ইতিহাস

‘অ্যালগরিদম’ এর আদ্যোপান্ত

‘অ্যালগরিদম’ শব্দ টার সাথে আমরা সকলেই কমবেশি পরিচিত। ‘অ্যালগরিদম’ মূলত গণিত এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানে কোনো নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার জন্য সসীম সংখ্যক অনুক্রমিক নির্দেশের সেট বা গুচ্ছ কে বুঝায়।

অ্যালগরিদমের সংজ্ঞায় বলা যায় ‘ধাপে ধাপে অথবা ক্রমে ক্রমে সমস্যা সমাধানের বিশেষ পদ্ধতি,’ অর্থাৎ কোনো একটি সমস্যাকে বেশ কয়েকটি ধাপে ভেঙ্গে দিয়ে প্রত্যেকটি ধাপ পরপর সমাধান করে সমস্যার একটি সামগ্রিক সমাধান বের করা। অর্থাৎ অ্যালগরিদম হচ্ছে, যে কোনোও কাজকে সম্পন্ন করার জন্য বেশ কত গুলি সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক ধাপের সমষ্টি বিশেষ, যেখানে সেইসব ধাপের সংখ্যা অবশ্যই সীমিত ও সসীম হতে হবে।

এটা হতে পারে কোনো সাধারণ প্রক্রিয়া। যেমন ধরা যাক, কেউ কয়েকটি সংখ্যা যোগ করে সেই যোগফলকে একটি নির্দিষ্ট নাম দিতে চাচ্ছে। পুরো কাজটি সম্পন্ন করার জন্য অবশ্যই কিছু ধাপ অনুসরণ করতে হবে, এই ধাপগুলোকেই একসাথে করলে একটা গুচ্ছ বা সেট তৈরি হচ্ছে, যেটাকে বলা হয় অ্যালগরিদম।

কিন্তু এই ‘অ্যালগরিদম’ বিষয় টির উৎপত্তির ইতিহাস অনেকেরই অজানা। 

‘ অ্যালগরিদম শব্দটি এসেছে ৯ম শতাব্দীর বিখ্যাত মুসলিম বিজ্ঞানী ‘মুহাম্মাদ মুসা আল – খাওয়ারিজমী’ এর নাম থেকে। মুহাম্মদ ইবন মুসা আল – খাওয়ারিজমি বৃহত্তর খোরাসানের খাওয়ারেজম অঞ্চলে ৭৮০ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে প্রখ্যাত গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ভূগোলবিদও ছিলেন। আল – খাওয়ারিজমি ভারতীয় দশভিত্তিক সংখ্যাপদ্ধতি নিয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। যেটি ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করা হয়। যার নামকরণ করা হয় ‘ অ্যালগরিতমি দে নিউমেরো ইনডোরাম’। সেই গ্রন্থে মূল রচয়িতার জায়গায় ‘আল-খাওয়ারিজমি’ নামটি যখন ল্যাটিনে রূপান্তর করা হয়, তখন এটি হয়ে যায় ‘অ্যালগরিতমি’।

মূল বই লেখার প্রায় ৩০০ বছর পর এই অনুবাদটি করা হয়েছিল। এই বইটিই প্রথম দশভিত্তিক সংখ্যা ও এর বৈশিষ্টসমূহ ইউরোপে পরিচিত করে তোলে। এর ফলে জটিল রোমান সংখ্যার পরিবর্তে ইউরোপে এবং ক্রমে সারাবিশ্বে দশভিত্তিক সংখ্যাপদ্ধতি প্রচলিত হয়। আল খাওয়ারিজমের উক্ত গ্রন্থ ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ হলে ইউরোপীয়রা জটিল রোমান সংখ্যার পরিবর্তে ইউরোপে এবং ক্রমে সারা পৃথিবীতে এক থেকে দশ সংখ্যার পদ্ধতি প্রচলিত হয়। আল খাওয়ারিজমির নামানুসারে এই সংখ্যাপদ্ধতিটির নামকরণ করা হয় ‘অ্যালগরিসমাস’, যার ইংরেজি নাম হল ‘অ্যালগরিসম’।

