ইতিহাস

সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের কারণ

কমিউনিজম বা সাম্যবাদের কথা আসলেই প্রথমেই রাশিয়ার নাম চলে আসে। রাশিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর সর্বপ্রথম কমিউনিস্ট বা সাম্যবাদে বিশ্বাসী রাষ্ট্র। আমরা যারা কোল্ড ওয়ার সম্পর্কে মোটামুটি জানি, তারা সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতা সম্পর্কেও জানতে বাধ্য। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের মতই পৃথিবীর অন্যতম এক পরাশক্তি ছিল এই সোভিয়েত ইউনিয়ন।

তাই বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক দেশ সােভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন ও শেষপর্যন্ত তার বিলুপ্তি আজও একটি আলােচিত বিষয়। 

কিন্তু কেন পতন হয়েছিল বিশ্বের অন্যতম এই পরাশক্তির ?

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন সম্পর্কে জানার পূর্বে জেনে নিতে হবে সোভিয়েত ইউনিয়নের গঠন সম্পর্কে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল একটি একদলীয় যুক্তরাষ্ট্রীয় সমাজতান্ত্রিক দেশ, যার অস্তিত্ব ছিল ১৯২২ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। 

সোভিয়েত ইউনিয়ন মূলত রাশিয়া, জর্জিয়া, ইউক্রেন, মলদোভা, বেলারুশ, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরগিজিস্তান, তাজিকিস্তান, ইস্তোনিয়া, লাতভিয়া এবং লিথুয়ানিয়া নিয়ে গঠিত হয়েছিলো। ১৯৪০ সালে, এই ইউনিয়ন তার পূর্ণাঙ্গরূপ ধারণ করে।

ইউনিয়ন অব সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকস বা সংক্ষেপে সোভিয়েত ইউনিয়নের আয়তন ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ বর্গ কি.মি. এই বিশাল রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয় ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের সময়। রুশ বিপ্লবের ফলে রাশিয়ান জারের পতন ঘটে এবং রাশিয়া ও তার আশেপাশের রাষ্ট্রগুলোতে গৃহযুদ্ধের শুরু হয়। ১৯২২ সালের ডিসেম্বরে, বলসেভিক কর্তৃক রাশিয়ার ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে এই বিশৃঙখল অবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটে।

গঠনের পর থেকে যথাক্রমে ভ্লাদিমির লেনিন, জোসেফ স্টালিন, নিকিতা ক্রুশ্চেভ সোভিয়েত ইউনিয়নকে আরো শক্তিশালী করে তুলে। ১৯৮৫ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতায় আসে মিখাইল গর্ভাচেভ। তার শাসন আমলেই ভাঙ্গন ধরে এই পরাশক্তির। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের কারণগুলো ছিলোঃ

গর্বাচেভের নতুন নীতি প্রনয়ণ

একসময়ের পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়েছিল মূলত সোভিয়েত রাষ্ট্রপতি মিখাইল গর্বাচেভ যে বিপুল পরিমাণে সংস্কার বাস্তবায়ন করেছিলেন তার কারণে। গর্বাচেভ অন্যান্য সোভিয়েত শাসকদের থেকে আলাদা ছিলেন। তিনি দেখেন, সোভিয়েত জনগণ কমিউনিস্টদের অত্যাচার, নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। তিনি গতানুগতিক সোভিয়েত ধারার বাইরে গিয়ে নতুনভাবে ইউনিয়নকে সাজাতে চেয়েছিলেন। ১৯৮৬ সালে, গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নকে সংস্কারের গুরুত্ব উপলব্ধি করে গ্লাসনস্ত (স্বচ্ছতা) এবং পেরেস্ত্রোইকা (পুনর্গঠন) নীতি গ্রহণ করেন। গ্লাসনস্ত অনুযায়ী সোভিয়েতরা মত প্রকাশের স্বাধীনতা পায়।  মানুষ সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সকল ক্ষেত্রেই স্বাধীনতা ও মুক্ত আলোচনার অধিকার পায়। এছাড়া কমিউনিস্ট পার্টির একনায়কতন্ত্রের অবসানের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার ও কমিউনিস্ট পার্টির বাইরে গিয়ে দল গঠন ও নির্বাচনের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

আর পেরেস্ত্রোইকা অনুযায়ী, ভঙ্গুর সোভিয়েত অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করার পরিকল্পনা করা হয়। এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে যে রাষ্ট্রীয় আধিপত্য ছিল তা অবসানের পরিকল্পনা করা হয়।

কিন্তু গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনলেও শেষ পর্যন্ত গর্বাচেভের সংস্কারগুলোই সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধ্বংস করে দেয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা 

