সংবাদসাম্প্রতিক

শ্রীলঙ্কার নতুন প্রধানমন্ত্রী, কে এই রনিল বিক্রমাসিংহে!

অর্থনৈতিক সঙ্কট ঘিরে সহিংস বিক্ষোভে টালমাটাল শ্রীলঙ্কায় মাহিন্দা রাজাপাকসের পদত্যাগের পর দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এলেন রনিল বিক্রমাসিংহে; নিলেন শ্রীলঙ্কার ২৬তম প্রধানমন্ত্রিত্বের শপথ। গত ১২ মে, প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষে তাঁকে শপথ পড়িয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কখনোই পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন না করা বিক্রমাসিংহে এবার ষষ্ঠবারের মতো দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হলেন। এই পদে বিক্রমাসিংহের মেয়াদ ছয় মাস।

১৯৪৯ সালের ২৪ মার্চ, জন্ম নেন রনিল বিক্রমাসিংহে। সাবেক সমসমাজপন্থী এসমন্ড ও নলীনি বিক্রমাসিংহে দম্পতির দ্বিতীয় পুত্র তিনি। শিক্ষাজীবনে কলম্বোর রয়্যাল কলেজে অধ্যয়ন করেন তিনি। পরবর্তীতে সিলন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদে ভর্তি হন। স্নাতক ডিগ্রী লাভের পর শ্রীলঙ্কা ল কলেজ থেকে আইন পরীক্ষায় অংশ নেন রনিল। ১৯৭২ সালে, এডভোকেট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরেই শ্রীলঙ্কার একজন আইনপ্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন রনিল বিক্রমাসিংহে।

তবে সাবেক আইনজীবী রনিল বিক্রমাসিংহে একসময় সাংবাদিকও হতে চেয়ছিল। জানা যায়, ১৯৭৩ সালে সংবাদপত্রের পারিবারিক ব্যবসাকে জাতীয়করণ করা না হলে সম্ভবত তিনি সাংবাদিকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতেন।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্য অনেক নেতার মতোই রাজনৈতিক পরিবার থেকে এসেছেন রনিল বিক্রমাসিংহে। কলম্বো এলিট’ রনিলের বাবা বিশিষ্ট আইনজীবী এসমন্ড বিক্রমাসিংহে শ্রীলঙ্কার গণমাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। তার মায়ের দিকের আত্মীয় জুনিয়াস রিচার্ড জয়াবর্ধনেকে এখন পর্যন্ত দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ধরা হয়।

সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে রাজনীতিতে আসেন তিনি। যোগদেন শ্রীলঙ্কার পুরনো রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি বা ইউএনপিতে। রনিল বর্তমানে এই সংগঠনটির চেয়ারম্যান। এরপর ১৯৭৭ সালে, প্রথমবারের মতো দেশটির সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। সে সময় প্রেসিডেন্ট ছিলেন জুনিস জয়াবর্ধনে। মাত্র ২৮ বছর বয়সে ওই সরকারেরই সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী হন তিনি।

৭৩ বছর বয়সী এই ইউএনপি নেতার জীবনের ৪৫ বছরই পার্লামেন্টে পদচারণা। তার ব্যাপক আন্তর্জাতিক সংযোগ আছে এবং তাকে একজন দক্ষ আলোচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঝানু রাজনীতিক হিসেবে তার যেমন পরিচিতি, তেমনি পশ্চিমাদের কাছেও তার রয়েছে কদর, আবার প্রতিবেশী প্রভাবশালী দেশ ভারতের সঙ্গেও তার ব্যাপক সুসম্পর্ক।

