আন্তর্জাতিকপ্রযুক্তি

রাশিয়ান হ্যাকারঃ ত্রাসের রাজত্বে বিচরন করছে যারা!

হ্যাকার! বহুল পরিচিত একটা শব্দ। কম্পিউটার সৃষ্টি থেকেই হ্যাকারদের জন্ম। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাপিয়ে রেড়াচ্ছে হ্যাকাররা। বিশ্বের বড় বড় কম্পিউটার বিজ্ঞানীরাও নাজেহাল হয়েছেন এসব প্রতিভাবান হ্যাকারদের কাছে। তবে হ্যাকিং কিংবা হ্যাকার, প্রসঙ্গ যাই হোক। সবার আগে আসে রাশিয়ার নাম। কারণ, পৃথিবীতে যে দেশগুলো হ্যাকারদের পেছনে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে তাদের মধ্যে সবার উপরে থাকবে রাশিয়ার নাম। 

রাশিয়ার হ্যাকারদের নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় ‘ভ্লাদিমির লেভিন’ এর নাম। এই রাশিয়ান হ্যাকার ১৯৯৫ সালে সিটি ব্যাংকের কম্পিউটার হ্যাক করে ১০ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নেন। ২০০২ সালে, নিউ ইয়র্ক টাইমস এর অভ্যন্তরীন কম্পিউটার ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নেন তিনি। 

এছাড়াও ২০১৬ সালে, টেনিস সুপরাস্টার রাফায়েল নাদাল ও মো ফারাহকে ফাঁসিয়ে দিয়েছিল রাশিয়ান হ্যাকাররা। গোটা বিশ্বে প্রচার করে দিয়েছিল নিষিদ্ধ ড্রাগ নিয়েছেন এই দুজন। আর সেটার অনুমতি দিয়েছে খোদ বিশ্ব ডোপবিরোধী সংস্থা (ওয়াডা)! ওয়াডার ডেটাবেস থেকেই নাকি এই প্রমাণ পাওয়া গেছে! গোপনীয় এই তথ্যগুলো ফাঁস করেছিল রাশিয়ার হ্যাকার গ্রুপ ‘ফ্যান্সি বিয়ারস’।

এখন যদি বলি, রাশিয়ার হ্যাকার দের খোদ আমেরিকা ও সমীহ করে চলে? অবিশ্বাস্য লাগছে? 

আসুন একটা নমুনা দেখে আসি। ২০২১ সালের জুন মাসে, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার রাশিয়ান প্রতিপক্ষ ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে কয়েকটি মূল নীতি নির্ধারণের চেষ্টা করেন। সেখানে তিনি বলেন, “গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানগুলো যেন সহিংসতার বাইরে রাখা হয়”। অর্থাৎ সম্পর্কের যত অবনতিই হোক না কেন, এক দেশের হ্যাকাররা যেনো অন্য দেশের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক, শেয়ার বাজার বা হেলথ সিস্টেম এর মত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় হানা না দেয়।

সেইসাথে রাশিয়া যদি এই “নীতি লঙ্ঘন” করে তবে আমেরিকাও প্রতিশোধ নেবে বলে সতর্ক করতে ভুলেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

এছাড়াও, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অভিযোগ করছে, দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রচারণার সময়ে ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটির তথ্য চুরি করে রাশিয়ার হ্যাকারদের একটি দল।

চলতি বছরে, রাশিয়া-ইউক্রেন সামরিক যুদ্ধের মাঝেও একবিংশ শতকের নয়া অস্ত্র দিয়েই আঘাত করে রাশিয়া। অর্থাৎ সাইবার যুদ্ধ। ইউক্রেনিয় সংস্থাগুলির সিস্টেম হ্যাকারদের দখলে চলে গিয়েছে। ইউক্রেন সরকারের তরফে বলা হয়েছিলো, রাশিয়া-সমর্থিত হ্যাকাররা ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি সরকারি ওয়েবসাইট এবং ব্যাঙ্ক ও হ্যাক করে ফেলেছে।

সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, একাধিক দেশে গুপ্তচরবৃত্তি চালানোর জন্য ইরানিয়ান একটি হ্যাকার গ্রুপের পরিচয় ব্যবহার করেছে রাশিয়ার একটি হ্যাকার গ্রুপ। রাশিয়াভিত্তিক হ্যাকার গ্রুপ ‘তুরলা’ সমঝোতার মাধ্যমেই ইরানিয় হ্যাকার গ্রুপের ”অয়েলরিগ’ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। তারা কাজ করছিল রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এফএসবির পক্ষে।

ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিএইচকিউ’র তথ্য মতে, তুরলা ১৮ মাসে কমপক্ষে ৩৫টি দেশে ও প্রতিষ্ঠানে সাইবার হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ২০টি হামলায় তারা সফল হয়েছে। আর এই ২০টি হামালার মধ্যে আমেরিকা, এস্তোনিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, মধ্যপ্রাচ্য এবং ব্রিটেনের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

এখন প্রশ্ন! রাশিয়া কিভাবে এসব হ্যাকারদের নিয়োগ দিচ্ছে! 

