবে এটি অতীতের মহাকাশের ছবি তুলছে!

সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত একটি বিষয় হলো, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ। কারণ সম্প্রতি এই টেলিস্কোপ দিয়ে তোলা মহাবিশ্বের কয়েকশ কোটি বছর আগের প্রথম সম্পূর্ণ রঙিন ও চমকপ্রদ ছবি প্রকাশ করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে মার্কিন গবেষণা সংস্থা নাসা।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মূলত মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা, কানাডীয় মহাকাশ সংস্থা ও ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টায় নির্মিত একটি মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র। এই যন্ত্রটিকে সংক্ষেপে ওয়েব (Webb) নামে ডাকা হয়। যার মূল কাজ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে এবং শেষ হয় ২০১৬ সালে। পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ওয়েবকে ২০২১ সালের ২৫শে ডিসেম্বর, সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়। উৎক্ষেপণের পরে ওয়েব প্রায় ৩০ দিন মহাকাশ যাত্রা সম্পন্ন করে পৃথিবী থেকে ১৫ লক্ষ কিলোমিটার দূরত্বে পৌঁছায়। সেখান থেকে পৃথিবীর অন্ধকার পার্শ্বে থেকে পৃথিবীর সাথে সাথে একই সময়ে বছরে একবার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করবে।

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী টেলিস্কোপ। এক হাজার কোটি ডলার মূল্যের এই টেলিস্কোপে ৬.৫ মিটার চওড়া সোনার প্রলেপ লাগানো প্রতিফলক আয়না আছে এবং আছে অতি সংবেদনশীল ইনফ্রারেড তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের যন্ত্রপাতি।

ওয়েবের মূল দুইটি বৈজ্ঞানিক লক্ষ্য হল ছায়াপথের জন্ম ও বিবর্তন অর্থাৎ এগুলোর বিচ্ছুরণ কীভাবে ঘটেছিল তার ছবি নেয়া এবং নক্ষত্র ও গ্রহসমূহের সৃষ্টি সংক্রান্ত গবেষণা। এছাড়া দূরের গ্রহগুলো মানুষের বাসযোগ্য কিনা সে বিষয়ে অনুসন্ধান করা। উপরন্তু, এটি সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ, উপগ্রহ ও খ-বস্তুগুলির অনেক বেশী খুঁটিনাটি দেখতে সক্ষম হবে।

চিত্রঃ সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদের সাপেক্ষে জেমস ওয়েবের অবস্থান। ছবি সূত্র: নাসা

গত ১২ জুলাই সোমবার, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে তোলা একটি ছবির সঙ্গে বিশ্বকে পরিচয় করিয়ে দেন। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা এ ছবিকে মহাকাশের অনেক গভীর থেকে তোলা ছবি হিসেবে বর্ণনা করে। ছবিটি মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলোর একটি অংশকে ধারণ করেছে। নাসা জানিয়েছে, এ যাবত বহির্বিশ্বের যত ছবি তোলা হয়েছে, তার মধ্যেই এটিই সবচেয়ে গভীর, তীক্ষ্ণ ও পরিচ্ছন্ন ইনফ্রারেড ছবি। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘এসএমএসিএস ০৭২৩’। যেটি মূলত গ্যালাক্সি ক্লাস্টার বা একগুচ্ছ ছায়াপথ। সেইসাথে এই ছবিটি আকাশে ছড়িয়ে থাকা আরও দূরবর্তী ছায়াপথের উপস্থিতি প্রকাশ করেছে। 

                                          চিত্রঃ এসএমএসিএস ০৭২৩, সূত্রঃ নাসা

এই ছবিতে বেশি উজ্জ্বল ও লম্বাটে যেসব দাগ দেখা যাচ্ছে—সেগুলো পৃথিবীর আবাসস্থল আকাশগঙ্গা ছায়াপথ বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির প্রতিবেশী তারকা। এ ছাড়া অন্য আলোকবিন্দুগুলোও একেকটি ছায়াপথ, তারকা নয়।

যেখানে হাবল টেলিস্কোপকে এই ধরনের তথ্য সংগ্রহ করতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে আকাশে পর্যবেক্ষণ করতে হতো। সেখানে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ মাত্র সাড়ে ১২ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে মহাবিশ্বের গভীর থেকে এই ছবি তুলে এনেছে।

