সাম্প্রতিক

সিলেট-সুনামগঞ্জে ভয়াবহ বন্যাঃ নেপথ্যে যত কারণ!

এই বছর এ নিয়ে তৃতীয় দফায় বন্যার কবলে পড়েছে বাংলাদেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কুড়িগ্রামসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলো। একের পর এক বন্যায় বিপর্যস্ত এ অঞ্চলের বাসিন্দারা। সবমিলিয়ে ৪০ লাখের বেশি মানুষ পানি বন্দী হয়ে পড়েছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারীসহ দেশের আরও অন্তত ১৭টি জেলা কমবেশি বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে বলে জানা যায়।

ইতিমধ্যে সিলেটের ৮০ শতাংশ ডুবে গেছে, ৯০ শতাংশ ডুবেছে সুনামগঞ্জের। সিলেট-সুনামগঞ্জ এলাকায় পানির উচ্চতা ১৯৮৮, ১৯৯৮ কিংবা ২০০৪ সালের চেয়ে বন্যার পানির উচ্চতায় নতুন রেকর্ড করেছে।

হঠাৎ শুরু হওয়া বন্যার পেছনে অতিবৃষ্টির বাইরে আরও কয়েকটি কারণ দেখছেন গবেষকরা। চলুন জেনে আসা যাক, কি সেই কারণগুলো।

বাংলাদেশে বেশ কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে সিলেটে অঞ্চলের বারবার বন্যার জন্য ইটনা-মিঠামইন সড়ককে দায়ী করছেন। এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা জানান, অপরিকল্পিত ভাবে রাস্তা তৈরির কারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া বন্যার অন্যতম কারণ।

এ বিষয়ে নদী গবেষক মমিনুল হক সরকার বলছেন, ”হাওরে যেসব রাস্তা পূর্ব-পশ্চিমে তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোই হাওরের পানি চলাচলে মূল বাধার তৈরি করছে। এরকম অনেক রাস্তা কোনরকম পরিকল্পনা ছাড়া তৈরি করা হয়েছে”।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে উজান থেকে পানি নামে উত্তর থেকে দক্ষিণে। ইটনা, মিঠামইন সড়কও উত্তর থেকে দক্ষিণে তৈরি। ফলে এটা হয়তো হাওরের পানি প্রবাহের কিছুটা বাধার তৈরি করছে, কিন্তু বন্যার এটাই একমাত্র কারণ নয়।

তারা এই তীব্র বন্যার জন্য মেঘালয়ের অতিবৃষ্টি কে দায়ী করছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে ভারতের চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা জলীয় বাষ্প মেঘালয়ের পাহাড়ের সাথে ধাক্কা লেগে ওপরে উঠে যায়। সেখানে ভারী হয়ে বৃষ্টি আকারে পড়তে শুরু করে। সুনামগঞ্জ জেলার সীমান্ত থেকেই ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি এলাকার শুরু হয়েছে। ফলে সেখানকার পানি সরাসরি বাংলাদেশের হাওরে এসে মেশে। ভৈরব বা মেঘনা নদী হয়ে সাগরে চলে যায়। এই হঠাৎ বন্যার পেছনে চেরাপুঞ্জির এই প্রবল বৃষ্টিপাতকে প্রধান কারণ বলে মনে করছেন অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম।

চেরাপুঞ্জিতে যখন বৃষ্টি হয়, সেটা ছয় থেকে আট ঘণ্টার ভেতরে তাহিরপুরে চলে আসে। কিন্তু সেখানে এসে পানি আর দ্রুত নামতে না পারার কারণে সেটা আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে বন্যার তৈরি করছে।

প্রশ্ন উঠেছে, তবে সেই ঢলের পানি কেন সিলেট থেকে দ্রুত সরে দক্ষিণে নেমে যাচ্ছে না? পানি প্রবাহে বাধাগ্রস্ত কেন হচ্ছে? সিলেট-সুনামগঞ্জে বন্যার ভয়াবহতা দ্রুত তীব্র আকার ধারণ করেছে কোন কারণে?

এজন্য নদীর নাব্যতা কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। নদী গবেষক মুমিনুল হক সরকার বলছেন, প্রতি বছর উজান থেকে পানির সাথে পলি আর পাথর নেমে আসে। সেটা এসে বাংলাদেশের অংশে নদীর তলদেশ ভরে ফেলে। ফলে নদীর পানি বহনের ক্ষমতা কমে যায়। তখন এই নদীতে বেশি পানি আসলে সেটা উপচে আশেপাশের এলাকা ভাসিয়ে ফেলে। বিশেষ করে ভারতের উজানে পাথর উত্তোলনের ফলে মাটি আলগা হয়ে নদীতে চলে আসে। ফলে নদীর তলদেশ ভরে যায়। সেখানে নাব্যতা সংকট তৈরি হচ্ছে। সেখানে গাছও কেটে ফেলা হচ্ছে।

