জীবনীসাম্প্রতিক

পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী, কে এই শেহবাজ শরীফ!

পাকিস্তানের ২৩ তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন পিএমএল-এন নেতা শেহবাজ শরীফ৷ সম্প্রতিই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। তবে আগে থেকেই দেশের ভেতরে প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য তার সুনাম ছিল।

কিন্তু কে এই শেহবাজ শরীফ? 

১৯৫১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর, পাকিস্তানের পাঞ্জাব রাজ্যের লাহোরে জন্মগ্রহণ করেন শেহবাজ শরীফ৷ তার পুরো নাম মিয়া মোহাম্মদ শেহবাজ শরিফ। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাওয়াজ শরিফের ছোট ভাই। তার বাবার নাম মিয়া মোহাম্মদ শরীফ৷ যিনি পেশায় একজন ঊর্ধ্বতন মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি ছিলেন। যার পরিবার কাশ্মীরে ব্যবসায় করতেন এবং শেষ পর্যন্ত বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পাঞ্জাবের অমৃতসর জেলার যাতি উমরা গ্রামে বসবাস করতেন। জিন্নাহর নেতৃত্বে আন্দোলন এবং ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পর, তার পিতা-মাতা অমৃতসর থেকে লাহোরে চলে আসেন।

ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের জন্ম নেওয়া শেহবাজ পড়াশোনা করেন পাকিস্তানেই। লাহোর সরকারী কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। স্নাতক শেষ করে নিজেও পারিবারিক প্রতিষ্ঠান ‘ইত্তেফাক’ গ্রুপে যোগদান করেন। যেটি একটি মাল্টি মিলিয়ন-ডলারের পিন্ডীভূত লৌহ কোম্পানি।

পরবর্তীতে ১৯৮৫ সালে, লাহোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হন শেহবাজ। জানা গেছে, বর্তমানে পাকিস্তানের একটি ইস্পাত কারখানায় যৌথ মালিকানা রয়েছে তার।

পাকিস্তানের ২৩ তম প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের রাজনৈতিক দলের নাম ‘পাকিস্তান মুসলিম লীগ’। বড়ভাই নওয়াজ দেশ ছাড়ার পর পাকিস্তান মুসলিম লিগের প্রেসিডেন্টের আসনে বসেন শেহবাজ। তখন থেকেই ভাইঝি মরিয়াম শরিফকে নিয়ে দল সামলান তিনি। তিনবার পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর পদে ছিলেন তিনি। ২০১৮ সালে, তিনি ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য হন।

১৯৮৮ সালে, পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ব্যবসায়ী শাহবাজ৷ ১৯৯০ সালে জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৯৩ সালে, তিনি আবার পাঞ্জাব অধিবেশনে নির্বাচিত হন এবং বিরোধীদলীয় নেতা হন। সে হিসেবে সাফল্যের পথে হাটেন। ১৯৯৭ সালে, তৃতীয়বারের মত নির্বাচন করে প্রথমবেরে মত পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তিনি।৷ সেই বছরেই লিডার অব দ্য হাউজ নির্বাচিত হন। তিনি তখন কঠোর প্রশাসক হিসেবে সবার নিকট পরিচিত ছিলেন। পাঞ্জাব প্রদেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পরিবেশ উন্নয়নেও ব্যাপক ভূমিকা রাখেন শেহবাজ।

১৯৯৯ সালের অক্টোবরে, পাকিস্তানের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফ পিএমএল-এন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে৷ সেই সময় শেহবাজ শরীফও গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে ২০০০ সালের ডিসেম্বরে, পরিবারসহ সৌদি আরবে নির্বাসিত হন তিনি৷ জেদ্দাহ ও লন্ডনে থাকাকালে বেশ কয়েক বছর রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় ছিলেন শেহবাজ।

২০০৭ সাালের ২৫ নভেম্বর, ভাই নওয়াজ শরীফের সঙ্গে পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তন করেন শেহবাজ। এরপর থেকে রাজনীতির প্রাঙ্গনে সক্রিয় হন তিনি।

২০০৮-২০১৩ এবং ২০১৩-২০১৮ মেয়াদে টানা দুইবার পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন শেহবাজ শরীফ।

২০০৮ সালে, দ্বিতীয়বারের মত পাঞ্জাবের ২১তম মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হলে প্রদেশের উন্নয়নে বেশ কিছু অবকাঠামোগত প্রকল্প নেন শেহবাজ৷ তার সামাজিক প্রকল্প ‘সস্তা তন্দুর’ এবং ‘আশিয়ানা ঘর’ ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়৷ দুর্নীতি দমনেও তার অবস্থান ছিলো প্রশংসনীয়৷

২০১৩ সালে, তৃতীয় দফা পাঞ্জাব মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পান শেহবাজ। ২০১৮ সালে, পিএমএল-এন পরাজিত হলে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে৷ এসময় তিনি জাতীয় পরিষদের বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হন৷ ২০১৯ সালে, অর্থ পাচারের অভিযোগে পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টেবিলিটি ব্যুরো তার ও তার সন্তানের নামে থাকা ২৩ সম্পত্তি জব্দ করলে বিপাকে পড়েন শাহবাজ৷ ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে, গ্রেপ্তার হলেও ২০২১ সালের এপ্রিলে, জামিন পেয়ে যান শেহবাজ৷

চলতি বছরের মার্চে জাতীয় পরিষদে ইমরান খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনে বিরোধী দলগুলো৷ নানা নাটকীয়তার পর ইমরান খান সেই অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হন৷ প্রধানমন্ত্রীত্বের দুয়ার খোলে শেহবাজের জন্য৷ বিদেশ নীতির ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকটসহ যেসব কারণে ইমরান ক্ষমতা হারিয়েছেন, সেগুলো সামাল দেয়াই এখন পাকিস্তানের ২৩তম প্রধানমন্ত্রীর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ৷

শেহবাজ শরীফ জানান, তারা প্রত্যেককে তাদের ত্যাগের জন্য ধন্যবাদ জানাইয় এখন সংবিধান ও আইনের ভিত্তিতে একটি নতুন পাকিস্তান অস্তিত্বে আসতে চলেছে। এই জোট দেশকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সেইসাথে পাকিস্তানে দ্বিতীয়বারের মতো এক পরিবার থেকে দুই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঘটনা ঘটলো। প্রসঙ্গত ১৯৯০ সালে এবং ১৯৯৭ সালে দুই দফা প্রধানমন্ত্রীত্বের দায়িত্ব পেয়েছিলেন শেহবাজ শরীফের ভাই নওয়াজ শরীফ৷ এর আগে ১৯৭৩ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং তারপর ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন তার মেয়ে বেনজির ভুট্টো৷ ১৯৯৩ সালে দ্বিতীয়বারের জন্যেও নির্বাচিত হয়েছিলেন আতাতায়ীর হামলায় নিহত বেনজির৷

ব্যাক্তিগত জীবনে শেহবাজ শরীফ মোট পাঁচ বিয়ে করেন। ১৯৭৩ সালে, প্রথমবারের মত তার চাচাত-বোন নুসরাত শেহবাজ এর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। ১৯৯৩ সালে, আলিয়া হানি কে বিয়ে করেন তিনি। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে, ‘মাই ফিউডাল লর্ড’ এর লেখিকা তাহমিনা দুরানিকে বিবাহ করেন তিনি। এছাড়াও আরো ২ বারের জন্যে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। শাহবাজ শরীফ মোট ৫ সন্তানের জনক।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button