আন্তর্জাতিকসাম্প্রতিক

রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের নেপথ্যে যত কাহিনি

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্ব অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবারই প্রথম ইউরোপের প্রথম দেশ হিসেবে স্থল, আকাশ এবং সমুদ্রপথে ইউক্রেনে সবচেয়ে বড় হামলা শুরু করেছে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নিজেই ঘোষণা করেছেন ইউক্রেনে রুশ হামলার কথা।

কিন্তু কেন এমন সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে রাশিয়া? কোন আশঙ্কা থেকে রুশ প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনে হামলার সিদ্ধান্ত নিলেন?

ইউক্রেন-রাশিয়ার এই সংঘাত আজকে নতুন নয়। এই টানাপোড়েনের শুরু বহু আগের হলেও, ২০১৪ সাল কে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০১৩ সালের নভেম্বরে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক একীকরণের জন্য একটি চুক্তি প্রত্যাখ্যান করায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রাজধানী কিয়েভ শহরে বিক্ষোভের মাধ্যমে ইউক্রেনের মূল সংকট শুরু হয়েছিল। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। ২০১৪ সালের মার্চে, রাশিয়া প্রথমবার ইউক্রেনে প্রবেশ করে। তখন প্রেসিডেন্ট পুতিন সমর্থিত বিদ্রোহীরা ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের বেশ বড় একটি এলাকা ‘ক্রিমিয়া’ দখল করে নেয়। একটি বিতর্কিত গণভোটে ক্রিমিয়ানরা রাশিয়ান ফেডারেশনে যোগদানের জন্য ভোট দেয়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ক্রিমিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনে রাশিয়ান নাগরিক ও রাশিয়ান ভাষাভাষীদের অধিকার রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। এই সংকটটি জাতিগত বিভাজন বাড়িয়ে তোলে এবং দুই মাস পর পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক অঞ্চলে রাশিয়াপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ইউক্রেন থেকে স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য একটি গণভোট আয়োজন করে। সেই থেকেই পূর্বাঞ্চল ঘিরে এমন অস্থিতিশীল অবস্থা চলতে থাকে। 

কিন্তু ইউক্রেনের বর্তমান সংকটের শিকড় অনেক গভীরে এবং যা অবশ্যই ইউক্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বেশিরভাগ পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, রাশিয়ান প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মধ্য ইউরোপে তার কৌশলগত অবস্থানের জন্য ইউক্রেনকে সোভিয়েত ইউনিয়ন পুনর্গঠন প্রচেষ্টার প্রধান কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছেন। এবং বাল্টিক রাজ্যের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার, শক্তি এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে রাশিয়ার কৌশল ও পরিকল্পনার অংশ হলো ইউক্রেনের ওপর প্রভাব বিস্তার। পুতিন ইউরোপের দিক থেকে রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য একটি প্রধান ভূমিকা চাইছেন। কারণ গত দুই দশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বেশিরভাগ ন্যাটো মিত্ররা ইউরোপে রাশিয়ার প্রভাবকে অধস্তন করার চেষ্টা করেছে। রাশিয়ার মহাশক্তির মর্যাদা পুনরুজ্জীবিত করা, অ-হুমকিপূর্ণ উপায়ে রাশিয়ার উচ্চাকাক্ষাগুলোকে বাস্তবায়ন, নতুন শীতল যুদ্ধ এড়ানোর জন্য এবং পশ্চিমা প্রচেষ্টাকে নষ্ট করার জন্য রাশিয়ার ইউক্রেন প্রভাব বৃদ্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুতিন ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে অভিপ্রায় প্রকাশ করছেন একটি বিস্তৃত রাশিয়ান আধিপত্যযুক্ত সুরক্ষা অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, যা সোভিয়েত যুগে মস্কোর শক্তির মতো হবে। এখন ৬৯ বছর বয়সে এবং সম্ভবত তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের গোধূলিলগ্নে তিনি স্পষ্টতই রাশিয়ার কক্ষপথে ৪৪ মিলিয়ন মানুষের দেশ ইউক্রেনকে সংযুক্ত করতে চান। কারণ, পুতিন ইউক্রেনকে রাশিয়ার ‘প্রভাবের ক্ষেত্র’ হিসেবে এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের পরিবর্তে একটি অঞ্চল হিসেবে দেখছেন।