জয়াবর্ধেনে ও প্রেমাদাসা সরকারের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ছিলেন ব্যারিস্টার রনিল। প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমদাসা খুন হওয়ার পর ১৯৯৩ সালের ১ মে, প্রথম শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পান রনিল। সেবার মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময় ক্ষমতায় ছিলেন তিনি। এরপর ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল, ২০১৫ থেকে ২০১৫ (১০০ দিন), ২০১৫ থেকে ২০১৮ এবং ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি লঙ্কান প্রধানমন্ত্রীর পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, এর আগে পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী হলেও কোনোবারই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি রনিল বিক্রমাসিংহে। চলতি সপ্তাহ শুরু হওয়ার আগেও মনে করা হচ্ছিল, ৭৩ বছর বয়সী এই রাজনীতিবিদের ক্যারিয়ার শেষ পর্যায়ে। তবে এর পরেই তিনি একটি ঐকমত্যের প্রশাসন পরিচালনা করতে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপদেশটিকে পঙ্গু অর্থনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সাহায্য করতে সম্মত হন। যদিও রনিল বিক্রমাসিংহে গত দুটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়াই করে হেরে যাওয়ায় এবং দলকে টানা পরাজয় উপহার দেওয়ায় খোদ সমর্থকেরাও তাঁকে ‘রেকর্ড লুজার’ বলে আখ্যা দিয়েছিলো।

তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ষষ্ঠবারের মতো রনিলের শপথ নেওয়াকে ‘ঐতিহাসিক ঘটনা’ বলে অভিহিত করেছেন তামিল আইনপ্রণেতা ধর্মলিঙ্গম সিথাধান। তিনি বলেন, ‘এটা প্রমাণ করে কতটা মরিয়া পরিস্থিতিতে আমাদের দেশ রয়েছে।’

রনিল বিক্রমাসিংহকে পশ্চিমাপন্থী বাজার সংস্কারবাদী হিসেবে মনে করা হয়। অর্থনৈতিক সংকটে ডুবতে বসা শ্রীলঙ্কাকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সহায়তা (বেল আউট তহবিল) এনে দিতে সম্ভাব্য আলোচক হিসেবেও মনে করা হচ্ছিল।

তবে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা জানায়, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে থেকেই আর্থিক ও মুদ্রানীতিতে পরিবর্তন আনতে দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছিলেন বিক্রমাসিংহে।

ইউএনপির জাতীয় সংগঠক সাগালা রত্নায়াকা বলেন, ‘যখন অন্য কোনো সংসদ সদস্য প্রধানমন্ত্রী হতে রাজি হননি, তখন রনিল এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। শ্রীলঙ্কায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য এটি একটি ভয়ংকর সময়। তাঁর জন্য সবচেয়ে কঠিন সময় আসছে।’

পাঁচ হাজার কোটি ডলার বৈদেশিক ঋণের দায়ে ঋণখেলাপি একটি দেশের দায়িত্ব নিলেন রনিল বিক্রমাসিংহে। দেশটির অবস্থা এতটাই খারাপ যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির মতো অর্থও নেই। যদিও অর্থনীতি সংস্কারে তাঁর সুনাম আছে। তবে এবার তিনি নিজেই সতর্ক করে বলেছেন যে, নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকট দ্রুত সমাধান হবে না। তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে পড়া দেশটিকে কতটুকু এগিয়ে নিতে পারবেন তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। গত সপ্তাহে তিনি নিজেই পার্লামেন্টে বলেন, ‘সবচেয়ে খারাপ অবস্থা আসতে এখনো বাকি।’

উল্লেখ্য, করোনার ধাক্কার পাশাপাশি সরকারের কিছু ভুল সিদ্ধান্তে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক দুর্দশার মুখে পড়ে শ্রীলঙ্কা। কয়েক মাস ধরে খাবার, জ্বালানি ও ওষুধের তীব্র সংকটে পড়েছে দেশটি। ব্যাপকভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, চলছে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট। ঋণের চাপ আর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশটিতে একমাসেরও বেশি সময় ধরে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে। গত সোমবার সরকার সমর্থকদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ এবং দেশজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন মাহিন্দা রাজাপক্ষে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button