ইতিহাসপ্রযুক্তি

স্ট্যানলি মেয়েরঃ পানি থেকে জ্বালানি তৈরির যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন যিনি

কেমন হত যদি তেলের বদলে পানিতে চলত গাড়ি! অবিশ্বাস্য লাগছে? কখনোই সম্ভব নয় বলে মনে হচ্ছে? কিন্তু শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি এই যে, এটা সম্ভব। এবং এমন আবিষ্কার ইতিমধ্যে ঘটেও গেছে। যা পানি জ্বালানি কোষ নামে পরিচিত।

১৯৭৫ সালে, আরব তেল নিষেধাজ্ঞার সময় সৌদি আরব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয় এবং তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। ফলাফলস্বরূপ, মার্কিন মুলুক প্রায় তেলশূন্য হয়ে পড়ে এবং অনেকগুলি কর্পোরেশন দেউলিয়া হয়ে যায়। আমেরিকান অটোমোবাইল শিল্পও ব্যাপকভাবে হুমকির মুখে পড়ে এবং নতুন গাড়িগুলির চাহিদা শূন্যের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। এসময় কিছু করার প্রয়াস থেকেই তার চিরায়ত উদ্যোম নিয়ে কাজে লেগে পরেন মার্কিন উদ্ভাবক স্ট্যানলি অ্যালেন মেয়ের। 

স্ট্যানলি মেয়ের ১৯৪০ সালের ২৪ আগস্ট, যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহন করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বাস ইস্ট সাইড এলাকায় তিনি জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছিলেন। ওহিও অঙ্গরাজ্যের গ্রান্ডভিউ হাইটস থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ওহিও স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন স্ট্যানলি। তবে গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ না করেই সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। তরুণ স্ট্যানলি সবসময়েই নতুন কিছু তৈরি করার আগ্রহ দেখাতেন। তার যমজ ভাই স্টিফেন মেয়েরের সাথে ছোটবেলাতেই নিজেদের খেলনা তৈরি করতেন। তার এই আগ্রহ থেকেই পরিণত বয়সে তিনি অসংখ্য উদ্ভাবনের পেটেন্ট করেন, যার মধ্যে ব্যাংকিং সিস্টেম, সমুদ্রবিদ্যা, হৃদপিন্ডের পর্যবেক্ষণসহ নানাবিধ ক্ষেত্রে অবদান রেখেছিলেন। অবাক করা বিষয় ছিল যে, পেটেন্ট অফিসে আবেদনের সাধারণত ৮ মাসের মাথাতেই তার উদ্ভাবনগুলোর ব্যবহারিক প্রয়োগ শুরু হয়ে যেত, যা ছিল তুলনামূলক দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়ন।

স্ট্যানলি যে সময় পেটেন্ট জমা দেন, তখন তিনি ওহিওতে বাটেল ফাউন্ডেশনে কাজ করেছেন, যা ছিল মানবিকতার জন্য প্রযুক্তিগত গবেষণা ও উন্নয়নের ভিত্তিক একটি সংস্থা। স্ট্যানলির বেশিরভাগ কাজ ওখানে থাকা অবস্থাতেই হয়েছিল। এছাড়াও, নাসা’র জেমিনি স্পেস প্রোগ্রামের সাথে যুক্ত ছিলেন তিনি।

দেশিয় অর্থনীতির এমন অকালে তিনি এমন একটি গাড়ি তৈরি করতে চাইলেন, যা সমগ্র অটোমোবাইল শিল্পে বিপ্লব ঘটাবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জীবাশ্ম জ্বালানির প্রধান নির্ভরতা মিটিয়ে ফেলবে। একটি সাক্ষাৎকারে স্ট্যানলি জানান, “আমাদের বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে উঠেছে এবং খুব তাড়াতাড়ি তা করতে হবে।” এর অর্থ ছিল তেলের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে গেলে বা বিকল্প জ্বালানি তৈরি করা না গেলে আমেরিকার সমগ্র অর্থনীতি ঘুরে যাবে। এ থেকেই স্ট্যানলি মেয়ের হাইড্রোজেন জ্বালানি কোষ গাড়ীর উন্নতি ঘটাতে মনোনিবেশ করেন। 

১৯৭৫ সালের শেষ দিকে, স্ট্যানলি পানি জ্বালানি কোষ নামে অবিরাম গতি সম্পন্ন একটি মেশিনের প্রযুক্তিগত নকশা তৈরি করেন। তিনি দাবি করেন, এই ডিভাইস মোটরগাড়িতে সংযুক্ত করলে পেট্রোলের পরিবর্তে পানিকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে। এখন পর্যন্ত ধারণা করা হয়, পানিকে জ্বালানিতে রুপান্তরিত করার প্রথম পদক্ষেপটি স্ট্যানলিই নিয়েছিলেন। তার এই উদ্ভাবন চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়িত হলে মোটরগাড়ির বিকাশে আমূল পরিবর্তন হত এবং জীবাশ্ম জ্বালানি সংকটকে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হত। 

