ইতিহাস

আরবদের সৌদি আরব দখল বৃত্তান্ত

সৌদি আরব এমন এক দেশ যার নামকরন করা হয়েছে কোন রাজ পরিবারের নামে। আর কিভাবে সেটা সম্ভব হয়েছে তাই নিয়েই আজকের আয়োজন।

সৌদি আরবের বর্তমান রাজধানী রিয়াদের কাছেই একটি গ্রাম ‘দিরিয়া’। ১৭২০ সাল থেকে ১৭২৫ সাল পর্যন্ত, বনু হানিফা গোত্রের সৌদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে মুকরিন ছিলেন দিরিয়ার নেতা। ১৭২৫ সালে, তিনি মারা যান। তার নাম অনুসারেই এই পরিবারের নাম হয় ‘সৌদ’ পরিবার (আল সৌদ)। সৌদের মৃত্যুর পর দিরিয়া’র প্রধান হন সৌদের পুত্র মুহাম্মদ বিন সৌদ। ১৭৪৪ সালে, এই ব্যক্তি আরবের বিখ্যাত ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি করে ‘দিরিয়া আমিরাত’ গঠন করেন। এই দিরিয়া আমিরাতই বিশ্বের প্রথম সৌদি রাজ্য। 

মুহাম্মদ বিন ওয়াহাব প্রথম জীবনে কুরআন মুখস্ত করেন এবং হাম্বলি শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। কিন্তু তিনি কোনোভাবেই সুন্নি মুসলিমদের মাঝে প্রচলিত মাজার পূজা মানতে পারলেন না। তার মতে, তৎকালীন ইসলাম শিরক বিদআতে পরিপূর্ণ ছিলো। তাই এই অবস্থা কে পরিশুদ্ধ করার মতবাদ জানান তিনি।

আব্দুল ওয়াহাবের তখন দীরিয়ার শাসক সৌদ বংশের নায়ক মুহাম্মাদ ইবনে সৌদের সাথে পরিচয় হয়। তারা একত্রে ইসলামের মূলনীতিতে ফিরিয়ে আনবার পরিকল্পনা করেন। ইবনে আব্দুল ওয়াহাব, সৌদ কে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে আহবান জানান। বিনিময়ে তাকে মুসলিম উম্মাহর ইমাম হিসেবে নিযুক্ত করার প্রস্তাব দেন। এছাড়াও মুহাম্মদ বিন সৌদ তার পুত্র আবদুল আজিজের সাথে মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের মেয়ের বিয়ে দেন। এভাবেই সৌদ পরিবার ও ওয়াহাবী মতবাদের মিলনযাত্রা শুরু হয়। 

তখনই ইবনে আব্দুল ওয়াহাবের প্রচারিত ধর্মীয় শিক্ষাগুলো চালু করা হয়। ইবনে আব্দুল ওয়াহাবের নামানুসারে এ সংস্কার বা আন্দোলন পরিচিত হয় ‘ওয়াহাবি আন্দোলন বা ওয়াহাবি মুভমেন্ট’ নামে। তার আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল: মুসলিমদের মূল ইসলামে ফেরত নিয়ে আসা যেমনটা হযরত মুহাম্মদ (সা) ও সাহাবীদের যুগে ছিল। 

১৭৬৫ সালে, মুহাম্মদ বিন সৌদের মৃত্যু হলে তার ছেলে আবদুল আজিজ দিরিয়ায় শাসক হয়। ১৮০২ সালের ২১ এপ্রিল, আব্দুল আজিজ কারবালা আক্রমণ করে নাজদ থেকে বারো হাজার ওয়াহাবি সেনা নিয়ে। এ আক্রমণের মাধ্যমে তারা হুসাইন (রা) এর কবরের উপরের গম্বুজ ভেঙে ফেলে এবং সেখানে দান করা প্রচুর সম্পদ নিয়ে যায় উট বোঝাই করে। এ আক্রমণে নিহত হন ২,০০০ কিংবা মতান্তরে ৫,০০০ মানুষ। পোড়ানো হয় চল্লিশ হাজার বাড়ি। এর মধ্য দিয়ে ওয়াহাবিজমের সহিংস রূপ প্রকাশ পায়। 

এ ঘটনার পর অটোম্যান খেলাফত সৌদিদেরকে শান্তির জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মনে করে।