‘অ্যালগরিসম’ শব্দটি ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করে ত্রয়োদশ শতকে। তৎকালিন বহু উল্লেখযোগ্য ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবি ও সাহিত্যিক উক্ত শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। ১৫ শতকে এই ‘অ্যালগরিসম’ শব্দের প্রভাবে ল্যাটিন ‘অ্যালগরিসমাস’ হয়ে যায় ‘অ্যালগরিদমাস’। তখন ইংরেজি শব্দটিও পরিবর্তিত হয়ে ‘অ্যালগরিদম’ হয়ে যায়।

উনবিংশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত ‘অ্যালগরিদম’ শব্দের অর্থ ছিল এক থেকে দশ সংখ্যা পদ্ধতি। ল্যাটিন শব্দ ‘অ্যালগরিদমাস’ এর অর্থও ছিল এক থেকে দশ সংখ্যা পদ্ধতি। বিংশ শতকের শুরুর দিকে এর অর্থ পরিবর্তন হয়ে বর্তমান প্রচলিত অর্থটি আসে। এ সময় টুরিং মেশিনস এর আবিষ্কারক ‘অ্যালান টুরিং’ একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন। যা অ্যালগরিদম অনুসরণ করে জটিল সমস্যা সমাধান করতে পারে। বাস্তবে এটিই ছিল আধুনিক কম্পিউটার যুগের সূচনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি আর একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেন যা অ্যালগরিদম অনুসরণ করে জার্মানদের এনক্রিপ্ট করা কোড (এনিগমা কোড) ক্র্যাক করতে পারত।

যদিও অ্যালগরিদম শব্দটির উৎপত্তি মোটামুটি ৯০০ বছর আগে, বাস্তবে অ্যালগরিদম কিন্তু আরো অনেক পুরোনো। উল্লেখযোগ্য ও বহুল ব্যবহৃত প্রাচীন অ্যালগরিদমের একটি হলো ইউক্লিডের গসাগু নির্ণয়ের অ্যালগরিদম। এই অ্যালগরিদমটি তাঁর এলিমেন্টস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে। বইটির রচনাকাল ৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। ইউক্লিডের এই অ্যালগরিদমের বিভিন্ন তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রয়োগ রয়েছে।

মানুষ হিসেবে আমরা সবাই বৈচিত্র্যের অধিকারী। সব মানুষের পছন্দ, অপছন্দ আলাদা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর অ্যালগরিদম সবার পছন্দ, অপছন্দ প্রায় নিখুঁতভাবে ঠিক করতে পারছে।

আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে আমরা যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করি যেমন: আমাদের ফোন, টেলিভিশন, কম্পিউটার, স্মার্টওয়াচ, অতি প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট এগুলোর সবই চলে অ্যালগরিদম দিয়ে। এছাড়াও সোশাল মিডিয়ার গুগল, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব প্রভৃতিতে রয়েছে অনেক জটিল জটিল সব অ্যালগরিদম। অ্যালগরিদমের আরেকটি পরিচিত ও সহজ উদাহরণ হচ্ছে, অনলাইন কেনাকাটার ওয়েবসাইটগুলো। বিভিন্ন আকর্ষণীয় পণ্যের যে রেকমেন্ডেশন দেখি সেগুলো সবই অ্যালগরিদমের কারণে হয়ে থাকে।

অপরদিকে ফেসবুকে বিভিন্ন পেইজ, গ্রুপ বা বিভিন্ন ব্যক্তির আইডির যে রেকমেন্ডেশন আমরা পেয়ে থাকি সেগুলোও অ্যালগরিদমের জন্যই হয়ে থাকে। 

এছাড়াও এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার দিকনির্দেশনার জন্যে আমরা যে গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে থাকি সেটাও অ্যালগরিদমের কারণেই হয়ে থাকে।

গনিতের শাখা ‘আলজেবরা’র আবিস্কারক ও ছিলেন আল – খাওয়ারিজমী। আলজেবরা একটি আরবী শব্দ। তাঁর লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-কিতাব আল- মুখতাসার ফি হিসাব আল যাবর ওয়াল-মুকাবালা’ এর মধ্যে আলজেবরা সম্পর্কে সর্বপ্রথম ধারণা দেন তিনি।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button