এ যাবতকালে এটাই মহাজগতের প্রাচীনতম অবস্থার সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে তোলা চিত্র। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ছবিটিতে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা জ্বলজ্বলে আলোক রশ্মির বিচ্ছুরণ ফুটে উঠেছে। যেটি ১৩০০ কোটি বছর আগের মহাবিশ্বের প্রাচীনতম রূপ।

এ বিষয়ে নাসার গবেষক বিল নেলসন জানান, আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে এক লাখ ৮৬ হাজার মাইল। আর এই ছবিতে ছোট ছোট যে আলোর বিচ্ছুরণ দেখা যাচ্ছে, সেগুলো ভ্রমণ করেছে ১৩০০ কোটি বছর। 

এখন এর চেয়েও চমকপ্রদ বিষয় হল, বিজ্ঞানীরা ওয়েব টেলিস্কোপের তথ্যের গুণগত মান বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারছেন যে, এই ছবিতে যা দেখা যাচ্ছে এই টেলিস্কোপ তার থেকেও অনেক গভীরে গিয়ে মহাজগতের চিত্র তুলে আনতে সক্ষম। এর ফলে, অতি শক্তিশালী এই দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে মহাশূন্যের অনেক ভেতর পর্যন্ত এখন দেখা এবং তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে।

ধারনা করা হয়, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ দিয়ে ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগের আলো দেখা সম্ভব। বিগ ব্যাঙ হয়েছিল ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে। তার মানে ইউনিভার্স শুরুর ১০০ মিলিয়ন বছর পরে যে প্রথম তারাটির জন্ম হয়েছিল, তার সম্পর্কে জানা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে প্রথম গ্যালাক্সি কিভাবে তৈরি হয়েছিল, তার উপরেও জানা যাবে।

এছাড়াও গত ১২ জুলাই, বৃহস্পতি গ্রহের মতো বড় একটি এক্সোপ্লানেটের তথ্য প্রকাশ করেছে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ। নাসার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ১ হাজার ১৫০ আলোকবর্ষ দূরে ডব্লিউএএসপি-৯৬বি নামের ওই গ্যাসীয় গ্রহটির অবস্থান। সূর্যের মতো একটি নক্ষত্রকে ঘিরে আবর্তন করা উষ্ণ বায়ুমণ্ডলের পৃথিবীসদৃশ ওই গ্রহে (এক্সোপ্লানেট) মেঘ ও কুয়াশা থাকার প্রমাণও মিলেছে।

নাসার এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গ্রহ হিসেবে এখন পর্যন্ত ডব্লিউএএসপি-৯৬বি কে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে এ টেলিস্কোপ দিয়ে। এ থেকে দূরবর্তী পৃথিবীসদৃশ গ্রহটির বায়ুমণ্ডল বিশ্লেষণ করার জন্য এ টেলিস্কোপের অভূতপূর্ব সক্ষমতা লক্ষ করা গেছে। এর আগে এক্সোপ্লানেটটি কে আগে ভূমি থেকে এবং হাবল টেলিস্কোপ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে সেখানে যে পানির বাষ্প, কুয়াশা ও মেঘের প্রমাণ পেয়েছে, তা আগে সম্ভব হয়নি।

এছাড়াও, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ স্টিফানস কুইন্টেট নামক ছায়াপথ গুচ্ছের ছবি সামনে এনেছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। পাশাপাশি গ্যাস ও ধূলিকণায়ভরা মৃত নক্ষত্রের একটি সমাধিক্ষেত্রও দেখাতে সক্ষম হয়েছে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছবি হচ্ছে ‘কারিনা নেবুলা’।

                                                      চিত্রঃ এনজিসি ৩৩২৪, সূত্রঃ নাসা

এই ছবিতে যেটি দেখে আলো ঝলমল পাহাড়ের দৃশ্যের মতো মনে হচ্ছে তা আসলে ক্যারিনা নেবুলা থেকে একটি নতুন নক্ষত্র সৃষ্টির প্রান্ত। এটির নাম ‘এনজিসি ৩৩২৪’। ওয়েব টেলিস্কোপ চিত্রটি প্রথমবার নক্ষত্রের জন্মের নানা দিক তুলে ধরেছে, যা আগে কেউ দেখেনি। এছাড়াও, টেলিস্কোপে ধারণকৃত কিছু ছবিতে এমন কাঠামোও রয়েছে, যা বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করতে পারেননি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ আসলে কিভাবে কাজ করে?

