আন্তর্জাতিকসাম্প্রতিক

রাশিয়া বনাম ইউক্রেনঃ সামরিক শক্তির বিচারে কে বেশি এগিয়ে?

সম্প্রতি ইউক্রেন সীমান্তে লাখখানেক সেনা মোতায়েন করার পর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো অভিযোগ করে আসছিল, যে কোনো মুহূর্তে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ইউক্রেনে হামলা চালাবে রাশিয়া। তবে রাশিয়া বরাবর সে কথা অস্বীকার করে আসছিল।

তবে এটা যে নিছক সান্ত্বনা, তার প্রমাণ মেলেছে কদিন পরেই। গত ২৪ ফেব্রুয়ারী, ইউক্রেনে হামলা চালিয়েছে পরাশক্তি রাশিয়া। রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর বোমা হামলায় প্রথম দিনেই ইউক্রেনে অন্তত ৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে দেশটির পুলিশ জানিয়েছে। ইউক্রেনের বন্দরনগরী ওডেসায় রুশ সেনাবাহিনীর বোমা হামলায় প্রাণহানির এই ঘটনা ঘটেছে বলে খবর দিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।

ইতোমধ্যে দেশটির রাজধানী কিয়েভে ঢুকে পড়েছে রুশ সেনারা। ইউক্রেনের সেনাবাহিনীও তাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

যদিও পূর্বেই ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, তারা রাশিয়ার হামলার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সামরিক সক্ষমতার বিচারে ইউক্রেন কি আদৌ পারবে রাশিয়াকে মোকাবিলা করতে? আর যদি মোকাবিলা করতেই যায়, তবে শক্তির বিচারে কোন পক্ষ এগিয়ে থাকবে?

আসুন দেখে নেওয়া যাক, সামরিক শক্তিতে কোন দেশের অবস্থান কোথায়।

আয়তনের বিচারে রাশিয়া, ইউক্রেনের চেয়ে কয়েকগুন বেশি বড়। একইভাবে সামরিক শক্তির কথা বিবেচনা করলেও দেখা যায়, প্রায় অনেকখানিই পিছিয়ে আছে ইউক্রেন। সামরিক শক্তির বিচারে বিশ্বের ১৪০টি দেশের মধ্যে রাশিয়ার অবস্থান ২য় হলেও, ইউক্রেনের অবস্থান সেখানে ২২তম। দুটো দেশের সৈন্য সংখ্যা, যুদ্ধবিমান, রণতরী বা সামরিক সরঞ্জামের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য।

সামরিক খাতে ইউক্রেনের ব্যয় ৫.৯ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির সরকারের মোট ব্যয়ের ৮.৮ শতাংশ। অন্যদিকে এই খাতে রাশিয়ার ব্যয় ৬১.৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশটির সরকারের মোট ব্যয়ের ১১.৪ শতাংশ।

এসআইপিআরআই (২০২০), আইআইএসএস (২০২১) ও  বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সামরিক শক্তি পর্যবেক্ষণকারী গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার (২০২২) এর তথ্যসূত্র থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের সম্মুখ সারির সেনা রয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার জন। বিপরীতে রাশিয়ার আছে ৯ লাখ। ইউক্রেনের রিজার্ভ সেনাসদস্য ৯ লাখ এবং রাশিয়ার ২০ লাখ। রাশিয়ার আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য সংখ্যা আড়াই লাখ, তবে ইউক্রেনের রয়েছে মাত্র ৫০ হাজার।

ইউক্রেনের আর্টিলারি আছে ২ হাজার ৪০টি এবং রাশিয়ার ৭ হাজার ৫৭১টি। ইউক্রেনের সাজোয়া যানের সংখ্যা ১২ হাজার ৩০৩টি এবং রাশিয়ার ৩০ হাজার ১২২টি। রাশিয়ার ১২ হাজার ৪২০টি ট্যাঙ্কের বিপরীতে ইউক্রেনের আছে ২ হাজার ৫৯৬টি। আমর্ড ভেহিকেল রাশিয়ার রয়েছে ৩০ হাজার ১২২টি, ইউক্রেনের রয়েছে ১২ হাজার ৩০৩টি। রাশিয়ার মোবাইল রকেট প্রজেক্টর রয়েছে ৩,৩৯১টি, ইউক্রেনের আছে ৪৯০টি। 

