আন্তর্জাতিকসাম্প্রতিক

শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক ধসঃ মূখ্য কারণগুলি কি

ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে অনেকটাই নুয়ে পড়েছে ভারত মহাসাগরীয় এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা।

শ্রীলঙ্কার আর্থিক ও মানবিক সংকট গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। আমদানি করা পণ্যের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি জনজীবনকে পর্যদুস্ত করে দিচ্ছে। কয়েক মাস ধরে দেশটি ভয়াবহ খাদ্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কায় চাল ও গম বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকা ও ১৯০ টাকা কেজি দরে। একটি ডিমের দাম ৩০ টাকা।

সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছেন দুই মুঠো খাবারের জন্য। বাঁচার জন্য লড়াইয়ে হানাহানি আর হিংসার বলি হচ্ছেন নিরপরাধ মানুষ।

অথচ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে পৌঁছে যাওয়ায় বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করে সংকট মোকাবিলার সামর্থ্যও নেই সরকারের। 

এছাড়াও, দেশটিতে আমদানি করা পণ্যের ক্রমবর্ধমান ঘাটতি জনজীবনকে পর্যুদস্ত করে দিচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংঘবদ্ধ মজুতদারি এতই শক্তিশালী হয়ে উঠেছে যে, অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে সৃষ্ট কৃত্রিম সংকট তদারকের জন্য একজন মিলিটারি জেনারেলের নেতৃত্বে ‘কন্ট্রোলার অব সিভিল সাপ্লাইজ’ নামের কঠোর নজরদারি সংস্থা গড়ে তুলেও অবস্থা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। গাড়ি, স্যানিটারি আইটেম, কিছু ইলেকট্রনিক পণ্যের আমদানি সরাসরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। 

সরকারের আয় নেই। অতিমূল্যস্ফীতির দিকে দেশ। ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের মজুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় গত মাসে শ্রীলঙ্কা তাদের একমাত্র তেল শোধনাগারটি বন্ধ করে দেয়। দেশটিতে এখন ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে। বিদ্যুৎ না পাওয়ায় দেশটির প্রধান স্টক মার্কেটে লেনদেনের সময় কমিয়ে এনেও কাজ হচ্ছে না। বিদ্যুৎ বাঁচাতে সড়ক বাতিও নিভিয়ে রাখা হচ্ছে। 

রান্নার জ্বালানি গ্যাসের দাম শ্রীলঙ্কার মুদ্রায় ১১৫০ রুপি থেকে বেড়ে ৪০০০ রুপি ছাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়েছে জরুরি খাদ্যপণ্যে। শিশু খাদ্য গুঁড়ো দুধ বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। অর্থের অভাবে কাগজ ছাপা বন্ধের ফলে সম্প্রতি দেশটির কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে সরকার।

অন্যদিকে বিদেশি ঋণের বোঝায় ভেঙে পড়েছে দেশের অর্থনীতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরসহ মন্ত্রীসভার ২৬ জন মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। দেশজুড়ে চলছে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ। সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ মানুষের বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি অবস্থা এবং কারফিউ জারি করেও মানুষকে ঘরে আটকে রাখতে পারেনি।

২০০৬ সালে, গৃহযুদ্ধের সমাপ্তির পরে শ্রীলঙ্কার মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ২০১২ সাল পর্যন্ত ঠিকঠাকই ছিল। সে সময় মাথাপিছু আয় ১৪৩৬ ডলার থেকে বেড়ে ৩৮১৯ ডলার হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ। ২০১৯ সালে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশেও পরিণত হয়েছিল দেশটি। 

কিন্তু কোনো অর্জনই ধরে রাখতে পারেনি তারা। প্রবৃদ্ধি কমতে থাকলে পরের বছরেই বিশ্বব্যাংক তাদের নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে নামিয়ে দেয়। এরপর রপ্তানি কমে যাওয়ায় চলতি আয়ে দেখা দেয় বড় ভারসাম্যহীনতা। শ্রীলঙ্কার রপ্তানি পণ্য মূলত ৩টি, তৈরি পোশাক, চা ও রাবার। এই ৩ পণ্যেই আয় কমছিল, কিন্তু বড় ধস নেমেছে মূলত গত দুই বছরে, মহামারির সময়ে। সবশেষে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আরও বিপদে পড়ে তারা।

কিন্তু, একসময়ের দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাবনাময় দেশটির কেন এই দুর্দশা? কীভাবে তারা এই গভীর সংকটে পড়েছে?