কারণ, জ্বালানি কোষটি পানির পরমাণুগুলিকে তার মৌলিক রূপে অর্থাৎ দুটি হাইড্রোজেন পরমাণু এবং একটি অক্সিজেন পরমাণুতে ভাগ করে ফেলে। পরে হাইড্রোজেন পরমাণুটি পুড়ে শক্তি উৎপন্ন করে যা গাড়ির চলার জন্য ব্যয় হবে। অবশিষ্ট অক্সিজেন অব্যবহৃত পানির সাথে নির্গমন নল দিয়ে বেরিয়ে যাবে, ফলে পরিবেশ দুষনেরও ভয় থাকবে না। এটা ছিল রীতিমতো বৈপ্লবিক। এই পদ্ধতিটি মূলধারার শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহার করে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে, যা গ্লোবাল ওয়ার্মিং হ্রাস করবে। এই আবিষ্কার একইসাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তেল নির্ভরতা, এমনকি সাধারণভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রতি বিশ্ব নির্ভরতাও কমে আসবে। এটা হতে পারত চূড়ান্ত বিকল্প জ্বালানি, যার জোগান ছিল পর্যাপ্ত এবং সর্বত্র। তার জ্বালানি কোষ ইঞ্জিন তৈরির কয়েক মাস পরে মেয়ের একটি ছোট গাড়ি তৈরি করেন, যা তার বৈপ্লবিক জ্বালানি কোষ ইঞ্জিন দ্বারা চলেছিল।

পরবর্তীতে বেশকিছু উল্লেখযোগ্য ব্যক্তির উপস্থিতিতে মেয়ের তার গাড়িটির প্রদর্শন করান। গাড়িটির চমৎকার উদ্ভাবনী এবং বৈপ্লবিক ক্ষমতা দেখে তারা প্রত্যেকেই অবাক হয়ে যান। তারা সবাই মেনে নিয়েছিল যে, মেয়ের জ্বালানি কোষটি তড়িৎবিশ্লেষণে হাইড্রোজেন জ্বালানিতে পরিণত হতে পারে এবং আনুমানিক হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি হাইড্রোজেন উৎপন্ন করে।

তাহলে, এখন কোথায় সেই পানিচালিত গাড়ি? স্ট্যানলি মেয়ের ই বা কেন এক অপরিচিত নাম? 

এই বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্যে চলুন আবার একটু পেছনে ফিরে তাকাই।

যদিও আইনী জটিলতা শুরুর আগ পর্যন্ত সবকিছুই ভালোভাবে চলছিল। তবে হাইড্রোজেন জ্বালানি কোষ উদ্ভাবনের কয়েক মাস পরেই বিভিন্ন আইনজীবীদের কাছ থেকে অভিযোগ আসতে শুরু করে যে, হাইড্রোজেন চালিত গাড়ীটি প্রতারণামূলক এবং অবৈধ। মেয়েরের আবিষ্কারের বিরুদ্ধে অনেক মামলা করা হয়েছিল। তার পানি জ্বালানি কোষটি আদালতে তিনজন বিশেষজ্ঞ সাক্ষী দ্বারা পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং তারা মতামত দেন এখানে বৈপ্লবিক কিছুই ছিল না এবং এটি কেবল প্রচলিত তড়িৎবিশ্লেষণ ব্যবহার করে। অনেক বিনিয়োগকারী দাবি করেছেন যে, স্ট্যানলি বিপ্লবী কিছুই করেননি এটি মানি লন্ডারিংয়ের বিষয়। এছাড়াও, যুগান্তকারী গাড়িটি আবিষ্কার করার পর হঠাৎ ই শুত্রুর সংখ্যা বাড়তে থাকে স্ট্যানলির। আমেরিকার অয়েল কোম্পানি গুলো কোনো ভাবেই চাচ্ছিলো না স্ট্যানলির এই যুগান্তকারী আবিষ্কার ছড়িয়ে পড়ুক। তাহলে তাদের ব্যবসায়ের যে বারোটা বাজবে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনকি তার মৃত্যুকেও এই রোষানলের বলি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

১৯৯৮ সালের ২১ মার্চ, রহস্যজনকভাবে খুন হন স্ট্যানলি মেয়ের। তারা দুই ভাই বেলজিয়ান বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে একটি রেস্টুরেন্টে মিটিং এ থাকাকালীন বিষ প্রয়োগে মারা যান স্ট্যানলি। তার ভাইয়ের বক্তব্য থেকে জানা যায়, বিনিয়োগকারীদের সাথে আলাপের এক পর্যায়ে মেয়ের ক্র্যানবেরি জুসে চুমুক দেয়। এরপরেই সে তার গলায় হাত দিয়ে দরজার বাইরে বেরিয়ে পড়লেন এবং হাঁটু গেড়ে বসে অনবরত বমি করতে শুরু করেন। মৃত্যুর আগে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তার জুসে বিষ দেওয়া হয়েছিল। যা তার ভাইকে বলতে পেরেছিলেন তিনি। তিন মাস তদন্ত শেষে উদঘাটিত হয় সেরেব্রাল অ্যানোরিসিম থেকে অর্থাৎ বিষক্রিয়ার মারা যান মেয়ের। তবে কোন অপরাধীই আর শনাক্ত হয়নি। পরিচিতজনরা ধারণা করছেন, এটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকান্ড, কারণ তার পানি জ্বালানী কোষের ধারণা মুক্ত শক্তির অবারিত দ্বার হিসেবে অটোমোবাইল সহ শিল্পক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসত। হয়তো পুজিঁবাদীদের একক নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যেত অথবা জীবাশ্ম জ্বালানি করায়ত্ত করার শক্তির লড়াই খুব একটা বেগবান হত না। পৃথিবীর সামগ্রিক বিকাশের তুলনায় মুষ্টিমেয় ক্ষমতাধরদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার লড়াই জয়ী হয়। স্ট্যালিন মেয়েরের সাথে সাথে একটি যুগান্তকারী আবিষ্কারও মাটি চাপা পড়ে যায়।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button