জীবনী

ড. রাধা বিনোদ পালঃ জাপানের ইতিহাসে স্বর্নাক্ষরে লিখা রয়েছে যে বাঙালির নাম

প্রয়াত হিরোহিতো জাপানের সম্রাট থাকাকালে একবার বলেছিলেন, “যতদিন জাপান থাকবে, বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থকষ্টে মরবে না। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু।”

সম্রাট হিরোহিতো একজন বাঙালিকে লক্ষ্য করে এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন এবং এটি ছিল একজন বাঙালির প্রতি জাপানের কৃতজ্ঞতার নিদর্শনস্বরূপ। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই ভারতীয় নাগরিককে জাপানে জাতীয় বীরদের পর্যায়ের সম্মাননা দেয়া হয়।

কিন্তু যে মানুষটির জন্য আজও বাংলাদেশিদের কৃতজ্ঞচিত্তে সম্মান জানায় জাপানিরা, সেই মানুষটা কে? কেন তাকে জাপানিরা আজও মনে রেখেছে?

জাপানে ইটের গায়ে একটি নাম এখনো লেখা রয়েছে, তা হলো.. আর বি ডি অর্থাৎ রাধা বিনোদ পাল। তিনি বেঁচে আছেন নিজের কর্মে। যার মাধ্যমে তিনি অর্জন করেন সুনাম, খ্যাতি ও বিশ্বপরিচয়।

১৮৮৬ সালের ২৭ জানুয়ারি, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ‘মধুরাপুর’ ইউনিয়নের ‘মৌজা সালিমপুরের’ অধীন তারাগুনিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন রাধা বিনোদ পাল। এই এলাকাটি এখন জজপাড়া নামে পরিচিত। তার বাবার নাম বিপিন বিহারি পাল। 

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ছাতিয়ান ইউনিয়নের ছাতিয়ান গ্রামের গোলাম রহমান পণ্ডিতের কাছে তার শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি। কুষ্টিয়া হাইস্কুলে তিনি মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। রাধা বিনোদ যখন শিশু, তখনই তার বাবা সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। রাধা বিনোদের শৈশব ও কৈশোর কাটে চরম দারিদ্রের মধ্যে। কৈশোরের একটা বড় সময় আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রিত থেকে পড়ালেখা করতে হয় তাকে। পরিবারের খরচ জোগানোর জন্য মামার দোকানে ফুটফরমাশ খাটতে হয়েছে তাকে।

১৯০৮ সালে, কলকাতা প্রেসিডেন্সিয়াল কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণিতে গণিতে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। ১৯২৪ সালে, আইনে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন তিনি।

এলাহাবাদ একাউন্টেন্ট জেনারেল অফিসে কেরানি হিসেবে কর্মজীবন শুরু হয় তার। পরবর্তীতে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে গণিত বিভাগে প্রভাষক হিসেবে শুরু হয়েছিল তার শিক্ষকতা জীবন। শিক্ষকতার পাশাপাশি আইন বিষয়ে পড়াশোনাও চালিয়ে যান তিনি। সেখানে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত আইনের অধ্যাপনা করেছিলেন তিনি।

১৯৪১ সালে, তিনি ভারত সরকারের আইন উপদেষ্টা, তারপর কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে কাজ করেন ১৯৪৪-৪৬ সাল পর্যন্ত। রাধাবিনোদ পাল আন্তর্জাতিক আইন সংস্থাগুলোর সদস্যপদ লাভ করেন। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক দিক নয়, তার ন্যায় বিচারের সুখ্যাতিও চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল।

এত খ্যাতি পাওয়া স্বত্তেও নিজের শেকড়কে ভোলেননি রাধা বিনোদ পাল। ১৯৪৬ সালে, কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ছালিমপুরে ফিরে আসেন তিনি। কিন্তু সে বছরই এপ্রিল মাসে তিনি আন্তর্জাতিক সামরিক ট্রাইব্যুনালে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ পান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জাপান আত্মসমর্পণ করেছিল। নিতে হয়েছিল যুদ্ধাপরাধের দায়। পরাজিত জাপানের শাসনের ভার যায় মিত্র শক্তির হাতে। মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের নির্দেশে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জাপানিদের বিচারের জন্য গঠিত হয় ‘ইন্টারন্যাশনাল মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফার ইস্ট’, যা টোকিও ট্রাইবুনাল নামে পরিচিত। ডগলাস ম্যাকআর্থার জাপানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা করেন। অভিযুক্ত করা হয় ২৮ জন জাপানি রাজনীতিবিদ, সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাকে। এই ট্রাইব্যুনালের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন অস্ট্রেলিয়ান বিচারপতি স্যার উইলিয়াম এফ ওয়েব।

ট্রাইব্যুনালে বিচারকের দায়িত্ব দেওয়া হয় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস মিলিয়ে ১০ দেশের ১১ জন বিচারককে। তাদের মধ্যে ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল।