না, কোনও জঙ্গি সংগঠন নয়, স্রেফ সরকারি ভ্রান্ত সিদ্ধান্তে এই অবস্থা দ্বীপরাষ্ট্র জুড়ে। রাজাপক্ষ পরিবারের গোষ্ঠীতন্ত্র, খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্ত, ভুল নীতি, ভুল প্রকল্প বাছাই এবং দুর্নীতির কারণেই শ্রীলঙ্কা আজকের এই অবস্থানে।

ঋণে ডুবে থাকা শ্রীলঙ্কার এই অবস্থা একদিনে হয়নি। এই সমস্যার শুরু হয় মূলত বিদেশি মুদ্রার ঘাটতি থেকেই। গত দেড় মাস ধরেই শোনা যাচ্ছিল যে, শ্রীলঙ্কার সরকারের পেট্রোল-ডিজেল সহ আমদানি মোটামুটি বন্ধ। পর পর সরকার বিভ্রান্তিকর সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেখানে দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকেনি। চিনের মতো দেশের সঙ্গে বিদেশনীতি কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে। এছাড়া কোভিড পরিস্থিতির জন্য গত দুই বছর শ্রীলঙ্কা সরকার ১৪ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে।

অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আরেকটি কারণ বিশাল বৈদেশিক ঋণ। বলা হয়, চীনের ঋণের ফাঁদে বন্দী শ্রীলঙ্কা। একাধিক অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য শুধু চীনের কাছ থেকেই ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ নিয়েছে তারা। যেমন, গভীর সমুদ্রবন্দর হাম্বানটোটা নির্মাণের জন্য চীন থেকে ১৫ বছরের জন্য বাণিজ্যিক ভিত্তিতে, ৬.৩% সুদহারে ঋণ নিয়েছিল ৩০ কোটি ৭০ লাখ ডলার। কিন্তু এই সমুদ্রবন্দর থেকে আয় হয় সামান্য, যা ঋণ পরিশোধের জন্য যথেষ্ট ছিল না। ফলে পরিচালনার জন্য চীন থেকে ২% সুদ হারে আরও ৭৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার নেওয়া হয়। কিন্তু  তাতেও কাজ হয়নি। পরে চীনের কাছেই বন্দরটি ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়েছে।

চীনের ঋণে করা আরেক ‘শ্বেতহস্তী’ প্রকল্প হচ্ছে মাত্তালা রাজাপক্ষে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। প্রায় জঙ্গলের মধ্যে করা এই বিমানবন্দরেরও আয় থেকে ব্যয় বেশি। যাত্রী কম, উড়োজাহাজ ওঠানামাও কম। এই বিমানবন্দরকে এখন বলা হয়, বিশ্বের সবচেয়ে ফাঁকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

এছাড়াও, বর্তমান সংকটে শ্রীলঙ্কা নতুন করে আড়াই শ কোটি ডলার ঋণ চেয়েছে চীনের কাছে। শুধু চীন নয়। ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে ভারতও। বাংলাদেশ গত বছর বৈদেশিক মুদ্রার মজুত থেকে ২০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিল। সময়মতো সেই অর্থও পরিশোধ করতে পারেনি তারা। 