তখন আবদুল আজিজ তৎকালীন বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী মোড়ল ব্রিটেনের সাথে হাত মিলিয়ে তুরস্কের খলিফাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে থাকে। শ্বশুর ইবনে ওয়াহাবের ধর্মীয় মতবাদকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তথাকথিত শিরক-বিদাত উচ্ছেদের নামে ব্রিটিশদের সাথে তুর্কি খিলাফত ধ্বংসের কাজে লিপ্ত হয় আবদুল আজিজ। ১৮০১/২ সালে, আবদুল আজিজ তুর্কি খিলাফতের কাছ থেকে ইরাক দখল করে হজরত আলী (রা.) ও হজরত হুসেন (রা.)-এর মাজার শরিফ ভেঙে ফেলে। এর প্রেক্ষিতে ১৮০৩ সালে, একজন শিয়া মুসলিম আজিজকে দিরিয়ায় আসরের নামাজরত অবস্থায় হত্যা করে।

এর পর আবদুল আজিজের ছেলে সৌদ বিন আবদুল আজিজ ক্ষমতায় আসেন। সৌদের শাসনামলে সৌদি সাম্রাজ্য সবচেয়ে বিস্তৃত হয়। ক্ষমতায় আসার পর তুর্কিদের পরাজিত করে ১৮০৩ সালে মক্কা ও ১৮০৪ সালে মদিনা দখল করে নেন তিনি। তারা মক্কা-মদিনার বহু মুসলিমকে হত্যা করে। ওয়াহাবী মতবাদের ধর্মীয় শুদ্ধি অভিযানের অজুহাতে তারা বহু সাহাবীর কবরস্থান ধ্বংস করে। এমনকি খোদ মহানবী (সা.)-এর পবিত্র কবরে ছায়াদানকারী মিম্বরগুলোও এরা ভেঙে ফেলে। 

১৮০৮ সালে, খলিফা ২য় মাহমুদ ক্ষমতাসীন হয়ে সৌদিদের দমনে শক্তিশালী সেনাদল পাঠান। 

১৮১৪ সালে, সৌদের মৃত্যুর পর তার পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনে সৌদ মুখোমুখি হন অটোম্যান আক্রমণের। মিসরীয় বাহিনী আব্দুল্লাহ’র বাহিনীকে পরাজিত করে ফেলে। 

১৮১৮ সালে, মিসরীয়দের কাছে দিরিয়ার রাজধানীর পতন হয়। আবদুল্লাহ তুর্কিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। মিসরীয় বাহিনী দিরিয়া ধ্বংস করে দেয়। আল সৌদ পরিবারের অনেককে বন্দী হিসেবে মিসরে পাঠানো হয়।

এভাবেই প্রথম সৌদি আমিরাত (১৭৪৪-১৮১৮)-এর পতন হয় ও পবিত্র মক্কা-মদিনাসহ আরবে উসমানিয়া খিলাফতের শাসনকর্তৃত্ব ফিরে আসে।

কিন্তু প্রথম সৌদি আমিরাতের শেষ আমীর আবদুল্লাহ’র তুর্কি নামের এক পুত্র মরুভূমিতে পালিয়ে যায়। এই তুর্কি বিন আবদুল্লাহ পালিয়ে বনু তামিম গোত্রে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে ১৮২১ সালে, সে আত্মগোপন থেকে প্রকাশ্যে এসে উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

১৮২৪ সালে, তুর্কি বিন আবদুল্লাহ উসমানিয়াদের নিয়োজিত মিশরীয়দের হটিয়ে দিরিয়া ও রিয়াদ দখল করে নেয়। রিয়াদকে রাজধানী করে গঠিত এই “নজদ আমিরাত” ইতিহাসে দ্বিতীয় সৌদি রাজ্য নামে পরিচিত। এই নজদ আমিরাতের প্রধানকে “ইমাম” বলা হত এবং ওয়াহাবী মতাবলম্বীরাই ধর্মীয় বিষয়ে কর্তৃত্বশীল ছিল।

এ সময় সৌদি পরিবারের নিজেদের মাঝে শুরু হয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। ১৮৩৪ সালে, ইমাম তুর্কি বিন আবদুল্লাহকে তাঁর এক জ্ঞাতি ভাই মুশারি বিন আবদুর রহমান বিদ্রোহ করে হত্যা করে। পরবর্তীতে তুর্কি’র ছেলে ফয়সাল নজদ আমিরাতের ইমাম হয়।

সৌদ পরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। অবশেষে ১৮৯১ সালে, মুলায়দার যুদ্ধে উসমানিয়াদের অনুগত রাশিদী বাহিনীর হাতে দ্বিতীয় সৌদি আমিরাতের পতন ঘটে। সৌদিদের শেষ ইমাম আবদুর রহমান বিন ফয়সাল তার বাহিনী নিয়ে পালিয়ে যায়।

