আন্তর্জাতিক

দক্ষিন কোরিয়ান উদ্যোক্তা কিহাক সাং এবং একটুকরো কেইপিজেড

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থিত কেইপিজেড, বাংলাদেশের বৃহত্তম বেসরকারি ইপিজেড। ২৫ কিলোমিটার রাস্তার নেটওয়ার্ক সংবলিত ২ হাজার ৫০০ একরেরও বেশি জমিজুড়ে বিস্তৃত কেইপিজেডের ভূমির অর্ধেকেরও বেশি জুড়ে আছে বন ও জলাধার। একটি শিল্পাঞ্চল কেমন হওয়া উচিত, তারই অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কেইপিজেড।

কিন্তু যে মানুষটি তার কোম্পানি ইয়াংওয়ান ও কেইপিজেডের মাধ্যমে বাংলাদেশে ৬০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছেন এবং শীঘ্রই এই অঙ্ক ১ বিলিয়ন ডলার ছোঁবে বলে আশা করছেন, তার যাত্রার শুরুটা ছিল খুবই সাদামাটা।

তার নাম কিহাক সাং। যাকে এশিয়ার পোশাক মোগল বলে আখ্যায়িত করা হয়। জন্মসূত্রে তিনি একজন কোরিয়ান নাগরিক।

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রথা অনুযায়ী কোরিয়ান সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে ১৮ মাসের প্রশিক্ষণ নেওয়া শেষেই সাং ভাবছিলেন নিজের জীবিকা নিয়ে। হাই স্ট্রিটের দোকানে সাজিয়ে রাখা হরেক রকমের পোশাক দেখে কিহাক যারপরনাই মুগ্ধ হতেন। তাই ২৫ বছর বয়সে তিনি একটি পোশাক কোম্পানিতে সেলস এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগ দেন। অচিরেই তিনি সুইডিশ ব্যবসায় বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। সেইসাথে আমেরিকানদের গ্রাহকদের সঙ্গেও নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।

১৯৭৪ সালে, দুই অংশীদারকে নিয়ে ইয়াংওয়ান কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন কিহাক সাং। পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানির জন্য সিউল শহরে ইয়াংওয়ানের প্রথম কারখানা স্থাপন করা হয়। তবে তার সেলসম্যান হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা শুধু কোরিয়াভিত্তিক ইয়াংওয়ান উদ্যোগেই নয়, বাংলাদেশেও কাজে এসেছে।

১৯৭৯ সালে, চট্টগ্রামে পোশাক কারখানা স্থাপন করতে পারেন কি না দেখার জন্য আসেন তরুণ উদ্যোক্তা কিহাক সাং। ওই সময় জায়গাটিকে তেমন সম্ভাবনাময় মনে হয়নি। বাংলাদেশে তখন শতভাগ বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি ছিল না। তাছাড়া অবকাঠামোগত সহায়তার অবস্থাও ছিল ভীষণ খারাপ। কিন্তু ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশে কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে বলে, এদেশে এসেছিলেন কিহাক। কোরিয়া ওই সময় উন্নত বিশ্বে কোটামুক্ত সুবিধা পেত না। তাই নানা ত্রুটিবিচ্যুতি সত্ত্বেও বাংলাদেশকে বেছে নেন কিহাক সাং।

১৯৮০ সালের মে মাসে, বাংলাদেশি অংশীদারদের নিয়ে ইয়াংওয়ান বাংলাদেশ লিমিটেড নামে নিজের কারখানা স্থাপন করেন কিহাক। ওই কারখানায় শ্রমিক ছিল প্রায় ২৫০ জন। তাদের সবাইকে অভিজ্ঞ কোরিয়ান অপারেটরদের দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ানো হয়। ১৯৮৪ সাল নাগাদ কিহাকের কোম্পানি ১৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের পোশাক রপ্তানি করে।

বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কিহাক সাংয়ের ইয়াংওয়ান কর্পোরেশনে প্রায় ৮৫ হাজার লোক কর্মরত। তাদের ৭০ হাজার কাজ করেন বাংলাদেশে। সিউল স্টক মার্কেটে তালিকাভুক্ত ইয়াংওয়ানের বার্ষিক টার্নওভার ৩ বিলিয়ন ডলার। এই আয়ের এক-তৃতীয়াংশ আসে বাংলাদেশ থেকে। এখন ভিয়েতনাম, উজবেকিস্তান, এল সালভাদর ও ইথিওপিয়াতে কারখানা আছে কিহাকের কোম্পানির।

তবে তার সবচেয়ে বড় অর্জন আনোয়ারার কেইপিজেড। প্রতি বছর নতুন নতুন শিল্প কমপ্লেক্স যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে যা এখনও সমৃদ্ধ হচ্ছে।

