জীবনীসংবাদ

স্মরণকালের সেরা অর্থ আত্মসাৎকারী, পি কে হালদার!

৩৫০০ কোটি টাকা লোপাট করে দেশের আর্থিক খাতে আলোচনার শীর্ষে একটি নাম, প্রশান্ত কুমার হালদার ওরফে পি কে হালদার। একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও একটি ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা এই লোকটিই একসময় দেশের চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে পথে বসিয়ে দেন। সেইসাথে জন্ম দেন দেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির।

পি কে হালদারের জন্ম পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার দিঘিরজান গ্রামে। বাবা প্রয়াত প্রণনেন্দু হালদার ও মা লীলাবতী হালদার। তার বাবা ছিলেন একজন কৃষক এবং মা ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষিকা।

প্রশান্তের ছোটবেলা কেটেছে দারিদ্রতার মধ্যে। কিন্তু সেসময়ই তার অদম্য মেধার প্রকাশ পেয়েছিলো। পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পান প্রশান্ত। দীঘিরজান উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াকালীন অষ্টম শ্রেণিতেও তিনি বৃত্তি পান। স্থানীয়দের মতে, মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায়ও ফার্স্ট ডিভিশন অর্জনের পাশাপাশি বৃত্তি পান প্রশান্ত। এসএসসি পাস করার পর প্রশান্ত বাগেরহাটের পিসি কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ইঞ্জিনিয়ারিং বাংলাদেশ প্রকৌশল টেকনোলজিতে (বুয়েট) পড়ার সুযোগ পান তিনি।

পি কে হালদার ও তার ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার—দুজনই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে দুজনই ব্যবসায় প্রশাসনের আইবিএ থেকে এমবিএ করেন। পাশাপাশি চার্টার্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট (সিএফএ) সম্পন্ন করেন পি কে হালদার।

শিক্ষাজীবন শেষে পি কে হালদার যোগ দেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইআইডিএফসিতে। সেখানে ২০০৮ সাল পর্যন্ত উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন তিনি। সবার কাছে ‘ম্যানেজ মাস্টার’ হিসেবে পরিচিত পি কে হালদার মাত্র ১০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়েই ২০০৯ সালে রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি হয়ে যান। এরপর ২০১৫ সালের জুলাই এ, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি পদে যোগ দেন।

২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে কমপক্ষে চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) মালিকানায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসে। সেই চার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা এখন চরম খারাপ। একটি বিলুপ্তের পথে, বাকি তিনটিও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। এই প্রতিষ্ঠান চারটি হলো- ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড ও বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি)। 

পরবর্তীতে নানা কৌশলে এসব প্রতিষ্ঠান দখল করেন একজন ব্যক্তিই, পি কে হালদার। প্রতিষ্ঠান দখল করার জন্য নামে-বেনামে অসংখ্য কোম্পানি খুলেছেন, শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কিনেছেন, দখল করা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে টাকাও সরিয়েছেন। এমনকি দেশের বাইরেও কোম্পানি খুলেছেন।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা যায়, সব শেয়ার অন্যদের নামে হলেও ঘুরেফিরে আসল মালিক পি কে হালদারই। নিজেকে আড়ালে রাখতেই এমন কৌশল নেন তিনি। নিজের নামের সঙ্গে মিল রেখে পি কে হালদার গড়ে তুলেছেন একাধিক প্রতিষ্ঠান, যার বেশির ভাগই কাগুজে।

এর মধ্যে রয়েছে পিঅ্যান্ডএল ইন্টারন্যাশনাল, পিঅ্যান্ডএল অ্যাগ্রো, পিঅ্যান্ডএল ভেঞ্চার, পিঅ্যান্ডএল বিজনেস এন্টারপ্রাইজ, হাল ইন্টারন্যাশনাল, হাল ট্রাভেল, হাল ট্রিপ, হাল ক্যাপিটাল, হাল টেকনোলজি অন্যতম। এর বাইরে আনন কেমিক্যাল, নর্দান জুট, সুখাদা লিমিটেড, রেপটাইল ফার্মসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান।