ঐ ট্রায়ালে দশজন বিচারকের মধ্যে শুধুমাত্র রাধা বিনোদ পালই জাপানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে রায় দিয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে জাপানের পক্ষে মি. পালের রায়ের জন্যই ঐ ট্রায়ালের কয়েকজন বিচারক প্রভাবিত হয়ে তাদের রায় কিছুটা নমনীয় করেছিলেন।

রাধা বিনোদ পালের বক্তব্য ছিল, ট্রায়ালে জাপানকে যেসব অপরাধের জন্য অভিযুক্ত করা হচ্ছে, অভিযোগকারী পক্ষরা নিজেরাই সেসব অপরাধ সংঘটন করে আসছে দীর্ঘদিন যাবৎ। এছাড়া জাপানের বিরুদ্ধে আনা অপরাধের অভিযোগে অপরাধের মাত্রা অতিরঞ্জিত করেও উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও তার বিচারে মত প্রকাশ করেন বিচারক পাল।

মূল রায় ও পর্যবেক্ষণ ছিল ১২৩৫ পৃষ্ঠার। এটি ৮০০ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়েছিল মূল রায় হিসেবে। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে এই বিচার শেষ হয়। রাধা বিনোদ পালের এই রায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। মূলত এর মধ্য দিয়েই জাপান বড় ধরনের যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ থেকে মুক্তি পায়। রাধা বিনোদ পালের এই রায়ের ফলে জাপান নিজেদের অপরাধ অনেকটাই আড়াল করতে পেরেছিল। টোকিও ট্রায়াল’ ধাপে এই বাঙালি বিচারকের দৃঢ় অবস্থানের কারণেই জাপান অনেক কম ক্ষতিপূরণের উপর বেঁচে গিয়েছিলো। নয়ত যে ক্ষতিপূরণের বোঝা মিত্রপক্ষ ও অন্য বিচারকরা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, তার দায় এখন পর্যন্ত টানতে হত জাপানকে।

এ কারণে রাধা বিনোদ পালকে জাপানিরা অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। মাত্র কয়েক বছর আগে জাপানি প্রধানমন্ত্রী ‘মিস্টার আবে’ (যিনি বর্তমান জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের বাবা) কলকাতায় এসেছিলেন। তখন তিনি রাধা বিনোদ পালের ছেলেকে সমগ্র জাপানের তরফে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।  

১৯৫৮ সালে, জাতিসংঘের আইন কমিশনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন রাধা বিনোদ। 

১৯৬৬ সালের অক্টোবরে, জাপানের সম্রাট হিরোহিতো তাকে জাপানের সর্বোচ্চ অ্যাকাডেমিক খেতাব ‘ফার্স্ট অর্ডার অব সেক্রেড ট্রেজার’ প্রদান করেন। জাপানের নিহন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ভূষিত করেছে সম্মানসূচক LL.D উপাধিতে। টোকিও এবং কিয়োটো শহরের মেট্রোপলিস গভর্ননেরা তাকে ‘ফ্রিডম অব দ্যা সিটি অব টোকিও ও কিয়োটো’ সম্মানে ভূষিত করেছিল। রাজধানী টোকিওতে সুপ্রশস্ত রাজপথের নাম রাখা হয়েছে তার নামানুসারে। জাপান বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নামে একটি রিসার্চ সেন্টারও আছে। কিয়োটো শহরে তার নামে রয়েছে জাদুঘর ও স্ট্যাচু।

এছাড়াও টোকিওর চিয়োদা অঞ্চলে ১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইয়াসুকুনি স্মৃতিসৌধ – প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষের স্মৃতির সম্মানে। এসব মানুষ জাপানের হয়ে অথবা জাপানের বিপক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে অথবা যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট কোনো ধরণের সহিংসতার শিকার হয়ে মারা গিয়েছিলেন। এখানে একটি মাত্র স্মৃতিস্তম্ভ ব্যতিক্রমী – যার স্মরণে এটি তৈরি, তিনি এই ধরণের কোন যুদ্ধ বা সহিংসতায় নিহত হননি। রাধা বিনোদ পালই হলেন সেই ব্যক্তি।

১৯৬৭ সালের ১০ জানুয়ারি, কলকাতার বাড়িতে চিরতরে অবসর গ্রহণ করেন খ্যাতিমান এই মনীষী। 

জাপানের ইতিহাসে স্বর্নাক্ষরে লিখা থাকবে রাধা বিনোদের নাম৷ কিন্তু একজন বাঙালি হিসেবে, একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমরা তাকে কতটুকু সম্মান দিতে পেরেছি! সে প্রশ্ন নাহয় তোলাই থাকুক।

লেখক- সায়মা আফরোজ (নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর AFB Daily)

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Show More

এই জাতীয় আরো পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Check Also
Close
Back to top button