আকাশেও রাশিয়ার ধারে কাছে নেই ইউক্রেন। রাশিয়ার যেখানে ১,২১৮টি বিমান বন্দর রয়েছে, ইউক্রেনের রয়েছে ১৮৭টি। রাশিয়ার মোট সামরিক আকাশযান রয়েছে ৪ হাজার ১৭৩টি, অপরদিকে ইউক্রেনের মাত্র ৩১৮টি। ইউক্রেনের যুদ্ধবিমান ৬৯টি হলেও রাশিয়ার রয়েছে ৭৭২টি। শুধুমাত্র আক্রমণকারী বিমান রাশিয়ার রয়েছে ৭৩৯টি, ইউক্রেনের মাত্র ২৯টি। ইউক্রেনের পরিবহন বিমান মাত্র ৩২টি হলেও রাশিয়ার রয়েছে ৪৪৫টি। রাশিয়ার মোট হেলিকপ্টার রয়েছে ১,৫৪৩টি, যেখানে অ্যাটাক হেলিকপ্টার ৫৪৪টি। অন্যদিকে ইউক্রেনের হেলিকপ্টার রয়েছে ১১২টি, অ্যাটাক কপ্টার ৩৪টি। এছাড়াও, রাশিয়ার এস-৪০০ নামের অত্যন্ত শক্তিশালী মিসাইল সিস্টেম রয়েছে, যা আকাশ প্রতিরক্ষায় খুবই কার্যকর, তবে ইউক্রেনের এই ধরনের কোন ব্যবস্থা নেই।

সামরিক নৌযানের দিক থেকেও অনেক এগিয়ে রয়েছে রাশিয়া। বাণিজ্যিক জাহাজ রাশিয়ার ২,৮৭৩টি থাকলেও ইউক্রেনের আছে ৪০৯টি। রাশিয়ার নৌ সামরিক যান ৬০৫টি থাকলেও ইউক্রেনের রয়েছে ৩৮টি। রাশিয়ার একটি বিমানবাহী রণতরী থাকলেও ইউক্রেনের এরকম কোন রণতরী নেই। তেমনি রাশিয়ার ৭০টি সাবমেরিন থাকলেও ইউক্রেনের কোন সাবমেরিন নেই। ইউক্রেনের কোন ডেস্ট্রয়ার নেই, তবে রাশিয়ার রয়েছে ১৫টি। ইউক্রেনের একটি ফ্রিগেট থাকলেও রাশিয়ার রয়েছে ১১টি। মাইন ওয়ারফেয়ার নৌযান ইউক্রেনের একটা থাকলেও রাশিয়ার রয়েছে ৪৯টি। রাশিয়ার করভেট রয়েছে ৮৬টি, যেখানে ইউক্রেনের আছে মাত্র একটি। পেট্রোল ভেসেল রাশিয়ার রয়েছে ৫৯টি, ইউক্রেনের রয়েছে ১৩টি।

এসবের বাইরেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে,  রাশিয়া একটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। স্টাটিসটিকার তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র আছে ৬ হাজার ২৫৫টি। বিপরীতে ইউক্রেনের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নেই।

তবে ইউক্রেনের আজ এই অবস্থার জন্যে তারা নিজেরাই দায়ী বলে মনে করেন অনেকে। কারণ, স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তিকালে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পরমাণু অস্ত্রের ভাণ্ডার না যুক্তরাজ্যের কাছে ছিল, না ফ্রান্স, না চীনের কাছে। এটি ছিল ইউক্রেনের ভূমিতে। সোভিয়েত পতনের পর সদ্য স্বাধীন ইউক্রেন প্রায় পাঁচ হাজার পারমাণবিক অস্ত্র পায়, যা মস্কো সেখানে জমা রেখেছিল। ওই সময় কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কাছে এর চেয়ে বেশি পরমাণু অস্ত্র ছিল।

তবে একটা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে পরমাণু অস্ত্র ছেড়ে দেয় ইউক্রেন। সেই অস্ত্রগুলো ধ্বংস করে দেওয়াকে অনেক সময় নিরস্ত্রীকরণের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়।

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button