ক্ষমতায় আসার পরে মিখাইল গর্ভাচভ সোভিয়েত ইউনিয়ননের শাসন ব্যবস্থাকে বর্তমান চায়নার মত ক্যাপিটালিজম এবং কমিউনিজম এর মিশ্রণে তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তবে সোভিয়েত জনগণ কমিউনিস্ট ধারা থেকে মুক্তি চাচ্ছিলেন। কারণ বছর বছর ধরে চলা রাজনৈতিক অবিচার এবং গ্রেফতারের কারণে সোভিয়েত জনতা কমিউনিস্ট পার্টির উপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং বিভিন্ন স্থানে গণতন্ত্রের জন্য মানুষ আন্দোলনের চিন্তাভাবনা শুরু করে। 

কমিউনিস্ট পার্টির নেতারাও সুবিধা ভোগের চিন্তা এবং দূর্নীতির সঙ্গে এতটাই যুক্ত হয়ে যায় যে, ব্যক্তি স্বার্থ ব্যতীত অন্য কিছুতে তারা অস্বীকৃতি জানায়। ফলে মুক্ত চিন্তায় বিশ্বাসী গর্ভাচেভের সংস্কার ব্যাহত হয়। কমিউনিস্ট পার্টি মিডিয়া এবং জনতার উপর নিয়ন্ত্রণ হারায় এবং ধীরে ধীরে পার্টির ভিত দূর্বল হতে শুরু করে। যার ফলে, অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো স্বাধীনতার প্রস্তুতি নিতে থাকলে ধীরে ধীরে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের দিকে ধাবিত হয়। 

দুর্বল অর্থনৈতি

সোভিয়েত অর্থনীতি কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হলেও তা নিয়ন্ত্রণ করত কমিউনিস্ট পার্টি।

৮০’র দশকের শেষের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতি তেল ও গ্যাস রপ্তানীর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তেলের মূল্য কমে গেলে তা সোভিয়েত সরকারের আমদানী ও রপ্তানী বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা বাজেট ঘাটতি তৈরি করে। অর্থনীতির করুণ দশা কাটাতে সোভিয়েত সরকার বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করায়, এর অর্থনীতি মারাত্মক মন্দার মুখে পড়ে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের বিষয়ে অজ্ঞতা ও অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার ফলে সোভিয়েত ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক বাজারে টিকতে পারেনি।

আরেকটি কারণ ছিল, এর শাসন ব্যবস্থা। সোভিয়েত ইউনিয়নে সকল সম্পদ, শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য ছিল সরকার বা পার্টির নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু পার্টির নেতাদের দূর্নীতি এবং নতুন উদ্যোক্তাদের কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গঠনের সুযোগ না থাকার কারণে অর্থনীতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতেও দূর্ভোগ পোহাতে হচ্ছিল। এভাবেই ১৯৯০ সাল নাগাদ, সোভিয়েত অর্থনীতি এতটাই দূর্বল হয়ে যায় যে এত বড় রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব হচ্ছিল না।

চেরনোবিল পারমাণবিক বিপর্যয়

১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল, কিছু বুঝে উঠার আগেই পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনার একটি ঘটে যায়। চেরনোবিল পাওয়ার স্টেশনের অবস্থান ছিল বর্তমান ইউক্রেনের প্রাইপিয়াত অঞ্চলে। দুর্ঘটনাটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে এর তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ ছিল হিরোশিমায় পারমাণবিক হামলার ৪০০ গুণেরও বেশি। তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব সোভিয়েত ইউনিয়নের পুরো পশ্চিমাঞ্চল ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর উপর পড়েছিল।

কিন্তু বিস্ফোরণ সম্পর্কে অবহিত করার পরিবর্তে কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তারা জনগণের কাছে এই বিপর্যয় এবং এর বিপদ সম্পর্কিত সমস্ত তথ্য লুকিয়ে রাখে। কমিউনিস্ট পার্টি এর ভয়াবহতা সম্পর্কে সকল তথ্যকে পশ্চিমা প্রপাগান্ডা বলে উড়িয়ে দেয়।

ফলস্বরূপ, সাধারণ জনগণ সোভিয়েত প্রশাসনের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে।

দুর্ঘটনার ১৮ দিন পর ১৪ মে, গর্বাচেভ প্রথমবারের মতো এ সম্পর্কে বিবৃতি দেন। যেখানে তিনি চেরনোবিলকে দুর্ভাগ্য বলে অভিহিত করেন। কিন্তু দুর্ঘটনা কবলিত অঞ্চলগুলোতে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে ভোগান্তিতে থাকা মানুষগুলোর মন্তব্য কমিউনিস্ট পার্টির মিথ্যাচারকে উন্মোচিত করে। ফলে সরকার ও গ্লাসনস্ত নীতির উপর থেকে জনগণের আস্থা চুরমার হয়ে যায়। চেরনোবিল দুর্ঘটনা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পেছনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রেখেছে।

