জীবনী

শেন ওয়ার্ন: ক্রিকেটের কিংবদন্তী এবং লেগ স্পিনের জাদুকর

শেন ওয়ার্ন, একজন প্রাক্তন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার। যিনি ক্রিকেটের ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ লেগ স্পিনার হিসেবে বিবেচিত। যিনি তার ১৫ বছরের খেলোয়াড় জীবনে ১৪৫টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ৭০৮টি উইকেট নিয়েছেন, যা টেস্ট ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেকর্ড ।

১৯৬৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন শেন ওয়ার্ন। তার বাবার নাম কেইথ ওয়ার্ন এবং মা ব্রিডজেট ওয়ার্ন। তার পুরো নাম শেন কেইথ ওয়ার্ন। ওয়ার্নের সম্পূর্ণ হেটেরোক্রোমিয়া ছিল, যার ফলস্বরূপ তার একটি চোখ নীল এবং অন্যটি সবুজ। স্কুল ক্রিকেটেই প্রতিভার কারণে বৃত্তি পেয়েছিলেন এই খেলোয়াড়। তার বয়স যখন ১৬, তখন ইউনিভার্সিটি অফ মেলবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের হয়ে খেলার সুযোগ পান তিনি। লেগ স্পিন এবং অফ স্পিন, দুটোতেই তার সমান পারদর্শিতা ছিল। সেইসাথে লোয়ার অর্ডারে ব্যাটসম্যান হিসাবেও দলে ভূমিকা রাখতেন। সেখান থেকে তার শহরের পাশে সেন্ট কিল্ডা ক্রিকেট ক্লাবে যোগ দেন। ক্লাবের হয়ে ক্রিকেট খেলার পাশাপাশি ফুটবলও খেলতেন তিনি। পেশাদার হওয়ার আগে ওয়ার্ন সেন্ট কিল্ডার ফুটবল ক্লাবের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে অস্ট্রেলিয়ান ফুটবল খেলেছেন। তবে ফুটবলের চেয়ে ক্রিকেটে যে তার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল, সেটা বুঝতে খুব বেশিদিন সময় নেননি তিনি।

১৯৯০ সালে, সেন্ট কিল্ডা ক্লাব ছেড়ে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে যোগ দেন শেন। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে, ইংলিশ ক্রিকেট দল অ্যাকরিংটন ক্রিকেট ক্লাবের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি। প্রথম মৌসুমে ১৫.৪ বোলিং গড়ে ৭৩ উইকেট শিকার করেছিলেন ওয়ার্ন। ঐ বছরেই প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। ফেব্রুয়ারিতে প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে অভিষেক হওয়া শেন ওয়ার্ন নির্বাচকদের নজরে আসেন সেপ্টেম্বর মাসে। জিম্বাবুয়ে সফরে যাওয়া অস্ট্রেলিয়া ‘বি’ দলে জায়গা করে নেন তিনি। চার দিনের ম্যাচে ৫২ রান দিয়ে ৭ উইকেট শিকার করে সবার নজর কাড়েন ওয়ার্ন।

ওয়ার্নের ক্যারিয়ারের শুরুটা ছিল একেবারেই চাকচিক্যহীন ভাবে। ১৯৯০ সালের ২রা জানুয়ারী, সিডনিতে ভারতের বিপক্ষে একটি টেস্ট ম্যাচে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়। তার অভিষেকটা চোখে পড়ার মতো ছিল না। কারণ তিনি ১৫০ রান দিয়ে মাত্র ১টি উইকেট নিয়েছিলেন। এই ধরনের হতাশাজনক পারফরম্যান্স দেখে তাকে প্রত্যাহার করা হয়। যদিও পরবর্তীতে ৭/৫২ রানের ম্যাচ জয়ী পারফরম্যান্স দেখিয়ে এর বদলা ওয়ার্ন খুব ভালোভাবেই নিয়েছিলেন। 

টেস্ট অভিষেকের প্রায় এক বছর পর একদিনের ক্রিকেটে অভিষেক হয় এই ক্রিকেটারের। ১৯৯৩ সালে, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ছিলো তার একদিনের প্রথম ম্যাচ। এটি তার জন্য একটি অসাধারন ম্যাচ হিসাবে পরিণত হয়েছিল। কারণ তিনি ১০ ওভারের কোটায় ২ উইকেট তুলেছিলেন এবং ৪০ রান দিয়েছিলেন। শুধুমাত্র তার তৃতীয় একদিনের আন্তর্জাতিকে তিনি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাত্র ২৫ রান দিয়ে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন। 