জানা গেছে, বর্তমানে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাতের নেপথ্যে মূল কারণ হিসেবে রয়েছে ন্যাটো। ন্যাটোর আওতায় রয়েছে ৩০টি দেশ। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও জার্মানি। আর এই গোষ্ঠীভুক্ত হওয়ার চেষ্টায় রয়েছে ইউক্রেন। এ ঘটনা নিয়েই মূলত দেশ দুটির মধ্যে টানাপোড়ন শুরু হয়।

বিভিন্ন ইস্যুতে আগে থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রই রয়েছে ন্যাটোভুক্ত দেশের তালিকায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একই গোষ্ঠীতে প্রতিবেশী ইউক্রেনকে দেখতে নারাজ রাশিয়া। এদিকে ন্যাটো ইউক্রেনের জন্য নিজের দরজা খুলে দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনা মস্কোকে খুব একটা স্বস্তি দেয়নি।

কিন্তু কেন ন্যাটোতে ইউক্রেনের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে রাশিয়া ক্ষুব্ধ? কেন ইউক্রেনের এই পদক্ষেপকে আটকাতে চাইছেন পুতিন? এর নেপথ্যে রয়েছে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।

মুলত, ন্যাটোভুক্ত যেকোনো দেশে বহিরাগত আক্রমণের ক্ষেত্রে বাকি সদস্য দেশগুলোর সহায়তা পেয়ে যায় ওই সংশ্লিষ্ট দেশ। আর রাশিয়ার প্রতিবেশী ইউক্রেন যদি ন্যাটোতে প্রবেশ করে, তাহলে তাকে সহায়তা করতে আসবে সদস্য দেশগুলো। আর এটাই রাশিয়ার ক্ষুব্ধ হওয়ার মূল কারণ। ইউক্রেন ন্যাটোতে প্রবেশ করলে ইউক্রেনে প্রভাব বিস্তার তো দূরে থাক, বরং রাশিয়াকেই কোনঠাসা করে ফেলতে পারে পশ্চিমা শক্তি। যে কারণে পুতিন কোনো ভাবেই চাননি পূর্ব ইউরোপের দিকে ন্যাটোর আরো সম্প্রসারণ হোক।

রাশিয়ার সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে আস্থা ভেঙে যাওয়ার কারণগুলোও ইউক্রেন সংকটের আরেকটি কারণ। রাশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে, আস্থার ক্ষয় শুরু হয়েছিল মার্কিন এবং পশ্চিমা নেতৃত্বের দ্বারা ১৯৯০ সালে জার্মানির একীকরণের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি যে, পূর্বে ন্যাটোর কোনো সম্প্রসারণ হবে না। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, ন্যাটো পূর্ব দিকে প্রসারিত হয়, অবশেষে কমিউনিস্ট বলয়ের মধ্যে থাকা বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশ ন্যাটোতে যোগ দেয়। লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া এবং এস্তোনিয়ার বাল্টিক প্রজাতন্ত্র, এক সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল, পোল্যান্ড, রোমানিয়া এবং অন্যদের মতো ন্যাটোতে যোগদান করেছিল। রুশ প্রেসিডেন্ট ন্যাটোর সম্প্রসারণকে হুমকি হিসেবে এবং ইউক্রেনের এতে যোগদানের সম্ভাবনাকে তার দেশের জন্য একটি অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে ইউক্রেনের সরকার পশ্চিমাদের কাছাকাছি আসছে এবং প্রকাশ্যে বলেছে যে, ২০২৪ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার জন্য আবেদন করবে এবং ন্যাটোর উচ্চাকাক্ষাও তার রয়েছে।

সোমবার ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী দুই অঞ্চল দনেৎস্ক এবং লুহানস্ককে স্বাধীন ঘোষণার পর সেখানে শান্তি রক্ষায় রাশিয়ার সৈন্য মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন পুতিন।

যুদ্ধ কখনো ভালো কিছু বয়ে আনে না। কিন্তু এই যুদ্ধের পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। এর শেষ কোথায়, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষায় বিশ্ব।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button