কোরিয়ান রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (কেইপিজেড) এর শুরুটা ছিলো আকস্মিক ভাবেই। ১৯৯১ সালের এপ্রিলে এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে চট্টগ্রামে। উপকূলীয় অঞ্চলকে দুমড়েমুচড়ে দেয় সেই ঘূর্ণিঝড়। তখন কিহাকের প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হলেও, দ্রুতই সামল নেন তিনি। কিন্তু তার বিশাল ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি সামলানোর সক্ষমতা ছিল না ইপিজেডের। ইয়াংওয়ানের প্রবৃদ্ধির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারছিল না প্রশাসন। তখন কিহাক ভাবছিলেন, তাদের নিজস্ব ইপিজেড থাকা দরকার। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে, ইপিজেড স্থাপনের উদ্যোগ নেন সাং। ১৯৯৬ সালে, ইপিজেডটি অনুমোদন লাভ করে। 

কিহাক সাং জানান, কেইপিজেড প্রতিষ্ঠার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৯ সালের ৩ আগস্ট কোরিয়া সরকারের মনোনীত প্রতিষ্ঠান ইয়াংওয়ান করপোরেশনকে ২৪৯২.৩৫ একর জমির দখল বুঝিয়ে দেয়। একই বছর ৭ অক্টোবর কেইপিজেড জোনের গেজেট প্রকাশ করা হয়। কিন্তু কর্ণফুলী নদীতীরের ওই প্রকল্প উন্নয়নের জন্য পরিবেশ ছাড়পত্র মেলে ২০০৯ সালের ২৩ নভেম্বর। আর ২০১১ সালের ২ অক্টোবর, প্রথম কারখানার অনুমোদন দেওয়া হয়।

কেইপিজেডে ইতিমধ্যে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, কৃত্রিম ফাইবার, জুতা, ব্যাগ ও অন্যান্য জিনিস উৎপাদনের ৪০টি অত্যাধুনিক সবুজ কারখানা রয়েছে। এছাড়া, আরও ৩৫টি কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এখানে ৩০ হাজার কর্মী কর্মরত। যাদের সিংহভাগই আনোয়ারা ও তৎসংলগ্ন এলাকার নারী। অন্যান্য ইপিজেডেও ইয়াংওয়ানের কিছু কারখানা রয়েছে। 

চত্বরে বা রাস্তায় ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকা যেকোনো শিল্পাঞ্চলের অতিপরিচিত দৃশ্য। কিন্তু সেই পরিচিত দৃশ্যই দেখা যাবে না কেইপিজেডের কোথাও। অপরিচ্ছন্নতা ও দূষণ ভীষণ অপছন্দ কিহাক সাংয়ের। তার এই মনোভাবের ছাপ ফুটে রয়েছে কেইপিজেডের কারখানা ও কম্পাউন্ডের সর্বত্র। 

কেইপিজেড যেন এক প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের সমারোহ। চট্টগ্রামে ২৫ বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই শিল্পাঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি জমি বরাদ্দ রাখা হয়েছে গাছ ও বন জন্মানোর জন্য। ৮৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ১৩৭ প্রজাতির পাখির প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত এ জায়গা।

প্রতিষ্ঠানটি ১০০ একর জায়গাজুড়ে একটি অত্যাধুনিক হাইটেক পার্ক স্থাপন করছে, যেখানে ২২ তলার একটি আইটি ভবন থাকবে। এই পার্ক বা কমপ্লেক্সটিতে বিভিন্ন সফটওয়্যার ডেভলপমেন্ট সুবিধা ছাড়াও সুউচ্চ আইটি ভবন, বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল এবং কমিউনিটি পরিষেবাসহ অ্যাপার্টমেন্টও থাকবে। এছড়াও এখানে ২০ থেকে ৩০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে জানান সাং। পাঁচটি ভবনের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই আরও কয়েকটি ভবন নির্মিত হবে।

নিজের জীবনদর্শন গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে মেনে চলেন বলেই কিহাক সাং আজকের এই অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছেন।

যেমন, তিনি বিশ্বাস করেন, পরিশ্রম, পরিশ্রম এবং কঠোর পরিশ্রমেই যে কাউকে লক্ষ্যে পৌঁছে দিবে। তিনি মনে করেন, পৃথিবীকে টিকিয়ে রাখার জন্য সবকিছুই টেকসই হতে হবে।

কিহাক জানান, ইপিজেড বলেই যে সবকিছু কেবল ইট-পাথরের হবে, প্লট বিক্রির জায়গা হবে, ব্যবসায় শেষে ইচ্ছেমতো তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে যাওয়া যাবে, তা নয়। তিনি এখান থেকে যেতে চান না। তাই স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস ও কাজের জন্য একে শহুরে ধাঁচে গড়ে তুলেছেন ৭৫ বছর বয়সি এই কোরিয়ান পোশাক উদ্যোক্তা.

কিহাক সাংয়ের দর্শন হলো, বিপদে পড়লে হাঁটুন, হাঁটুন এবং হাঁটুন। এভাবেই কিহাক একদিন বিস্তীর্ণ বালুকাময় জমির সন্ধান পেয়ে যান, যাকে তিনি কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কেইপিজেডে পরিণত করেছেন।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button