জানা যায়, পি কে হালদারের মা লীলাবতী হালদার, ভাই প্রীতিশ কুমার হালদার ও তার স্ত্রী সুস্মিতা সাহাসহ মোট ১৩ জন ব্যক্তি তাকে অবৈধ সম্পদ অর্জনে সহযোগিতা করেন।

২০১৯ সালে, তার দখল করা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের টাকা ফেরত দিয়ে ব্যর্থ হতে শুরু করে। ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর, পি কে হালদার বেনাপোল দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। পরে বসবাস শুরু করেন কানাডা ও সিঙ্গাপুরে। এরপর আবার চলে আসেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে।

জানা যায়, ভারতে পি কে হালদার নিজেকে শিবশংকর হালদার পরিচয় দিতেন। দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে শিবশংকর পরিচয়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রেশন কার্ড, ভারতের ভোটার পরিচয়পত্র, আয়কর দপ্তরের পরিচয়পত্র, নাগরিকত্বের পরিচয়পত্র ইত্যাদি জোগাড় করেছিলেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পি কে হালদার ও তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে জমা হয় প্রায় ১৬০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবে ১২০০ কোটি টাকা, পি কে হালদারের হিসাবে ২৪০ কোটি টাকা এবং তার মা লীলাবতী হালদারের হিসাবে জমা হয় ১৬০ কোটি টাকা। তবে এসব হিসাবে এখন জমা আছে ১০ কোটি টাকার কম। অন্যদিকে পি কে হালদার এক ইন্টারন্যাশনাল লিজিং থেকেই ২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ বের করে নিয়েছেন। এ ছাড়াও তিনি নামে-বেনামে নানা আর্থিক প্রতিষ্ঠান খুলে হাজার কোটি টাকা লোপাট করে পালিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের একজন আইনজীবী জানান, পি কে হালদারের ৭০/৮০ জন গার্লফ্রেন্ডের সন্ধান পেয়েছে দুদক। এদের প্রত্যেকের অ্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা পাঠিয়েছেন তিনি। 

তবে আশার ব্যাপার হচ্ছে, কেলেঙ্কারি ঘটিয়ে দুই বছর আগে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া পি কে হালদার গত ১৪ মে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ধরা পড়েন। বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের তথ্যের ভিত্তিতে ভারতের গোয়েন্দারা তাকে সঙ্গীসহ ধরে ফেলেছে। জেরায় পি কে হালদার স্বীকার করেছেন তার বাংলাদেশে বিপুল সম্পদের কথা। এর মধ্যে সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে দুইশ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হোটেল, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বিঘার পর বিঘা জমি, ময়মনসিংহে চার একর জমি, ঢাকার পূর্বাচলে ষাট বিঘা জমি, ১১তলা একটি মার্কেট প্লাজা, রাঙ্গামাটিতে তিনশো কোটি টাকা ব্যয় করে নির্মিত রিসোর্ট, কয়েকটি ফ্ল্যাট যার মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। এছাড়া ব্যাংকে একশ কোটি টাকা থাকার কথা নাকি জেরায় জানিয়েছেন পি কে হালদার।

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চাকরিজীবনের শুরু থেকে প্রথমে একটি গ্রুপের হয়ে বেনামি ঋণ গ্রহণ ও অন্য প্রতিষ্ঠান দখল শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বেনামি ঋণ নিয়ে নিজের ও আত্মীয়দের নামে দখল শুরু করেন পি কে হালদার। এটাই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। আর আড়ালে রয়ে যায় মূল দুষ্কৃতকারী ও আসল পৃষ্ঠপোষকেরা।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে পি কে হালদারের ২৪টি বহুতল ভবনের কথা ভারতের মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়েছে। কানাডায় রযেছে বিপুল সম্পদ। ভারতে গোয়েন্দাদের জেরার মুখে বাংলাদেশে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদের কথা স্বীকার করেছে। সব মিলিয়ে সে মোট কত টাকা চুরি করেছে। আর কতো টাকা বিদেশে পাচার করেছে? এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button