জীবনী

পল আলেকজান্ডারঃ লোহার ফুসফুসে বেঁচে থাকা বিশ্বের একমাত্র মানুষ

১৯৫৫ সালে আমেরিকান ভাইরোলজিস্ট জোনাস সালক একটি সফল পোলিও ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেন। ১৯৭৯ সাল থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পোলিওর কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে অনেক মর্কিনরাই জানেন না পোলিওর ভয়াবহতা কেমন হতে পারে!

১৯৫০ সাল। মাত্র কয়েক বছর আগের কথা। তখনও পোলিও রোগের টিকা আবিষ্কার হয়নি। পোলিওমায়েলাইটিস ভাইরাসের আতঙ্কে রাত পার করছিলো পুরো আমেরিকা। প্রতি গ্রীষ্মেই প্রায় ১৫০০০ শিশু পোলিওর কারণে মারা যাচ্ছিল। এদের মধ্যে যারা বেঁচে ছিল, তারা সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করে। তবে এই সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল ১৯৫২ সাল। সে বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৬০০০০ শিশু পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। এর মধ্যে শুধু টেক্সাসেই আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২১০০০। পরিসংখ্যান মতে, সর্বমোট ৩১৩৫ জন শিশু মারা যায়। 

পোলিও রোগের ভাইরাসটি সাধারণত শিশুদেরকে প্রভাবিত করে। মলের সঙ্গে বের হওয়া ভাইরাসের ক্ষুদ্র কণা মুখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। এমনকি হাঁচি বা কাশির সঙ্গে এই জীবাণু মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে।

করোনাভাইরাসের মতো পোলিওর উপসর্গগুলোও অনেকটা ফ্লুর মতো হয়ে থাকে। করোনাভাইরাস যেমন মানুষের ফুসফুস অকেজো করে দেয়; ঠিক তেমনই পোলিও রোগের ভাইরাসটি আক্রান্তদের ফুসফুস, মেরুদণ্ড এবং মস্তিষ্ক আক্রমণ করে থাকে। এর ফলে পক্ষাঘাত এবং সম্ভাব্য মৃত্যুর কারণ হয়। এটা সবার ই জানা।

তবে লোহার ফুসফুস বুকে নিয়ে বেঁচে থাকার খবর হয়তো অনেকেরই অজানা। যদিও সব রোগীর ক্ষেত্রে এই যন্ত্রটি কাজ করে না। তবে পল আলেকজান্ডার ১৯৫২ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত লোহার ফুসফুস বুকে নিয়েই বেঁচে আছেন।

তাকে নিয়েই আজকের লিখা।

টেক্সাসের বিখ্যাত ডালাস শহরের উপকণ্ঠে, বাবা মা আর বড় ভাইয়ের সঙ্গে থাকত পল আলেকজান্ডার। শিশুদের তখন ঘরের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ। 

১৯৫২ সালের জুলাই মাসের কোনো একদিন, হঠাৎই আকাশ জুড়ে দেখা যায় কালো মেঘ। মায়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে পল নেমে গিয়েছিলো রাস্তায়। আর সেটাই দূর্বিষহ করে দিয়েছে তার জীবনকে।

প্রায় ১ ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভেজার পর, পল দেখে তার মুখের রঙ টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে। সেই সঙ্গে তার গলা এবং মাথা খুব ব্যথা। শরীরে প্রচন্ড জ্বর। পলের বাবা মা ফোন করেছিলেন পারিবারিক চিকিৎসকে। তিনি জানান এ সবই পোলিওর উপসর্গ। হাসপাতালে নেওয়ার পর এক তরুণ চিকিৎসক জরুরীভিত্তিতে পলের ট্রাকিয়োটমি অপারেশন করেন। ফুসফুসে জমে থাকা ফুইড বের করে আনেন। তবে ততক্ষণে পক্ষাঘাতে অসাড় হয়ে গিয়েছিল পলের ফুসফুস। তাই ছয় বছরের ছোট্ট পলকে ঢুকিয়ে দেয়া হয় সিলিন্ডার আকৃতির প্রকাণ্ড এক মেশিনের ভেতর। এ মেশিনটি কৃত্রিম ফুসফুসের কাজ করে। তাই মেশিনটিকে বলা হত ‘ আয়রন লাং ‘ বা লোহার ফুসফুস। চিকিৎসকরা বলতেন ট্যাঙ্ক ভেন্টিলেটর বা ড্রিঙ্কার ট্যাঙ্ক। যে মেশিনটি ১৯২৮ সালে ফিলিপ ড্রিষ্কার নামে একজন মেডিকেল ইঞ্জিনিয়ার আবিষ্কার করেছিলেন।