শেন ওয়ার্ন ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ১৯৪ টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন, যাতে ২৯৩টি উইকেট শিকার করেছেন। এই অব্দি দুটি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। ১৯৯৬ সালে, তার বিশ্বকাপ অভিষেক হয়েছিল কেনিয়ার বিপক্ষে। ১৯৯৯ সালে, অস্ট্রেলিয়ার ৫০ ওভারের বিশ্বকাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল শেন ওয়ার্নের। ক্রিকেট খেলায় ১০০০ এর বেশি উইকেটে নেওয়া দৃতীয় খেলোয়াড় তিনি। টেস্টে এক দিনের ম্যাচে ১০১৮ রান করেছেন এই খেলোয়াড়। 

২০০৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি টেস্ট ক্রিকেটে শীর্ষস্থানীয় উইকেট শিকারী (৭০৮) ছিলেন, যখন অন্য সর্বকালের স্পিনিং কিংবদন্তি মুত্তিয়া মুরালিধরনের সিংহাসন দখল করা হয়েছিল। তিনি দুবার উইজডেন ক্রিকেটার্স অ্যালমানাক-এর উইজডেন ক্রিকেটার অফ দ্য ইয়ার-এ নাম লেখান এবং বিশ্বে উইজডেন লিডিং ক্রিকেটার হিসেবেও দুবার নির্বাচিত হয়েছেন।

শেন ওয়ার্ন এখন পর্যন্ত অ্যাশেজ সিরিজে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি বোলার। ৩৬টি অ্যাশেজ টেস্টে ১৯৫ উইকেট নিজের পকেটে পুরেছেন। ইনিংসে ১১বার ৫ উইকেট এবং ম্যাচে ৪ বার ১০ উইকেট শিকার করেছেন তিনি। ২০০৭ সালে, ইংল্যান্ডের সাথে অ্যাশেজ সিরিজ ৫-০ তে জেতার পর পরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি। তবে টি-টোয়েন্টি ফ্রাঞ্চাইটি ক্রিকেট খেলা অব্যাহত রাখেন। পরে ২০১৩ সালে, সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেন এই কিংবদন্তী।

খেলাধুলার বাইরেও ক্রিকেটের ধারাভাষ্যকার ও পণ্ডিত হিসেবেও নিয়মিত কাজ করে গেছেন ওয়ার্ন। এছাড়াও ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেটে কোচ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

ক্যারিয়ারে অসাধারন সাফল্যের পাশাপাশি অনেক সমালোচনাও কুড়িয়েছিলেন এই খেলোয়াড়। ১৯৯৯ সালে, বিশ্বকাপের কদিন আগে শ্রীলঙ্কার অধিনায়ককে মন্তব্য করে দুই ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। পরে অবশ্য ক্রিকেটে ফিরেই অস্ট্রেলিয়াকে শিরোপা জেতান তিনি। ১৯৯৮ সালের মার্চ থেকে ২০০১ সালের জুন পর্যন্ত, শেন ওয়ার্ন টেস্ট ক্রিকেটে নিজেকে হারিয়ে খুঁজছিলেন। সেসময়ে নানান বিতর্ক এবং অফ ফর্মের কারণে অস্ট্রেলিয়া দল থেকেও বাদ পড়েছিলেন। 

এছাড়াও, ক্যারিয়ারের শুরুতে বাজিকরদের কাছ থেকে টাকা গ্রহণ করে দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়েছিলেন। ২০০০ সালে, ইংল্যান্ডের এক সেবিকাকে অরুচিকর বার্তা পাঠিয়ে বেশ সমালোচিত হয়েছেন। একবার ধূমপান করার সময় কিছু তরুণ তার ছবি তুললে মারপিট করেও বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলেন। সবকিছু ছাপিয়ে ২০০৩ সালের বিশ্বকাপের কদিন আগে ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে ক্রিকেট থেকে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। যার কারণে তার আর বিশ্বকাপ খেলা হয়নি এবং মুত্তিয়া মুরালিধরনের সাথে শীর্ষ উইকেট সংগ্রাহকের পজিশন নিয়ে যে লড়াইটা চলছিল তাতে অনেকটা পিছিয়ে গিয়েছিলেন।

গত ৫ মার্চ শনিবার, থাইল্যান্ডের কোহ সামুইতে মারা যান শেন ওয়ার্ন। ধারণা করা হচ্ছে, হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৫২ বছর। তার এই আচমকা মৃত্যুতে ক্রিকেট দুনিয়া একেবারে হতবাক। তার মৃত্যুকে এখনও অনেকে মেনে নিতে পারছেন না। যেন ক্রিকেটের একটা যুগ হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেল। 

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button