পরিবেশ আন্দোলনের নেতা আব্দুল করিম কিম বলেন, ‘ভারতের উজানের পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের সঙ্গে প্রচুর মাটি আর বালুও আসছে। কারণ উত্তর-পূর্ব ভারতে বিশেষ করে মেঘালয় বৃক্ষশূন্য করার কারণেই এমন ভূমিক্ষয় হচ্ছে। এতে সুরমাসহ সিলেটের অন্য নদ-নদীর তলদেশ আরো ভরাট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর পাশাপাশি নদীগুলো ঠিকমতো ড্রেজিং না হওয়া, ময়লা-আবর্জনায় নদীর তলদেশ ভরে যাওয়া, ঘরবাড়ি বা নগরায়নের ফলে জলাভূমি ভরাট হয়ে যাওয়াকেও দায়ী করছেন গবেষকরা। এছাড়াও সিলেট–সুনামগঞ্জ দুই শহরেই সুরমা নদীকে করে তোলা হয়েছে ময়লা–আবর্জনার ভাগাড়। সিলেটের নগরীর কালীঘাট থেকে টুকের বাজার, কালীঘাট থেকে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কুচাই এলাকা পর্যন্ত সর্বত্রই আবর্জনার ভাগাড়। একইভাবে সুনামগঞ্জ শহর এলাকায় সুরমা নদীর তীর এখন ময়লার ভাগাড়, আবর্জনার স্তূপ। সুনামগঞ্জ পৌর শহরের সাহেববাড়ি সেলুঘাট, উত্তর আরপিননগর, পশ্চিমবাজার, মধ্যবাজার, চাঁদনীঘাট, সুরমা হকার্স মার্কেট, জগন্নাথবাড়ি, প্রধান মাছ বাজার এলাকা, জেলরোড ফেরিঘাট এলাকা, লঞ্চঘাট এলাকা, উকিলপাড়া এলাকা, ষোলঘর এলাকায় নদীতীরে স্থানীয় লোকজন নিয়মিত হোটেল-রেস্তোরাঁর পচা ও উচ্ছিষ্ট খাবারসহ নানা রকমের বর্জ্য ফেলছেন। ফলে নদী হারিয়ে ফেলছে তার বহনক্ষমতা, নাব্যতা।

এছাড়াও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এবারের হঠাৎ বন্যার পেছনে অপরিকল্পিত উন্নয়নও একটি কারণ। সিলেট বা সুনামগঞ্জ এলাকায় আগে ভূমি যেরকম ছিল, নদীতে নাব্যতা ছিল, এতো রাস্তাঘাট ছিল না বা স্থাপনা তৈরি হয়নি। ফলে বন্যার পানি এখন নেমে যেতেও সময় লাগে। আগে হয়তো জলাভূমি, ডোবা থাকায় অনেক স্থানে বন্যার পানি থেকে যেতে পারতো। কিন্তু এখন সেটা হচ্ছে না। এর বাইরেও হাওরে বিভিন্ন জায়গায় পকেট পকেট রোড করা হচ্ছে। ফলে পানি প্রবাহে বাধার তৈরি হচ্ছে। শহর এলাকায় বাড়িঘর তৈরির ফলে পানি আর গ্রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। এসব কারণে আগাম বন্যা হচ্ছে এবং অনেক তীব্র বন্যা হচ্ছে।

তাছাড়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ বা নেত্রকোনা হাওর এলাকায় বেশিরভাগ জনপদে শহর রক্ষায় বাঁধ নেই। সেটা করা না হলে বাড়িঘর উঁচু করে তৈরি করতে হবে, আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করতে হবে। সেটাও করা হয়নি। ফলে কোন কারণে হাওরে বা নদীতে পানি বাড়তে শুরু করলে তা খুব দ্রুত শহরে বা আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করে। যার কারণে এমন আকস্মিক বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হচ্ছে।

এই ভয়াবহ বন্যার পেছনে নগরের জলাশয় ভরাট ও দখল কে আরেকটি কারণ বলে মনে করছেন অনেকেই। 

সিলেট নগরীতে গত ৩০ বছরে ভরাট হয়ে গেছে নগরীর অর্ধশতাধিক দিঘি। অনেক জলাশয় ভরাট করে সরকারি প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। এছাড়া সিলেটের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ছোট-বড় প্রায় ২৫টি প্রাকৃতিক খাল। যেগুলো ছড়া নামে পরিচিত। পাহাড় বা টিলার পাদদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ছড়াগুলো গিয়ে মিশেছে সুরমা নদীতে। এসব ছড়া দিয়েই বর্ষায় পানি নিষ্কাশন হতো। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো না। এখন অনেক স্থানে এসব ছড়ার অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায় না। নগরীর ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া এসব ছড়ার দুপাশ দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করেছে অবৈধ দখলদাররা। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই নগর জুড়ে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button