এই আয়রন লাং হচ্ছে বিদ্যুতচালিত লোহার ফুসফুস। এটি দেখতে ছিল অনেকটা সাবমেরিনের মতো। এক একটির ওজন প্রায় ৩০০ কেজি। মেশিনটির ভেতরে রোগীর চিত হয়ে শোয়ার ব্যবস্থা ছিল। তবে রোগীর মাথা থাকতে হবে সিলিন্ডারের বাইরে। রোগীর পায়ের দিকে সিলিন্ডারটির প্রান্তে লাগানো ছিল চামড়া দিয়ে তৈরি হাপর। যেটি হারমোনিয়ামের বেলোর মতো কাজ করে সিলিন্ডারের ভেতরের বাতাসের চাপ কমাত ও বাড়াত। ফলে কৃত্রিমভাবে রোগীর ফুসফুস সংকুচিত ও প্রসারিত হয়ে রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস চালু রাখত। 

একসময় প্রাথমিক সংক্রমণ কাটিয়ে উঠে পল। তবে তার ঘাড়ের নীচ থেকে পুরো শরীরটা পক্ষাঘাতে অবশ হয়ে গিয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মলমূত্র মেখে মেশিনের মধ্যে পড়ে থাকত পল। যখন মলমূত্র পরিষ্কার করা হত বা জামা কাপড় বদলানো হত, ওই কয়েক মুহূর্ত পলকে নিশ্বাস বন্ধ করে থাকতে হত। কারণ তখন মেশিন এক মিনিটের জন্য বন্ধ করে দেয়া হত। 

বেশিরভাগ পোলিও আক্রান্ত শিশুদেরকে এভাবে চিকিৎসা দেওয়ার পর একসময় সুস্থ হয়ে ওঠে, যদি পক্ষাঘাত সমস্যা হয়ে যায়। তবে পল কখনো লোহার ট্যাংক থেকে বের হতে পারেননি। তাকে হাসপাতালে ১৮ মাস ভর্তি রাখা হয়েছিল। এরপর পলের বাবা মা পলকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার জন্য কিনে ফেলেন লোহার ফুসফুস। 

১৯৫৪ সাল। ৮ বছরের পলের জীবনে আশীর্বাদ হয়ে আসেন ফিজিওথেরাপিস্ট মিসেস সুলিভান। তিনি পলকে শিখিয়েছিলেন কৃত্রিমভাবে শ্বাস নেয়ার একটি কৌশল। কৌশলটির নাম ফ্রগ – ব্রিদিং বা গ্লসোফ্যারিঞ্জিয়াল ব্রিদিং। কৌশলটি হল নাক মুখ দিয়ে বাতাস নিয়ে গিলে ফেলা। কয়েক সেকেন্ডের জন্য মেশিন বন্ধ করে শুরু হয় গ্লসোফ্যারিঞ্জিয়াল ব্রিদিং ট্রেনিং। 