রাশিয়ার ৩৩ বছর বয়সী কম্পিউটার প্রোগ্রামার আলেকসান্দার বি ভিয়ারিয়া। তিনি মনে করতেন, সাইবার হামলা থেকে মানুষকে রক্ষা করাই ছিল তার কাজ। তবে তার এ ধারণার পরিবর্তন হয়, যখন সরকার তাকে এর উল্টো কাজ, অর্থাৎ সাইবার হামলা চালানোর কাজ করার অনুরোধ করে। মেধাবী এই কম্পিউটার প্রোগ্রামার জানান, রাশিয়ার সামরিক বাহিনীতে হঠাৎ তাকে গত বছর যোগ দিতে বলা হয়। ওই অনুরোধের জবাবে সামরিক প্রতিষ্ঠানের একজন নির্বাহীকে তিনি এটা পারবেন না বলে জানিয়ে দেন। ভিয়ারিয়ার কাছে নীতিবিরোধী ও অবৈধ মনে হওয়ায় তিনি ওই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তবে এর ফল কী হতে পারে, সে ব্যাপারে তিনি দুশ্চিন্তায় ছিলেন। তাই তিনি ফিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে পালিয়ে ওই দেশটিতে চলে যান।

নতুন মতবাদ অনুযায়ী, দেশটির সেনাবাহিনীর জেনারেলরা যুদ্ধকে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করেছেন। তাদের মতে, গোলাবারুদের প্রতিযোগিতার চেয়ে যুদ্ধ আরও বেশি কিছু। ক্রেমলিনের স্বার্থে তারা সাইবার যুদ্ধকে একটি কেন্দ্রীয় নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। রাশিয়ার এই সাইবার যুদ্ধ কর্মসূচির বেশির ভাগই গোপনীয়তায় ঢাকা। তবে ভিয়ারিয়ার ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, ক্রেমলিন কম্পিউটার হ্যাকারদের নিয়ে একটি অত্যাধুনিক দল গড়ে তুলতে চাইছে।

২০১৩ সালে, রাশিয়ায় হ্যাকার নিয়োগপ্রক্রিয়া গতি লাভ করে। ওই বছর ই-মেইল ব্যবহারকারীদের স্প্যাম পাঠাতে একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরির অভিযোগে দিমিত্রি এ আরতিমোভিচ নামের একজন পদার্থবিদ মস্কোর কারাগারে বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন। কারাগারে আরতিমোভিচের সঙ্গে একই কক্ষে ছিলেন আরেক ব্যক্তি। একই কক্ষে থাকার সুবাদে তিনি কিছু খবর পান। তিনি জানান, সাইবার অপরাধে যাদের আটক করা হয়, বিচারের আগেই সরকারের পক্ষে কাজ করার বিনিময়ে তাদের মুক্তি দেওয়া হয়।

২০১৩ সালের শুরুর দিকে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সার্জি কে শোইগু মস্কোতে এক বৈঠকে বলেছিলেন, তিনি প্রোগ্রামারদের খুঁজছেন। তাই শুধু নির্জন বাংকারে কর্মরত সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর না করে রাশিয়া সরকারের নিয়োগকারীরা বিপুলসংখ্যক কম্পিউটার প্রোগ্রামারের সন্ধান করছে। কলেজের ছাত্র ও পেশাদার প্রোগ্রামারদের চাকরির প্রস্তাব দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপনও দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সাইবার অপরাধ জগতের সম্ভাব্য প্রতিভার খোঁজেও প্রকাশ্যে তৎপরতা চলছে। দেশজুড়ে সামরিক ঘাঁটিতে স্থাপন করা সায়েন্স স্কোয়াড্রনস নামের নতুন গঠন করা ইউনিটে নতুন প্রতিভাদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

উইকিলিকসে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে “অ্যাডভান্সড মনিটরিং” নামের রাশিয়ার একটি কোম্পানি “হ্যাকিং টিম” নামের ইতালিয়ান একটি কোম্পানির কাছ থেকে আইফোন হ্যাকিংয়ের সফটওয়্যার কেনে। এফএসবির সঙ্গে কাজ করার লাইসেন্স রয়েছে ওই অ্যাডভান্সড মনিটরিংয়ের।

যুক্তরাষ্ট্রের সেবাদানকারী কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট হ্যাকিং, বিশ্বের সবচেয়ে বড় মাংস প্রক্রিয়াজাতকরন কোম্পানি ‘জেবিএস’ এর ওয়েবসাইট হ্যাকিং, মার্কিন এনজিও তে সাইবার হামলা ছাড়াও হাজার হাজার ক্ষেত্রে সাইবার আক্রমণ চালিয়ে রীতিমতো ত্রাসে পরিনত হয়েছে রাশিয়ান হ্যাকাররা। তাই শুধু আমেরিকা নয়, রাশিয়ান হ্যাকারদের তান্ডবের কাছে পুরো পৃথিবীই এখন অসহায়।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button