আফগান যুদ্ধ এবং সামরিক দূর্গতি

সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পিছনে এর মিলিটারিও দায়ী ছিল। কোল্ড ওয়ারের কারণে সোভিয়েত মিলিটারি বাজেট প্রথম থেকেই অনেক বেশি ছিল। কিন্তু রোনাল্ড রেগান মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে এই প্রতিযোগিতামূলক মিলিটারি বাজেট আরো বেড়ে যায়। মিলিটারি কমিউনিস্ট পার্টি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে কমিউনিস্ট নেতা এবং মিনিস্টাররা নিজেদের ইচ্ছা মত মিলিটারিতে ব্যয় করত। যা সোভিয়েত অর্থনীতিকে দিন দিন আরো দূর্বল করছিল। এছাড়াও গর্ভাচেভের রিফর্মের জন্য মিলিটারি বাজেট একটি বাধা হয়ে দাড়ায়। এরই সাথে যুক্ত হয় আফগান যুদ্ধ। দশ বছর ধরে চলা আফগান যুদ্ধে প্রায় ১ মিলিয়ন সোভিয়েত সৈন্য যুক্ত ছিল। যাতে প্রায় ১৫ হাজার সোভিয়েত সৈন্য এবং ১ মিলিয়ন সাধারণ আফগান জনতা প্রাণ হারায়। ফলে সেনাবাহিনীর মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এছাড়াও আফগান মুজাহিদরা যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে সোভিয়েত সৈনদেরকে পরাস্ত করতে শুরু করে, যা সোভিয়েত আর্মিতে আরো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। ফলাফলস্বরূপ ১৯৮৯ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়নকে পরাজয় মেনে নিয়ে আফগানিস্তান ত্যাগ করতে হয়। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হতে হতে সোভিয়েত অর্থনৈতি ও মিলিটারি দুটিরই ভীত দূর্বল হয়ে যায়। 

যেসব কারণে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন আরো দ্রুততর হয়।

বার্লিন প্রাচীরের পতন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশের উপর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। মার্কিন-সোভিয়েত প্রতিযোগিতায় বলির পাঁঠা হয় অনেক দেশ। জার্মানিও এই ফাঁদে পড়ে। বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পর জার্মানিকে পূর্ব ও পশ্চিমে ভাগ করা হয়। পূর্ব জার্মানি ছিল কমিউনিস্টদের অধীনে, সোভিয়েত ইউনিয়নের আজ্ঞাবহ। আর পশ্চিম জার্মানি ছিল পুঁজিবাদী এবং গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত।

১৯৬১ সালে, বার্লিন শহরের মাঝে পূর্ব ও পশ্চিমকে আলাদা করার জন্য দেয়াল নির্মাণ করা হয়। সেই থেকে বার্লিন দেয়াল জার্মানিকে সোভিয়েত-কমিউনিস্ট শাসিত পূর্ব জার্মানি এবং গণতান্ত্রিক পশ্চিম জার্মানিতে বিভক্ত করে। কিন্থ শত বাঁধা অতিক্রম করেও অনেক জার্মান পূর্ব থেকে দেয়াল টপকে পশ্চিমে গিয়েছে। দেয়াল অতিক্রমের সময় ১৯৬১ ও ১৯৯১ এর মধ্যে প্রায় ২০০ জন জার্মান নিহত হয়। জার্মানরা একত্রিত হওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে ওঠে।

১৯৮৮ ও ১৯৮৯ সালে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় পূর্ব জার্মানিতেও আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৮৯ সালের ৯ নভেম্বরে, নতুন পূর্ব জার্মানি সরকার ও জনগণ সত্যিই বার্লিন প্রাচীর ভেঙে ফেলে। এর মাধ্যমে তিন দশকের বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয় জার্মানরা। বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

২৫ ডিসেম্বর ১৯৯১, শেষবারের মতো মস্কোর ক্রেমলিনে সোভিয়েত পতাকা উড়ে। সেদিন সন্ধ্যা ৭:০২ মিনিটে সোভিয়েত পতাকা নামিয়ে সেখানে রাশিয়ার পতাকা উত্তোলন করা হয়। 

১৯৯১ সালের ২৬ ডিসেম্বর, সুপ্রিম সোভিয়েত কাউন্সিল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পক্ষে ভোট দেয়। এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে। ৬৯ বছর আগে গঠিত হওয়া বিশাল সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also
Close
Back to top button