১ বছরের চেষ্টায় পল রপ্ত করে নিয়েছিল ফ্রগ- ব্রিদিং। ফ্রগ – ব্রিদিং রপ্ত করার পর, পলকে কয়েক মিনিটের জন্য মেশিনের বাইরে বের করতে শুরু করেছিলেন মিসেস সুলিভান। তিন বছর পর, বেশ কয়েক ঘণ্টা সিলিন্ডারের বাইরে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল পল। পলের খুব স্কুলে যেতে ইচ্ছা হত। তবে ঘাড়ের নীচ থেকে পুরো শরীর অবশ। লেখার শক্তি নেই তার হাতে। সিলিন্ডারের ভেতর শুয়ে, প্লাস্টিকের ছোট ব্লডের মাথায় কলম বেঁধে, মুখ দিয়ে খাতায় লেখা অভ্যাস করেছিল। পলের মা বাবা তাকে বাড়িতেই পড়াতে শুরু করেন। দাঁতে তুলি কামড়ে খুব সুন্দর ছবি আঁকতে পারত পল। তার এই কাজে মুগ্ধ হয়ে যেতেন সবাই। বয়স বাড়তেই পলের নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস বাড়তে থাকে। সে স্কুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। 

অনেক লড়াইয়ের পর, পলকে বাড়ি থেকে পড়াশোনা করার অনুমতি দিয়েছিল ডালাসের শিক্ষা দফতর। ১৯৬৭ সালে, ২১ বছর বয়সে ডালাস হাই স্কুল থেকে ১২ ক্লাসের গন্ডি পেরিয়েছিল পল। তার স্কুলের হোমবাউন্ড প্রোগ্রামে অংশ নেওয়া প্রথম শিক্ষার্থীদের একজন ছিলেন তিনি।

৭ বছর পর ১৯৭৮ সালে, ভর্তি হন সাউদার্ন ইউনিভার্সিটিতে। ১৯৮৪ সালে, সেখান থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে, ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস থেকে আইন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন পল। ১৯৮৪ সাল থেকেই, প্র্যাকটিস শুরু করেন তিনি। হুইল চেয়ার নিয়ে কোর্টে যেতেন। অন্য আইনজীবীর মতই মামলা লড়তেন ফ্রগ – ব্রিদিং করতে করতে।

সমাজের মূলস্রোতে প্রতিবন্ধীদের ফেরবার অধিকার নিয়ে লড়াই শুরু করেছিলেন পল। তার লড়াইয়ে সঙ্গী হন আইন কলেজের সহপাঠিনী ক্যাথি। ডায়াবেটিসের কারণে ক্যাথি তখন তার দৃষ্টিশক্তির প্রায় ৯০% হারিয়ে ফেলেছেন। দৃষ্টিশক্তির সমস্যা থাকলেও, ক্যাথিই নার্সদের বলে দেন। কীভাবে পলকে দেখভাল করতে হবে। কখন পলের জামা কাপড় পাল্টাতে হবে। পলের আঙুল ও মুখে হাত দিয়ে ক্যাথি দেখে নেন পলের নখ ও দাড়ি কাটার সময় হয়েছে কিনা। তবে পলকে প্রতিদিন নিজের হাতে খাইয়ে দেন ক্যাথি। এই দায়িত্বটা কাউকে দেন না। একা হাতে পলের সংসার সামলাচ্ছেন সত্তরা উর্ধ্ব ক্যাথি।

২০১৬ সাল থেকে, পল আবার ২৪ ঘণ্টার জন্য বন্দি হয়ে গিয়েছেন লোহার ফুসফুসের মধ্যে। কারণ ফ্রগ – ব্রিদিংও তিনি আর করতে পারছিলেন না। বিগত কয়েক বছর ধরে তিনি ল’ প্র্যাকটিসও বন্ধ করে দিয়েছেন।

বর্তমানে তার বয়স ৭৪ বছর। ডালাসে বসবাস করা পল তার জীবনে এবার দ্বিতীয় মহামারির সম্মুখীন। করোনাভাইরাস তার জন্যও বেশ বিপজ্জনক। বর্তমানে পল সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখছেন সবার সঙ্গে। বেঁচে থাকার জন্য পল একমাত্র লোহার ফুসফুসের উপরই নির্ভরশীল। সেইসাথে তিনিই বিশ্বের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি আজও লোহার ফুসফুসের এই মেশিনটি ব্যবহার করছেন।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button