আবদুর রহমান তার পুত্র আবদুল আজিজকে নিয়ে দক্ষিণপূর্বে মুররা বেদুইন গোত্রে গিয়ে অবস্থান নেয়। সেখান থেকে তারা বাহরাইনের রাজপরিবারের কাছে গিয়ে কিছুদিন আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে ১৮৯৩ সালে, আবদুর রহমান ও তার পুত্র কুয়েতি আল-সাবাহ রাজপরিবারের আশ্রয় পায়।

কুয়েতি রাজপরিবারের সহায়তায় ওয়াহাবী মতবাদের আলোকে পরিশুদ্ধ ইসলাম প্রতিষ্ঠার নামে

সৌদিরা উসমানিয়া খিলাফতের কর্তৃত্বাধীন নজদে একের পর এক চোরাগুপ্তা হামলা চালাতে থাকে। কিন্তু এসব হামলায় সৌদিরা তেমন কোনো বড় সাফল্য পায়নি। 

১৮৯৯ সালের জানুয়ারিতে, কুয়েতের আমির মুবারক আল সাবাহ ব্রিটেনের সাথে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করে কুয়েতকে ব্রিটেনের করদরাজ্যে পরিণত করেন। 

সৌদ পরিবারের লড়াইটিও ছিল উসমানিয়া খিলাফতের বিরুদ্ধেই। তাই ১৯০১ সালে, সারিফের যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে পিতা আবদুর রহমান হতোদ্যম হলেও পুত্র আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ আবারও আশার আলো দেখে। আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ ১৯০১ সালের শেষের দিকে, কুয়েতের আমির মুবারকের কাছে উসমানিয়াদের নিয়ন্ত্রিত রিয়াদ আক্রমণের জন্য সাহায্য চায়। কুয়েত তখন সানন্দেই ইবনে সৌদকে ঘোড়া ও অস্ত্র সরবরাহ করে।

১৯০২ সালে ১৩ জানুয়ারী, আব্দুল আজিজ রিয়াদ আক্রমন করেন। তার রিয়াদ আমিরাত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইতিহাসে তৃতীয় সৌদি রাজ্যের সূচনা হয়।

তখন মাত্র ২০ বছর বয়সে রিয়াদের শাসক হিসেবে আবির্ভূত হন আব্দুল আজিজ। সৌদ পরিবারের নতুন নেতা হিসেবে তার পরিচয় তখন থেকে হয় ‘ইবনে সৌদ’। এর পর তিন দশক ধরে সৌদিরা একে একে রাশিদীদের নজদের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হটিয়ে দিতে থাকে। ১৯০৭ সালের মধ্যে, সৌদিরা নজদের বিরাট এলাকা নিজেদের দখলে নিয়ে বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হয়।

১৯১৩ সালে, সৌদরা পূর্ব আরবের গুরুত্বপূর্ণ মরুদ্যান ‘হাসা’ ও ‘কাতিফ’ শহর দখল করে নেয়।

১৯১৪ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর ব্রিটিশদের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেন সৌদরা। যা ‘দারিন চুক্তি’ নামে পরিচিত। এই চুক্তি মোতাবেক, রিয়াদ ব্রিটিশদের করদরাজ্যে পরিনত হয় এবং ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত কুয়েত, কাতার ও ওমান শাসনে সাহায্য করবে বলে আশ্বাস দেয় সৌদরা। এই চুক্তির মাধ্যমেই সৌদি রাজ্য প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়।

কিন্তু মাঝখানে বাধসাধে মক্কার শাসক উসমানিয় অনুগত হোসেন বিন আলী। নিজের লোকেদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে মক্কা, মদিনা ও তাবুকের শাসক বনে যান তিনি। যাতে চরম মাত্রায় মনঃক্ষুন হয় সৌদরা। যদিও পরবর্তীতে খিলাফতের পতনে ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত লাগায়, হোসেন বিন আলী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বেঁকে বসেন এবং নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করেন। এত ক্ষিপ্ত হয়ে, ইবনে সৌদ কে মক্কা, মদিনা ও তাবুক দখল করে নিতে বলেন ব্রিটিশরা। 

১৯২৬ সালের ৮ জানুয়ারি, আব্দুল্লাহ ইবনে সৌদ নিজেকে হেজাজের শাসক ঘোষনা করেন।

১৯২৭ সালের ২৭ জানুয়ারি, ইবনে সৌদ রিয়াদ (নজদ)  এবং মক্কা- মদিনা (হেজাজ) নিয়ে কিংডম অফ নজদ এবং হেজাজ ঘোষণা করে।

১৯৩২ সালের ভেতর, সব প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে দেন ইবনে সৌদ। সে বছরেরই ২৩ সেপ্টেম্বর, আল সৌদ বংশের নামানুসারে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন ‘কিংডম অফ সৌদি অ্যারাবিয়া’, আর এটিই হলো বর্তমান সৌদি আরব।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button