শ্রীলঙ্কার ঋণের হার এখন জিডিপির ১১৯%। অর্থাৎ দেশটি সব মিলিয়ে এক বছরে যে পণ্য ও সেবা উৎপাদন করে, তার তুলনায় ঋণ বেশি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ঋণের দায় পরিশোধ হিসেবে চলতি বছর শ্রীলঙ্কাকে সব মিলিয়ে ৫০০ কোটি ডলার পরিশোধ করার কথা। অথচ এখন শ্রীলঙ্কার হাতেই আছে মাত্র ২৩১ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার মজুত। সুতরাং ঋণ পরিশোধ তো দূরের কথা, দৈনন্দিন কাজ চালাতেই নতুন করে আরও ঋণ নিতে হচ্ছে। অন্যদিকে বৈদেশিক বিনিয়োগও কমেছে গত দুই বছরে।

এছাড়াও সমালোচকরা বলছেন, শ্রীলঙ্কায় কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এই সংকটের মূলে আছে একের পর এক সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা। সরকারের কিছু অবিবেচক সিদ্ধান্ত দেশটিতে দ্বৈত ঘাটতি তৈরি করেছে এবং ধীরে ধীরে তা দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে। এই দ্বৈত ঘাটতে হলো- চলতি হিসাবের ঘাটতি এবং বাজেট ঘাটতি।

২০১৯ সালে, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) একটি ওয়ার্কিং পেপারে বলা হয়, ‘শ্রীলঙ্কা ইজ এ ক্লাসিক টুইন ডেফিসিট ইকোনমি’। টুইন ডেফিসিট সংকেত দেয়- একটি দেশের জাতীয় ব্যয় তার জাতীয় আয়ের চেয়ে বেশি এবং দেশটির বাণিজ্যিক পণ্য ও পরিষেবার উৎপাদন অপর্যাপ্ত।

বিপর্যয়কর পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়ন শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০২১ সালের মে মাসে, সরকার আকস্মিকভাবে সার ও কীটনাশক নিষিদ্ধ করে অর্গানিক পদ্ধতি অনুসরণের জন্য কৃষকদের বাধ্য করে। যা দেশের কৃষি খাতে ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে এবং দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ফসল ধানের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমতে শুরু করে।

সাধারণত পর্যটন খাত থেকে দেশটির মোট অর্থনীতির ১২% জোগান দেয়। কিন্তু কোভিড মহামারীর কারণে সেই খাতে ধ্বস নেমেছে দুই বছর আগে। বিবিসির তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে পর্যটন খাত থেকে দেশটির আয় ছিল ৪০০ কোটি ডলার। মহামারীর কারনে পরের বছর তা ৯০% কমে যায়। 

অর্থনীতিবিদের মতে, শ্রীলঙ্কার সরকার কোনোদিক বিবেচনা না করে এক ডলার সমান ২০৩ শ্রীলঙ্কার মুদ্রায় বেঁধে দিয়েছিল। অথচ বাজারে তখন এক ডলার বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৬৬ শ্রীলঙ্কার মুদ্রায়। ফলে অধিকাংশ মানুষ বেশি রোজগারের আশায় কালো বাজারে বিদেশি মুদ্রা ভাঙিয়েছেন। যার জেরে দুই দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শ্রীলঙ্কার ব্যাংক। প্রথমত, বৈদেশিক মুদ্রা থেকে তাদের রোজগার কমেছে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকে বিদেশি মুদ্রা, অর্থাৎ ডলারের পরিমাণ ক্রমশ কমতে থেকেছে।

বর্তমানে দেশটিতে বেকারত্বের হারও খুব বেশি। বয়স্ক নাগরিকরা দেশটির চলমান অবস্থাকে ১৯৭০-এর দশকের দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করছেন। 

অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির হার দিন দিন বাড়ছে। শ্রীলঙ্কান রুপির বৈদেশিক মান কিছুদিন আগেও ছিল ১ ডলারে ১৯০ রুপি, গত এক মাসে সেটা বেড়ে ২৩০ রুপিতে পৌঁছে গেছে। বর্তমানে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১.৬ বিলিয়ন ডলার থেকে ২.৮ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে, অথচ আগামী এক বছরের মধ্যে শ্রীলঙ্কাকে ৭.৩ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সুদাসলে পরিশোধ করতেই হবে। এর মানে, শ্রীলঙ্কা নিজেকে ‘আর্থিক দেউলিয়া’ ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button