আমরা জানি, প্রতি সেকেন্ডে আলোর গতিবেগ ১ লাখ ৮৬ হাজার মাইল। সেই হিসাবে বর্তমান নক্ষত্রের যে আলো আমরা দেখি, তা কিন্তু আজকের নয়। তা আসলে ১৩০০ কোটি বছরেরও বেশি পুরোনো। যা এতদিনে আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে। টেলিস্কোপে পৌঁছানোর আগে কয়েকশ কোটি বছর ধরে ভ্রমণ করেছে এ আলো। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ যে ছায়াপথের ছবি তুলেছে, তা ৪৬০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে রয়েছে। সেই হিসাবে যে ছবি ক্যামেরাবন্দি হয়েছে তা ১৩০০ কোটি বছর আগের।

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ মূলত ইনফ্রারেড রশ্মি সনাক্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হইছে। এই মহাবিশ্বের যত দূরে দৃষ্টি রাখা সম্ভব হবে আমরা ততই মহাবিশ্বের অতীতকে দেখতে পাবো। যার ফলে, ১৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের কোনো গ্যালাক্সি থেকে আসা আলো আমাদেরকে ১৩ বিলিয়ন বছর আগের গ্যালাক্সি সম্পর্কে ধারনা দিবে।

বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করছেন, এই মহাবিশ্ব প্রতিনিয়ত প্রসারিত হচ্ছে এবং দূরের গ্যালাক্সি গুলো প্রতিনিয়ত আমাদের থেকে আরো দূরে সরে যাচ্ছে। ওই দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আসা আলোও দৃশ্যমান ওয়েব লেনথ থেকে আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পাওয়ায় ইনফ্রারেড এ রূপান্তরিত হয়ে আমাদের কাছে পৌছাচ্ছে। যার কারণে জেমস ওয়েবের মাধ্যমে ইনফ্রারেড রশ্মি সনাক্ত করা হচ্ছে।

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ এর সবচেয়ে বড় ২টা অংশের একটা ৬ মিটার ব্যাসের হলুদ প্লেট, যা দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আসা ইনফ্রারেড রশ্মি গ্রহণ করবে। আরেকটা হচ্ছে প্রায় টেনিস কোর্টের সাইজের ৫ স্তরের হিট শিল্ড যা সূর্য এবং পৃথিবীর দিক বরাবর বিস্তৃত করে রাখা হবে। যাতে করে সূর্য, পৃথিবী ও চাঁদ থেকে আগত তাপ মেইন টেলিস্কোপের অংশে পৌঁছাতে না পারে। কারন, দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আসা দূর্বল হিট সিগনাল আটক কারার জন্যে টেলিস্কোপের তাপমাত্রা প্রায় -২৩০° সেলসিয়াস এ রাখতে হবে! মানে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের একপাশে পানি সিদ্ধ হয়ে যাবে, আর ঠিক অপর পাশে বাতাসও ফ্রিজ হয়ে যাবে।

প্রায় টেনিস কোর্টের মতন বড় হিট শিল্ড কোনোভাবেই একটা রকেটের ভিতর দিয়ে পাঠানো সম্ভব না বলে নাসার বিজ্ঞানীরা কাগজ ভাজ করার খুবই প্রাচীন জাপানিজ টেকনিক অরিগ্যামিরর সাহায্য নিয়েছে এবং এই বড় হিট শিল্ড আর টেলিস্কোপের অংশকে ভাজ করে মহাকাশে পাঠায় দিচ্ছে।

জেমস ওয়েবের ক্যামেরা বর্ণালির ইনফ্রারেড অংশে কাজ করে। যা খালি চোখে দেখা যায় না। কিন্তু নাসার নতুন ছবির রঙ দৃশ্যমান। এ বিষয়ে নাসার বিজ্ঞানীরা জানান, আমাদের চোখে দৃশ্যমান করতে নভো দূরবিনের ছবি সবচেয়ে বড় তরঙ্গ দৈর্ঘ্যকে লাল, মাঝেরটিকে সবুজ ও সবচেয়ে ছোট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের আলোকে নীল হিসেবে সনাক্ত করা হয়েছে। যার ফলে ছবিগুলো আমাদের জন্য দৃশ্যমান হয়েছে।  

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button